Friday, November 23, 2012

যারা যুগে যুগে ছিল খাটো হয়ে, তারা দাঁড়াক একবার মাথা তুলে।

যারা যুগে যুগে ছিল খাটো হয়ে, তারা দাঁড়াক একবার মাথা তুলে।

পলাশ বিশ্বাস

উল্টো রথের বাজনা বাজে শুনতে পাও? শুনতে পাও,কেউ কোথাও? বাজনা বাজে উল্টো রথের নতুন পথের বাদ্যি, আদ্যিকালের রাজপথে আর রথ টানে কার সাধ্যি? চলতি সড়ক রয় পিছনে সামনে রথচক্রে নুন পথের দাগ কেটে যায় দিগন্ত ইস্তক রে! দর্গম পথ হয় সমতল রথের চাকার নিচে রথ চলে আজ সামনেটাকে উল্টে ফেলে' পিছে। উল্টো পথে রথের রশি টানছে কা'রা দেখতে পাও?

অস্পৃশ্যতা যে আমাদের একটি বিরাট সামাজিক ব্যাধি রবীন্দ্রনাথ তা বহুদিন থেকেই অনুভব করেছেন। অস্পৃশ্য বলে যে বিরাট জনসমাজকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, অবমাননার অতলে তলিয়ে রাখা হয়েছে, তাদেরকে যদি কাছে টেনে নেওয়া না যায়, ওপরে ওঠানো না যায় তাহলে সমাজ-ব্যবস'া একদিন না একদিন ভেঙ্গে পড়বেই।

 রবীন্দ্রনাথের ভিত্তি ছিল মৃত্তিকাবর্তী মানুষ। রবীন্দ্রনাথ জনগণমনের কবি। সুবিধাবাদী শাসকগোষ্ঠী রবীন্দ্রচেতনাকে সাধারণের মাঝে পৌঁছে দিতে ভয় পায় কারণ রবীন্দ্রনাথ ব্রাত্য মানুষের মাঝে অভয়মন্ত্র বাজার দীক্ষা দেন। তিনি বলেন, রবীন্দ্রচর্চা বিশ্বব্যাপী দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে কারণ তীব্রভাবে স্বাদেশিক হয়েও রবীন্দ্রনাথ বৈশ্বিক। ভবিষ্যতের বিশ্বমানুষ রবীন্দ্রনাথকে আরও নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করবেন কারণ তাঁর কাছে আছে বিশ্বসঙ্কটের সমাধানের সূত্র।

 রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববীক্ষার প্রধান বৈশিষ্ট্য তার বিবর্তনমানতা। এই বিবর্তনের মূলে ছিল বৃহতের জন্য তাঁর শ্রেয়োসাধনার বোধ। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন বিশ্বমৈত্রীর মধ্য দিয়েই বিশ্বমুক্তি সম্ভব। তাঁর বিশ্ববোধের উৎস গভীর দার্শনিকতার বোধ। এই দর্শনে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মানবমুখী ভাবনার যোগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বজুড়ে সর্বজনীন মানব ঐক্য প্রত্যাশা করেছেন রবীন্দ্রনাথ। ব্যক্তির বিকাশকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু মোটেও ব্যক্তিসর্বস্বতাকে নয়। বর্তমান আত্মকেন্দ্রিক ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের এ যুগান্তকারী চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা অনেক। আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংলাপের মধ্য দিয়ে ইহজাগতিক বিশ্বমানবের কল্যাণের জন্য তাঁর আকুলতা প্রকাশিত হয়েছে। 

তাঁর কবিতা, গান ও লেখায় সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষের কান্না অনুরণিত হয়৷ 

রবীন্দ্র সাহিত্য নূতন করে পড়ার প্রয়োজন আজ সব চাইতে বেশী।আমরা সেই ছোট বেলা থেকে যে রবীন্দ্র নাথকে প্রেম ও আধ্যাত্বের জীবন দর্শনে আলোকিত দেখতে অভ্যস্ত, সেই দৃষ্টিভন্গী পালটে সাধারন ব্রাত্য মানুষের পাশে দাঁড়ানো রবীন্দ্রনাথকে চেনার চেষ্টা করলে হয়ত পেলেও পেয়ে যেতে পারি সেই পথের সন্ধ্যান,যে পথে অচলায়ন ভান্গার বিপ্লব সুনিশ্চিত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বাস করতেন, উদ্ভিদজগৎ, প্রাণিজগৎ, চরাচর তথা সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তাল, লয় ও ছন্দের ঐক্যে চলছে, যাকে সমন্বিত সিম্ফোনি বলা যেতে পারে; হয়তো এ সিম্ফোনিই ছিল তার বিশ্বনিয়ন্তা। এ সিম্ফোনিটা বেসুরো হয়ে উঠলে বিশ্বচরাচরে যত বিপত্তি ঘটে। 

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের জীবিত সন্তানদের মধ্যে ত্রয়োদশ- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ সালে কোলকাতায়। পিরালির দায় নিয়ে যশোরের  ভদ্রাসন ছেড়েছিলেন বিশ্বকবির  আদি পুরুষগণ।  নানার বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ি খুলনায়।। ওরিয়েন্টাল সেমিনারীতে প্রাথমিক শিক্ষার্থে ভর্তি হলেও তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মুলত: গৃহ শিক্ষকদের তত্বাবধানে।।   কৈশোরে মাতৃহারা কবি বেড়ে উঠেছেন জোড়াসাকোর অভিজাত সাংস্কৃতিক পরিবেশে, ঊনিশ শতকের বাংলা রেনেসার মুক্ত হাওয়ায়, ধর্মীয় গোড়ামিমুক্ত উদারমনা ব্রাক্ষ্ম সমাজে। শাাজাদপুর,  শিলাইদহে পৈতৃক জমিদারী দেখাশোনা করতে এসে মাটি ও মানুষের সান্নিধ্যলাভ এবং তাদের জীবন ঘনিষ্ট হওয়া। প্রজাদের দু:খ কষ্ট লাঘবে ক্ষুদ্র ঋণ ভিত্তিক কো অপারেটিভ তথা  সমবায় ব্যাংক, দুগ্ধ খামার প্রতিষ্ঠা, কৃষকদের মধ্যে উন্নত কৃষি বীজ, উপকরনের প্রচলন, সাবান-ছাতা ইত্যাদি তৈরীর কুঠির শিল্প , মৎস্যজীবিদের জন্যে খাজনামুক্ত বিল-জলা প্রদান ইত্যাদি সমাজ চিন্তার উন্মেষ ও বিকাশ ঘটে এই মাটিতে। ছোট ছোট মানুষের অসামান্য জীবনবোধ, জীবন চর্চা এবং মানবিক আকুতি এখানেই চিত্রায়িত করেন ছোটগল্পের রবীন্দ্রনাথ।  নদীমাতৃক এই বাংলাদেশেই বিশ্বপরিভ্রাজক রবীন্দ্রনাথের কবিচিত্তের সোনার তরীতে অধিষ্ঠিত হন আপন দেবতা ।  ঋতুচক্রে এখানকার নদী-নিসর্গ এবং তাকে ঘিরে মুখর নির্জনতায় জীবনের কোলাহলে চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা "আমি কোথায় পাব তারে" নুতন এক মাত্রা এমনকি এক কথায় উত্তর ও পেয়ে যায় বাউল রবীনদ্র উচ্চারনে- আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি ।


ব দ রু দ্দী ন উ ম র লিখেছেনঃ

বাংলাদেশে এবং পশ্চিমবাংলাতেও ২৫শে বৈশাখ ও ২২শে শ্রাবণ উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের গল্প, গান, নাটক অবলম্বন করে অনেক প্রোগ্রাম হয়। নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিশ্রামের কবি ও গীতিকার। সে তুলনায় তার নাটকের মধ্যে বিদ্রোহের উপাদান অনেক বেশি। এর পরিচয় তার জš§-মৃত্যুর অনুষ্ঠানে পাওয়া যায়; পাওয়া যায় ১ বৈশাখ ও বসন্তবরণ উৎসবের মধ্যেও। যেভাবে এসব অনুষ্ঠান পরিকল্পনা এবং উপস্থিত করা হয় তার থেকে মনে হয়, এর বাইরে রবীন্দ্রনাথের আর কিছু নেই। মানুষের সামাজিক জীবনের উন্নতির জন্য 'জাত বুর্জোয়া' হিসেবে লুণ্ঠনকারী বুর্জোয়াদের বিপরীতে রবীন্দ্রনাথের যে গভীর চিন্তা-ভাবনা ছিল, তার কোন পরিচয় এসব দিনের অনুষ্ঠানে পাওয়া যায় না। শিক্ষার ক্ষেত্রে, ইতিহাস চর্চা বিষয়ে, সমাজে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে, শোষণ-বঞ্চনা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান বোঝা যায় না। উপরোক্ত সব দিবসে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান, নাটক অবলম্বন করে নানা অনুষ্ঠান সত্ত্বেও মানুষ হিসেবে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় আড়ালেই থেকে যায়। কাজেই রবীন্দ্রনাথের গান, নাচ, নাটক নিয়ে যাদের গদগদ ভাবের শেষ নেই, তাদের ক'জন রবীন্দ্রনাথ থেকে কোন প্রকৃত শিক্ষা লাভ করে, তার ঠিক নেই। শুধু তাই নয়, দেখা যায় যে, জনগণের পকেট মেরে যারা বড়লোক হয় অথবা ভবিষ্যতে বড়লোক হওয়ার ভাবনায় মশগুল থাকে, তারাই এমন অনুষ্ঠানে জায়গা দখল করে বঙ্গ সংস্কৃতি চর্চায় এগিয়ে থাকে।
১৯১৯ সালে ইংরেজরা পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে শত শত মানুষকে গুলি করে হত্যার পর কংগ্রেসের নেতা মহাÍা নামে পরিচিত মোহন লাল করম চাঁদ গান্ধী তার বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ না করে মৌন থাকলেও রবীন্দ্রনাথ তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তাকে দেয়া 'নাইট' খেতাব বর্জন করেছিলেন। সেই ফ্যাসিস্ট হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আরও নানাভাবে তিনি তার বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। এই বক্তব্যের মধ্যে যে রবীন্দ্রনাথের দেখা পাওয়া যায় সেই রবীন্দ্রনাথকেই পাওয়া যায় তার রাশিয়ার চিঠিতে।
রবীন্দ্রনাথ সোভিয়েত সরকারের আমন্ত্রণে ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া গিয়েছিলেন। সেখানকার অবস্থা দেখে যে চিঠিপত্র তিনি লিখেছিলেন সেগুলোই তার রাশিয়ার চিঠি নামে পরিচিত। লক্ষ্য করার বিষয় যে, রবীন্দ্রনাথের অনেক চিঠিপত্র ও রচনা নিয়ে কথাবার্তা ও লেখালেখি হলেও তার রাশিয়ার চিঠির কথা শোনা যায় না বললেই চলে। এটা শুধু যে সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধেই এক চক্রান্ত তাই নয়, এ চক্রান্ত রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধেও। কারণ এর দ্বারা রবীন্দ্র চরিত্রের এমন একটি দিককে আড়াল করা হয়, যার মধ্যে তার মহত্ত্বের পরিচয় সব থেকে বেশি উচ্চারিত।
রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ার চিঠিগুলোতে ১৯৩০ সালে অর্থাৎ বিপ্লবের মাত্র তের বছর পর সেখানকার অবস্থা দেখে অভিভূত হয়েছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি রাশিয়ার কিছু সমালোচনাও করেছিলেন, যা কিছুটা ছিল অনুষ্ঠানভিত্তিক এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে পশ্চিমা প্রচারণার দ্বারাই অনেকাংশে প্রভাবিত। তিনি তার তৃতীয় চিঠিতে নিজেই লিখেছিলেন, 'মস্কো থেকে যখন নিমন্ত্রণ এলো তখনও বলশেভিকদের সম্বন্ধে আমার মনে কোন স্পষ্ট ধারণা ছিল না। তাদের সম্বন্ধে ক্রমাগতই উল্টো উল্টো কথা শুনেছি। আমার মনে তাদের বিরুদ্ধে একটা খটকা ছিল। কেননা গোড়ায় ওদের সাধনা ছিল জবরদস্তির সাধনা।' এই 'জবরদস্তির সাধনা'র অর্থ হল বিপ্লবের সাধনা। রবীন্দ্রনাথ যে বিপ্লবপন্থী ছিলেন না তা বলাই বাহুল্য। যাই হোক, তার চিঠি সম্পর্কে কিছু আলোচনার আগে এটা বলা দরকার যে, সব কিছু দেখে তিনি যদি শুধু মুগ্ধ কথাবার্তা বলেই তার মূল্যায়ন শেষ করতেন, সেটা তার 'জাত বুর্জোয়া' চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতো না। তিনি যে সেটা করেননি, মুগ্ধ কথাবার্তার সঙ্গে কিছু সমালোচনাও করেছিলেন, এর মধ্যে তার সততার পরিচয় ছিল।
রাশিয়ার চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে তাদের অর্থনৈতিক নির্মাণ, মানবিকতা, সাম্যচিত্ত জাগিয়ে তোলার নানা শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যা কিছু লিখেছেন তার সব কিছু নিয়ে এখানে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে তার জš§দিনে নানা উৎসবের আড়ম্বরে তার যে পরিচয় আড়ালে থেকে যায় সে পরিচয় কিছুটা উপস্থিত করার জন্য তার রাশিয়ার চিঠি থেকে কিছু উদ্ধৃতি প্রাসঙ্গিকই হবে।

২৫শে সেপ্টেম্বর লিখিত তৃতীয় চিঠিতে তিনি বলেছেন, "আপাতত রাশিয়ায় এসেছিÑ না এলে এ জšে§র তীর্থ দর্শন অত্যন্ত অসমাপ্ত থাকত।"
প্রথম চিঠিতে তিনি লিখেছেন, "আমাদের সকল সমস্যার সবচেয়ে বড় রাস্তা হচ্ছে শিক্ষা। এতকাল সমাজের অধিকাংশ লোক শিক্ষার পূর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিতÑ ভারতবর্ষ তো প্রায় সম্পূর্ণই বঞ্চিত। এখানে এই শিক্ষা যে কী আশ্চর্য উদ্যমে সমাজের সর্বত্র ব্যাপ্ত হচ্ছে তা দেখলে বিস্মিত হতে হয়। শিক্ষার পরিমাণ শুধু সংখ্যায় নয়, তার সম্পূর্ণতায়, তার প্রবলতায়। কোন মানুষই যাতে নিঃসহায় ও নিষ্কর্মা হয়ে না থাকে, এজন্য কী প্রচুর আয়োজন ও কী বিপুল উদ্যম। ওই শ্বেত রাশিয়ার জন্য নয়Ñ মধ্য এশিয়ার অর্ধসভ্য জাতের মধ্যেও এরা বন্যার মতো বেগে শিক্ষা বিস্তার করে চলেছে; সায়েন্সের শেষ ফলন পর্যন্ত যাতে তারা পায় এজন্য প্রয়াসের অন্ত নেই। এখানে থিয়েটারে ভালো ভালো অপেরা ও বড় নাটকের অভিনয়ে বিষম ভিড়, কিন্তু যারা দেখছে তারা কৃষি ও কর্মীদের দলের। কোথাও এদের আবাসন নেই। ইতিমধ্যে এদের যে দুই-একটা প্রতিষ্ঠান দেখলুম সর্বত্রই লক্ষ্য করেছি, এদের চিত্তের জাগরণ এবং আÍমর্যাদার আনন্দ।"
দুর্বলকে শক্তি দেয়ার যে সাধনা ও কর্মকাণ্ড সেখানে রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "যদি কেউ বলে, দুর্বলের শক্তিকে উদবোধিত করার জন্যই তারা পণ করেছে, তাহলে আমরা কোন্ দুঃখে বলব যে, তোমাদের ছাড়া দাঁড়াতে নেই। তারা হয়তো ভুল করতে পারেÑ তাদের প্রতিপক্ষরাও যে ভুল করছে না তা নয়।"
দেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা ও জনগণের জীবন নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে সামরিক খাতে অপব্যয় যে এদেরকে বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছিল, এ ব্যাপারে তিনি যেভাবে দৃষ্টি আর্কষণ করেছেন তা সত্যিই বিস্ময়কর। 'শত বুর্জোয়া' হয়েও যে তিনি এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন এর মধ্যে যে শুধু তার গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় আছে তা-ই নয়, সোভিয়েত ইউনিয়নে যে তাদের নির্মাণকাজ কি প্রবল প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে করতে হয়েছিল তার উল্লেখ করে তিনি তাদের যে প্রশংসা করেছিলেন এটা তার শ্রেণীর লোকদের মধ্যে পূর্ণতাই বলতে হবে।
এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য হল, "মনে রেখো, এখানে যে বিপ্লবে জারের শাসন লয় পেলে যেটা ঘটেছে ১৯১৭ খিস্টাব্দে। অর্থাৎ তের বছর পার হল মাত্র। ইতিমধ্যে ঘরে-বাইরে এদের প্রচণ্ড বিরুদ্ধতার সঙ্গে লড়ে চলতে হয়েছে। এরা একা, অত্যন্ত ভাঙাচোরা একটা রাষ্ট্রব্যবস্থার বোঝা নিয়ে। পথ পূর্বতন দুঃশাসনের প্রভূত আবর্জনায় দুর্গম।ঃ অর্থসম্বল এদের সামান্য; বিদেশের মহাজনী গদিতে এদের ক্রেডিট নেই। দেশের মধ্যে কলকারখানা এদের যথেষ্ট পরিমাণে না থাকাতে অর্থ উৎপাদনে এরা শক্তিহীন। এই জন্য কোনোমতে পেটের ভাত বিক্রি করে চলেছে এদের উদ্যোগপর্ব। অথচ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সকলের চেয়ে যে অনুৎপাদক বিভাগ-সৈনিক বিভাগÑ তাকে সম্পূর্ণ সুদক্ষ রাখার অপব্যয় এদের পক্ষে অনিবার্য। কেননা আধুনিক মহাজনী যুগের সমস্ত রাষ্ট্রশক্তি এদের শত্র"পক্ষ এবং তারা সকলেই আপন আপন অস্ত্রশালা কানায় কানায় ভরে তুলেছে।"
রাশিয়া সম্পর্কে যেসব কথা রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, তার কারণ সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তিনি লিখেছেন "তোমার মতো ভদ্র মহিলাকে সাধারণ ভদ্রগোছের চিঠি না লিখে এ রকম চিঠি যে কেন লিখলুম তার কারণ চিন্তা করলেই বুঝতে পারবে, দেশের দশা আমার মনের মধ্যে কি রকম তোলপাড় করছে। জালিয়ানওয়ালাবাগের উপদ্রব্যের পর একবার আমার মনে এই রকম অশান্তি জেগেছিল।"
মোট ১৩টি চিঠি এবং উপসংহারে তিনি রাশিয়া সম্পর্কে অনেক কিছু লিখেছিলেন, যা দারুণভাবে পাঠযোগ্য। রাশিয়া সফর তার চিত্তে কি ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল সে বিষয়ে তার একটি উদ্ধৃতি দিয়েই এখানে শেষ করব। রাশিয়া থেকে ফেরত পথে বার্লিন পৌঁছে ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি এক চিঠিতে লেখেন, "বার্লিনে এসে একসঙ্গে তোমার দু'খানা চিঠি পাওয়া গেল। ঘন বর্ষার চিঠি, শান্তিনিকেতনের আকাশে শালবনের ওপরে মেঘের ছায়া এবং জলের ধারায় শ্রাবণ ঘনিয়ে উঠেছে, সেই ছবি মনে জাগলে আমার চিত্ত কি রকম উৎসুক হয়ে ওঠে, সে তোমাকে বলা বাহুল্য। কিন্তু এবারে রাশিয়া ঘুরে এসে সেই সৌন্দর্যের ছবি আমার মন থেকে মুছে গেছে। কেবলই ভাবছি, আমাদের দেশজোড়া চাষীদের দুঃখের কথা।"
বর্ষার কবি, বিশ্রামের কবি, রবীন্দ্রনাথের ভাবনার এই জগতের সঙ্গে কয়জনের পরিচয় আছে?

http://taiyabs.wordpress.com/2009/05/12/rabi-14/



'রথের রশিনামে রবীন্দ্রনাথের একটি নাটক আছে৷ 'রথবলতে এই নাচকে 'চলার ক্ষমতাবা চলচছত্তিু৷ নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ জানতেনসমাজকে সচল রাখার জন্য দরকার সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় সহযোগিতা৷ যদি সেই সহযোগিতায় খামতি দেখা যায়,সহযোগিতার মানসিকতায় ভাঁটা পড়েযদি মানুষের অসংকোচ সংস্পর্শ থেকে সমাজ বঞ্চিত হয়তবে সচল সমাজেরও চলার ক্ষমতা বা চলার শত্তিু ব্যাহত হয়৷ একই চিন্তার প্রতিফলন পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের 'বলাকা'-,–

''– যদি তুমি মুহূর্তের তরে

ক্লান্তি ভরে

দাঁড়াও থমকি

তখনই চমকি

উিচ্ছ্রয়া উঠিবে বিশ্ব পুঞ্জ পুঞ্জ বস্তুর পর্বত়ে,"

'রথের রশিনাটকটি তাই আজকের প্রেক্ষিতে ভীষণ প্রাসঙ্গিকপ্রয়োজন নাটকটির যথার্থ অনুধাবন৷ কয়েকদিন আগেও বাংলার মাটিতে যে সামাজিক অগ্রগতির রথ থমকে গিয়েছিল,তার কারণ এখন সর্বজনবিদিত৷ রথ টানবেন যাঁরাতাঁদের প্রতি অবহেলাই এই অবস্হার সৃষ্টি কর়েছিল৷ ফলেরথের যিনি দেবতাসেই 'সজীব গণতন্ত্রজেগে উঠলেন৷ এই 'দেবতা'প্রসঙ্গেই রবীন্দ্রনাথই বলেছিলেন, ''রথ ভাবে আমি দেবপথ ভাবে আমি! মূর্তি ভাবে আমি দেবহাসে অন্তর্মী৷সেই অন্তর্মী গণতন্ত্র সজাগ হতেই ঘটে গেল অভুতপূর্ব পট পরিবর্তন৷'রথের রশি'তে রবীন্দ্রনাথের ব্যাখ্যায়,–

"ওদের দিকেই ঠাকুর পাশ ফিরলেন 

নইলে ছন্দ মেলে না৷ একদিকটা উচু হয়েছিল       অতিশয় বেশি,

ঠাকুর নীচে দাঁড়ালেন ছোটোর দিকে,

সেইখান থেকে মারলেন টানবড়োটাকে দিলেন       কাত করে৷

সমান করে নিলেন তাঁর আসনটা৷'


রথের রশি নাটকে সভ্যতার একটি দুর্দশার ছবি আছে। রথটি কালের, অর্থাৎ ইতিহাসের। পুঁজিবাদ তাকে অনড় করে দিয়েছে। কিন্তু রথটিকে তো এগোতে হবে। মানুষের সভ্যতা তো বর্তমানে এসে থেমে যেতে পারে না, তাকে ভবিষ্যতের দিকে চলতেই হবে। কীভাবে? সেই সমাধানের কথাও রয়েছে রথের রশি নাটকে।

রথের রশি   


প্রথম দৃশ্য


রথযাত্রার মেলায় মেয়েরা

 

প্রথমা

 

এবার কী হল, ভাই!

উঠেছি কোন্‌ ভোরে, তখন কাক ডাকে নি।

কঙ্কালিতলার দিঘিতে দুটো ডুব দিয়েই

ছুটে এলুম রথ দেখতে, বেলা হয়ে গেল;

রথের নেই দেখা। চাকার নেই শব্দ।

 

 

দ্বিতীয়া

 

চারি দিকে সব যেন থম্‌থমে হয়ে আছে,

ছম্‌ছম্‌ করছে গা।

 

 

তৃতীয়া

 

দোকানি পসারিরা চুপচাপ ব'সে,

কেনাবেচা বন্ধ। রাস্তার ধারে ধারে

লোক জটলা করে তাকিয়ে আছে

কখন্‌ আসবে রথ। যেন আশা ছেড়ে দিয়েছে।

 

 

প্রথমা

 

দেশের লোকের প্রথম যাত্রার দিন আজ;

বেরবেন ব্রাহ্মণঠাকুর শিষ্য নিয়ে,--

বেরবেন রাজা, পিছনে চলবে সৈন্যসামন্ত,--

পণ্ডিতমশায় বেরবেন, ছাত্ররা চলবে পুঁথিপত্র হাতে।

কোলের ছেলে নিয়ে মেয়েরা বেরবে,

ছেলেদের হবে প্রথম শুভযাত্রা--

কিন্তু কেন সব গেল হঠাৎ থেমে।

 

 

দ্বিতীয়া

 

ওই দেখ্‌, পুরুতঠাকুর বিড়্‌ বিড় করছে ওখানে।

মহাকালের পাণ্ডা বসে মাথায় হাত দিয়ে।

 

 

সন্ন্যাসীর প্রবেশ

 

সন্ন্যাসী

 

সর্বনাশ এল।

বাধবে যুদ্ধ, জ্বলবে আগুন, লাগবে মারী,

ধরণী হবে বন্ধ্যা, জল যাবে শুকিয়ে।

 

 

প্রথমা

 

এ কী অকল্যাণের কথা, ঠাকুর!

উৎসবে এসেছি মহাকালের মন্দিরে--

আজ রথযাত্রার দিন।

 

 

সন্ন্যাসী

 

দেখতে পাচ্ছ না-- আজ ধনীর আছে ধন,

তার মূল্য গেছে ফাঁক হয়ে গজভুক্ত কপিত্থের মতো।

ভরা ফসলের খেতে বাসা করেছে উপবাস।

যক্ষরাজ স্বয়ং তার ভাণ্ডারে বসেছে প্রায়োপবেশনে।

দেখতে পাচ্ছি না-- লক্ষ্ণীর ভাণ্ড আজ শতছিদ্র,

তাঁর প্রসাদধারা শুষে নিচ্ছে মরুভূমিতে--

ফলছে না কোনো ফল।

 

 

তৃতীয়া

 

হাঁ ঠাকুর, তাই তো দেখি।

 

 

সন্ন্যাসী

 

তোমরা কেবলই করেছ ঋণ,

কিছুই কর নি শোধ,

দেউলে করে দিয়েছ যুগের বিত্ত।

তাই নড়ে না আজ আর রথ--

ওই যে, পথের বুক জুড়ে পড়ে আছে তার অসাড় দড়িটা।

 

 

প্রথমা

 

তাই তো,বাপ রে, গা শিউরে ওঠে--

এ যে অজগর সাপ, খেয়ে খেয়ে মোটা হয়ে আর নড়ে না।

 

 

সন্ন্যাসী

 

ওই তো রথের দড়ি, যত চলে না ততই জড়ায়।

যখন চলে, দেয় মুক্তি।

 

 

দ্বিতীয়া

 

বুঝেছি আমাদের পুজো নেবেন ব'লে

হত্যে দিয়ে পড়ে আছেন দড়ি-দেবতা।

পুজো পেলেই হবেন তুষ্ট।

 

 

প্রথমা

 

ও ভাই, পুজো তো আনি নি। ভুল হয়েছে।

 

 

তৃতীয়া

 

পুজোর কথা তো ছিল না--

ভেবেছিলেম রথের মেলায় কেবল বেচব কিনব,

বাজি দেখব জাদুকরের,

আর দেখব বাঁদর-নাচ।

চল্‌-না শিগগির, এখনো সময় আছে,

আনি গে পুজো।

 

 

[সকলের প্রস্থান

 

নাগরিকদের প্রবেশ

 

 

 

প্রথম নাগরিক

 

দেখ্‌ দেখ্‌ রে, রথের দড়িটা কেমন করে পড়ে আছে।

যুগযুগান্তরের দড়ি, দেশদেশান্তরের হাত পড়েছে ওই দড়িতে,

আজ অনড় হয়ে মাটি কামড়ে আছে

সর্বাঙ্গ কালো ক'রে।

 

 

দ্বিতীয় নাগরিক

 

ভয় লাগছে রে। সরে দাঁড়া, সরে দাঁড়া।

মনে হচ্ছে ওটা এখনি ধরবে ফণা, মারবে ছোবল।

 

 

তৃতীয় নাগরিক

 

একটু একটু নড়ছে যেন রে। আঁকুবাঁকু করছে বুঝি।

 

 

প্রথম নাগরিক

 

বলিস্‌ নে অমন কথা। মুখে আনতে নেই।

ও যদি আপনি নড়ে তা হলে কি আর রক্ষে আছে।

 

 

তৃতীয় নাগরিক

 

তা হলে ওর নাড়া খেয়ে সংসারের সব জোড়গুলো

বিজোড় হয়ে পড়বে। আমরা যদি না চালাই--

ও যদি আপনি চলে, তা হলে পড়ব যে চাকার তলায়।

 

 

প্রথম নাগরিক

 

ওই দেখ্‌ ভাই, পুরুতের গেছে মুখ শুকিয়ে,

কোণে বসে বসে পড়ছে মন্তর।

 

 

দ্বিতীয় নাগরিক

 

সেদিন নেই রে

যেদিন পুরুতের মন্তর-পড়া হাতের টানে চলত রথ।

ওরা ছিল কালের প্রথম বাহন।

 

 

তৃতীয় নাগরিক

 

তবু আজ ভোরবেলা দেখি ঠাকুর লেগেছেন টান দিতে--

কিন্তু একেবারেই উলটো দিকে, পিছনের পথে।

 

 

প্রথম নাগরিক

 

সেটাই তো ঠিক পথ, পবিত্র পথ, আদি পথ।

সেই পথ থেকে দূরে এসেই তো কালের মাথার ঠিক থাকছে না।

 

 

দ্বিতীয় নাগরিক

 

মস্ত পণ্ডিত হয়ে উঠলি দেখি। এত কথা শিখলি কোথা।

 

 

প্রথম নাগরিক

 

ওই পণ্ডিতেরই কাছে। তাঁরা বলেন--

মহাকালের নিজের নাড়ীর টান পিছনের দিকে,

পাঁচজনের দড়ির টানে অগত্যা চলেন সামনে।

নইলে তিনি পিছু হটতে হটতে একেবারে পৌছতেন

অনাদি কালের অতল গহ্বরে।

 

 

তৃতীয় নাগরিক

 

ওই রশিটার দিকে চাইতে ভয় করে।

ওটা যেন যুগান্তের নাড়ী--

সান্নিপাতিক জ্বরে আজ দব্‌দব্‌ করছে।

 

 

সন্ন্যাসীর প্রবেশ

 

সন্ন্যাসী

 

সর্বনাশ এল।

গুরুগুরু শব্দ মাটির নীচে।

ভূমিকম্পের জন্ম হচ্ছে।

গুহার মধ্য থেকে আগুন লক্‌লক্‌ মেলছে রসনা।

পূর্বে পশ্চিমে আকাশ হয়েছে রক্তবর্ণ।

প্রলয়দীপ্তির আঙটি পরেছে দিক্‌চক্রবাল।

 

 

[ প্রস্থান

 

 

 

প্রথম নাগরিক

 

দেশে পুণ্যাত্মা কেউ নেই কি আজ।

ধরুক-না এসে দড়িটা।

 

 

দ্বিতীয় নাগরিক

 

এক-একটি পুণ্যাত্মাকে খুঁজে বের করতেই

এক-এক যুগ যায় বয়ে--

ততক্ষণ পাপাত্মাদের হবে কী দশা।

 

 

তৃতীয় নাগরিক

 

পাপাত্মাদের কী হবে তা নিয়ে ভগবানের মাথাব্যাথা নেই।

 

 

দ্বিতীয় নাগরিক

 

সে কী কথা। সংসার তো পাপাত্মাদের নিয়েই।

তারা না থাকলে তো লোকনাথের রাজত্ব উজাড়।

পুণ্যাত্মা কালেভদ্রে দৈবাৎ আসে,

আমাদের ঠেলায় দৌড় মারে বনে জঙ্গলে গুহায়।

 

 

প্রথম নাগরিক

 

দড়িটার রঙ যেন এল নীল হয়ে।

সামলে কথা কোস।

 

 

মেয়েদের প্রবেশ

 

প্রথমা

 

বাজা ভাই, শাঁখ বাজা--

রথ না চললে কিছুই চলবে না।

চড়বে না হাঁড়ি, বুলবুলিতে খেয়ে যাবে ধান।

এরই মধ্যে আমার মেজো ছেলের গেছে চাকরি,

তার বউটা শুষছে জ্বরে। কপালে কী আছে জানি নে।

 

 

প্রথম নাগরিক

 

মেয়েমানুষ, তোমরা এখানে কী করতে।

কালের রথযাত্রায় কোনো হাত নেই তোমাদের।

কুটনো কোটো গে ঘরে।

 

 

দ্বিতীয়া

 

কেন, পুজো দিতে তো পারি।

আমরা না থাকলে পুরুতের পেট হত না এত মোটা।

গড় করি তোমায় দড়ি-নারায়ণ! প্রসন্ন হও।

এনেছি তোমার ভোগ। ওলো, ঢাল্‌ ঢাল্‌ ঘি,

ঢাল্‌ দুধ, গঙ্গাজলের ঘটি কোথায়,

ঢেলে দে-না জল। পঞ্চগব্য রাখ্‌ ওইখানে,

জ্বালা পঞ্চপ্রদীপ। বাবা দড়ি-নারায়ণ,

এই আমার মানত রইল, তুমি যখন নড়বে

মাথা মুড়িয়ে চুল দেব ফেলে।

 

 

তৃতীয়া

 

এক মাস ছেড়ে দেব ভাত, খাব শুধু রুটি।

বলো-না ভাই, সবাই মিলে-- জয় দড়ি-নারায়ণের জয়।

 

 

প্রথম নাগরিক

 

কোথাকার মূর্খ তোরা--

দে মহাকালনাথের জয়ধ্বনি।

 

 

প্রথমা

 

কোথায় তোমাদের মহাকালনাথ? দেখি নে তো চক্ষে।

দড়ি-প্রভুকে দেখছি প্রত্যক্ষ,--

হনুমানপ্রভুর লঙ্কা-পোড়ানো লেজখানার মতো--

কী মোটা, কী কালো, আহা দেখে চক্ষু সার্থক হল।

মরণকালে ওই দড়ি-ধোওয়া জল ছিটিয়ে দিয়ো আমার মাথায়।

 

 

দ্বিতীয়া

 

গালিয়ে নেব আমার হার, আমার বাজুবন্দ,

দড়ির ডগা দেব সোনা-বাঁধিয়ে।

 

 

তৃতীয়া

 

আহা, কী সুন্দর রূপ গো।

 

 

প্রথমা

 

যেন যমুনানদীর ধারা।

 

 

দ্বিতীয়া

 

যেন নাগকন্যার বেণী।

 

 

তৃতীয়া

 

যেন গণেশঠাকুরের শুঁড় চলেছে লম্বা হয়ে,

দেখে জল আসে চোখে।

 

 

সন্ন্যাসীর প্রবেশ

 

প্রথমা

 

দড়ি-ঠাকুরের পুজো এনেছি ঠাকুর!

কিন্তু পুরুত যে নড়েন না, মন্তর পড়বে কে।

 

 

সন্ন্যাসী

 

কী হবে মন্তরে।

কালের পথ হয়েছে দুর্গম।

কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু, কোথাও গভীর গর্ত।

করতে হবে সব সমান, তবে ঘুচবে বিপদ।

 

 

তৃতীয়া

 

বাবা, সাতজন্মে শুনি নি এমন কথা।

চিরদিনই তো উঁচুর মান রেখেছে নিচু মাথা হেঁট ক'রে।

উঁচু-নিচুর সাঁকোর উপর দিয়েই তো রথ চলে।

 

 

সন্ন্যাসী

 

দিনে দিনে গর্তগুলোর হাঁ উঠছে বেড়ে।

হয়েছে বাড়াবাড়ি, সাঁকো আর টিঁকছে না।

ভেঙে পড়ল ব'লে।

 

 

[ প্রস্থান

 

প্রথমা

 

চল্‌ ভাই, তবে পুজো দিই গে রাস্তা-ঠাকুরকে।

আর গর্ত-প্রভুকেও তো সিন্নি দিয়ে করতে হবে খুশি,

কী জানি ওঁরা শাপ দেন যদি। একটি-আধটি তো নন,

আছেন দু-হাত পাঁচ-হাত অন্তর।

নমো নমো দড়ি-ভগবান, রাগ কোরো না ঠাকুর,

ঘরে আছে ছেলেপুলে।

 

 

[ মেয়েদের প্রস্থান

 

সৈন্যদলের প্রবেশ

 

প্রথম সৈনিক

 

ওরে বাস্‌ রে। দড়িটা পড়ে আছে পথের মাঝখানে--

যেন একজটা ডাকিনীর জটা

 

 

দ্বিতীয় সৈনিক

 

মাথা দিল হেঁট করে।

স্বয়ং রাজা লাগালেন হাত, আমরাও ছিলুম পিছনে।

একটু ক্যাঁচ্‌কোঁচও করলে না চাকাটা।

 

 

তৃতীয় সৈনিক

 

ও যে আমাদের কাজ নয়, তাই।

ক্ষত্রিয় আমরা, শূদ্র নই, নই গোরু।

চিরদিন আমরা চড়েই এসেছি রথে।

চিরদিন রথ টানে ওই ওরা-- যাদের নাম করতে নেই।

 

 

প্রথম নাগরিক

 

শোনো ভাই, আমার কথা।

কালের অপমান করেছি আমরা, তাই ঘটেছে এ-সব অনাসৃষ্টি।

 

 

তৃতীয় সৈনিক

 

এ মানুষটা আবার বলে কী।

 

 

প্রথম নাগরিক

 

ত্রেতাযুগে শূদ্র নিতে গেল ব্রাহ্মণের মান--

চাইলে তপস্যা করতে, এত বড়ো আস্পর্ধা--

সেদিনও অকাল লাগল দেশে, অচল হল রথ।

দয়াময় রামচন্দ্রের হাতে কাটা গেল তার মাথা,

তবে তো হল আপদশান্তি।

 

 

দ্বিতীয় নাগরিক

 

সেই শূদ্ররা শাস্ত্র পড়ছেন আজকাল,

হাত থেকে কাড়তে গেলে বলেন, আমরা কি মানুষ নই।

 

 

তৃতীয় নাগরিক

 

মানুষ নই! বটে! কতই শুনব কালে কালে।

কোন্‌দিন বলবে, ঢুকব দেবালয়ে।

বলবে, ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়ের সঙ্গে নাইব এক ঘাটে।

 

 

প্রথম নাগরিক

 

এর পরেও রথ যে চলছে না, সে আমাদের প্রতি দয়া করে।

চললে চাকার তলায় গুঁড়িয়ে যেত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড।

 

 

প্রথম সৈনিক

 

কাল লাঙল ধরবে ব্রাহ্মণ। সর্বনাশ!

 

 

দ্বিতীয় সৈনিক

 

চল্‌-না ওদের পাড়ায় গিয়ে প্রমাণ করে আসি--

ওরাই মানুষ না আমরা।

 

 

দ্বিতীয় নাগরিক

 

এ দিকে আবার কোন্‌ বুদ্ধিমান বলেছে রাজাকে--

কলিযুগে না চলে শাস্ত্র, না চলে শস্ত্র,

চলে কেবল স্বর্ণচক্র। তিনি ডাক দিয়েছেন শেঠজিকে।

 

 

প্রথম সৈনিক

 

রথ যদি চলে বেনের টানে

তবে গলায় অস্ত্র বেঁধে জলে দেব ডুব।

 

 

দ্বিতীয় সৈনিক

 

দাদা, রাগ কর মিছে, সময় হয়েছে বাঁকা।

এ যুগে পুষ্পধনুর ছিলেটাও

বেনের টানেই দেয় মিঠে সুরে টংকার।

তার তীরগুলোর ফলা বেনের ঘরে শানিয়ে না আনলে

ঠিক জায়গায় বাজে না বুকে।

 

 

তৃতীয় সৈনিক

 

তা সত্যি। এ কালের রাজত্বে রাজা থাকেন সামনে,

পিছনে থাকে বেনে। যাকে বলে অর্ধ-বেনে-রাজেশ্বর মূর্তি।

 

 

সন্ন্যাসীর প্রবেশ

 

প্রথম সৈনিক

 

এই-যে সন্ন্যাসী, রথ চলে না কেন আমাদের হাতে।

 

 

সন্ন্যাসী

 

তোমরা দড়িটাকে করেছ জর্জর।

যেখানে যত তীর ছুঁড়েছ, বিঁধেছে ওর গায়ে।

ভিতরে ভিতরে ফাঁক হয়ে গেছে, আলগা হয়েছে বাঁধনের জোর।

তোমরা কেবল ওর ক্ষত বাড়িয়েই চলবে,

বলের মাতলামিতে দুর্বল করবে কালকে।

সরে যাও, সরে যাও ওর পথ থেকে।

 

 

[ প্রস্থান

 

ধনপতির অনুচরবর্গের প্রবেশ

 

প্রথম ধনিক

 

এটা কী গো, এখনি হুঁচট খেয়ে পড়েছিলুম।

 

 

দ্বিতীয় ধনিক

 

ওটাই তো রথের দড়ি।

 

 

চতুর্থ ধনিক

 

বীভৎস হয়ে উঠেছে, যেন বাসুকি ম'রে উঠল ফুলে।

 

 

প্রথম সৈনিক

 

কে এরা সব।

 

 

দ্বিতীয় সৈনিক

 

আংটির হীরে থেকে আলোর উচ্চিংড়েগুলো

লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ছে চোখে।

 

 

প্রথম নাগরিক

 

ধনপতি শেঠির দল এরা।

 

 

প্রথম ধনিক

 

আমাদের শেঠজিকে ডেকেছেন রাজা।

সবাই আশা করছে, তাঁর হাতেই চলবে রথ।

 

 

দ্বিতীয় সৈনিক

 

সবাই বলতে বোঝায় কাকে বাপু?

আর তারা আশাই বা করে কিসের।

 

 

দ্বিতীয় ধনিক

 

তারা জানে, আজকাল চলছে যা-কিছু

সব ধনপতির হাতেই চলছে।

 

 

প্রথম সৈনিক

 

সত্যি নাকি! এখনি দেখিয়ে দিতে পারি, তলোয়ার চলে আমাদেরই হাতে।

 

 

তৃতীয় ধনিক

 

তোমাদের হাতখানাকে চালাচ্ছে কে।

প্রথম সৈনিক

চুপ, দুর্বিনীত!

 

 

দ্বিতীয় ধনিক

 

চুপ করব আমরা বটে।

আজ আমাদেরই আওয়াজ ঘুরপাক খেয়ে বেড়াচ্ছে জলে স্থলে আকাশে।

 

 

প্রথম সৈনিক

 

মনে ভাবছ, আমাদের শতঘ্নী ভুলেছে তার বজ্রনাদ।

 

 

দ্বিতীয় ধনিক

 

ভুললে চলবে কেন। তাকে যে আমাদেরই হুকুম

ঘোষণা করতে হয় এক হাট থেকে আরেক হাটে সমুদ্রের ঘাটে ঘাটে।

 

 

প্রথম নাগরিক

 

ওদের সঙ্গে পারবে না তর্কে।

 

 

প্রথম সৈনিক

 

কী বলো, পারব না!

সবচেয়ে বড়ো তর্কটা ঝন্‌ঝন্‌ করছে খাপের মধ্যে।

 

 

প্রথম নাগরিক

 

তোমাদের তলোয়ারগুলোর কোনোটা খায় ওদের নিমক,

কোনোটা খেয়ে বসেছে ওদের ঘুষ।

 

 

প্রথম ধনিক

 

শুনলেম, নর্মদাতীরের বাবাজিকে আনা হয়েছিল

দড়িতে হাত লাগাবার জন্যে। জান খবর?

 

 

দ্বিতীয় ধনিক

 

জানি বৈকি।

রাজার চর পৌঁছল গুহায়,

তখন প্রভু আছেন চিত হয়ে বুকে দুই পা আটকে।

তুরী ভেরী দামামা জগঝম্পের চোটে ধ্যান যদি বা ভাঙল,

পা-দুখানা তখন আড়ষ্ট কাঠ।

 

 

নাগরিক

 

শ্রীচরণের দোষ কী দাদা!

পঁয়ষট্টি বছরের মধ্যে একবারও নাম করে নি চলাফেরার।

বাবাজি বলবেন কী।

 

 

দ্বিতীয় ধনিক

 

কথা কওয়ার বালাই নেই।

জিভটার চাঞ্চল্যে রাগ করে গোড়াতেই সেটা ফেলেছেন কেটে।

 

 

ধনিক

 

তার পরে?

 

 

দ্বিতীয় ধনিক

 

তার পরে দশ জোয়ানে মিলে আনলে তাঁকে রথতলায়।

দড়িতে যেমনি তাঁর হাত পড়া,

রথের চাকা বসে যেতে লাগল মাটির নীচে।

 

 

ধনিক

 

নিজের মনটা যেমন ডুবিয়েছেন রথটাকেও তেমনি তলিয়ে দেবার চেষ্টা।

দ্বিতীয় ধনিক

একদিন উপবাসেই মানুষের পা চায় না চলতে--

পঁয়ষট্টি বছরের উপবাসের ভার পড়ল চাকার 'পরে।

 

 

মন্ত্রী ও ধনপতির প্রবেশ

 

ধনপতি

 

ডাক পড়ল কেন মন্ত্রীমশায়?

 

 

মন্ত্রী

 

অনর্থপাত হলেই সর্বাগ্রে তোমাকে স্মরণ করি।

 

 

ধনপতি

 

অর্থপাতে যার প্রতিকার, আমার দ্বারা তাই সম্ভব।

 

 

মন্ত্রী

 

মহাকালের রথ চলছে না।

 

 

ধনপতি

 

এ পর্যন্ত আমরা কেবল চাকায় তেল দিয়েছি, রশিতে টান দিই নি।

 

 

মন্ত্রী

 

অন্য সব শক্তি আজ অর্থহীন,

তোমাদের অর্থবান হাতের পরীক্ষা হোক।

 

 

ধনপতি

 

চেষ্টা করা যাক।

দৈবক্রমে চেষ্টা যদি সফল হয়, অপরাধ নিয়ো না তবে।

 

 

দলের লোকের প্রতি

 

বলো সিদ্ধিরস্তু!

 

 

সকলে

 

সিদ্ধিরস্তু!

 

 

ধনপতি

 

লাগো তবে ভাগ্যবানেরা। টান দেও।

 

 

ধনিক

 

রশি তুলতেই পারি নে। বিষম ভারী।

 

 

ধনপতি

 

এসো কোষাধ্যক্ষ, ধরো তুমি কষে।

বলো সিদ্ধিরস্তু! টানো, সিদ্ধিরস্তু।

টানো, সিদ্ধিরস্তু!

 

 

দ্বিতীয় ধনিক

 

মন্ত্রীমশায়, রশিটা যেন আরো আড়ষ্ট হয়ে উঠল,

আর আমাদের হাতে হল যেন পক্ষাঘাত।

 

 

সকলে

 

দুয়ো দুয়ো!

 

 

সৈনিক

 

যাক, আমাদের মান রক্ষা হল।

 

 

পুরোহিত

 

আমাদের ধর্মরক্ষা হল।

 

 

সৈনিক

 

যদি থাকত সেকাল, আজ তোমার মাথা যেত কাটা।

 

 

ধনপতি

 

ওই সোজা কাজটাই জান তোমরা।

মাথা খাটাতে পার না, কাটতেই পার মাথা।

মন্ত্রীমশায়, ভাবছ কী।

 

 

মন্ত্রী

 

ভাবছি, সব চেষ্টাই ব্যর্থ হল--

এখন উপায় কী।

 

 

ধনপতি

 

এবার উপায় বের করবেন স্বয়ং মহাকাল।

তাঁর নিজের ডাক যেখানে পৌঁছবে

সেখান থেকে বাহন আসবে ছুটে।

আজ যারা চোখে পড়ে না

কাল তারা দেখা দেবে সবচেয়ে বেশি।

ওহে খাতাঞ্চি, এই বেলা সামলাও গে খাতাপত্র--

কোষাধ্যক্ষ, সিন্ধুকগুলো বন্ধ করো শক্ত তালায়।

 

 

[ ধনপতি ও তার দলের প্রস্থান

 

 

 

মেয়েদের প্রবেশ

 

 

 

প্রথমা

 

হাঁ গা, রথ চলল না এখনো, দেশসুদ্ধ রইল উপোস করে!

কলিকালে ভক্তি নেই যে।

 

 

মন্ত্রী

 

তোমাদের ভক্তির অভাব কী বাছা,

দেখি না তার জোর কত।

 

 

প্রথমা

 

নমো নমো,

নমো নমো বাবা দড়ি-ঠাকুর, অন্ত পাই নে তোমার দয়ার।

নমো নমো!

 

 

দ্বিতীয়া

 

তিনকড়ির মা বললে সতেরো বছরের ব্রাহ্মণের মেয়ে,

ঠিকদুক্ষুর বেলা, বোম ভোলানাথ ব'লে

তালপুকুরে-- ঘাটের থেকে তিন হাতের মধ্যে--

এক ডুবে তিন গোছা পাট-শিয়ালা তুলে

ভিজে চুল দিয়ে বেঁধে দড়ি-প্রভুর কাছে পোড়ালে

প্রভুর টনক নড়বে। জোগাড় করেছি অনেক যত্নে,

সময়ও হয়েছে পোড়াবার।

আগে দড়ি-বাবার গায়ে সিঁদুর-চন্দন লাগা;

ভয় কিসের, ভক্তবৎসল তিনি--

মনে মনে শ্রীগুরুর নাম করে গায়ে হাত ঠেকালে

অপরাধ নেবেন না তিনি।

 

 

প্রথমা

 

তুই দে-না ভাই চন্দন লাগিয়ে, আমাকে বলিস কেন।

আমার দেওরপো পেট-রোগা,

কী জানি কিসের থেকে কী হয়।

 

 

তৃতীয়া

 

ওই তো ধোঁওয়া পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে।

কিন্তু জাগলেন না তো।

দয়াময়!

জয় প্রভু, জয় দড়ি-দয়াল প্রভু, মুখ তুলে চাও।

তোমাকে দেব পরিয়ে পঁয়তাল্লিশ ভরির সোনার আংটি--

গড়াতে দিয়েছি বেণী স্যাকরার কাছে।

 

 

দ্বিতীয়া

 

তিন বছর থাকব দাসী হয়ে, ভোগ দেব তিন বেলা।

ওলো বিনি, পাখাটা এনেছিস তো বাতাস কর্‌-না--

দেখছিস্‌ নে রোদ্‌দুরে তেতে উঠেছে ওঁর মেঘবরন গা।

ঘটি করে গঙ্গাজলটা ঢেলে দে।

ওইখানকার কাদাটা দে তো, ভাই, আমার কপালে মাখিয়ে।

এই তো আমাদের খেঁদি এনেছে খিচুড়ি-ভোগ।

বেলা হয়ে গেল, আহা, কত কষ্ট পেলেন প্রভু!

জয় দড়ীশ্বর, জয় মহাদড়ীশ্বর, জয় দেবদেবদড়ীশ্বর,

গড় করি তোমায়, টলুক তোমার মন।

মাথা কুটছি তোমার পায়ে, টলুক তোমার মন।

পাখা কর্‌ লো; পাখা কর্‌, জোরে জোরে।

 

 

প্রথমা

 

কী হবে গো, কী হবে আমাদের--

দয়া হল না যে! আমার তিন ছেলে বিদেশে,

তারা ভালোয় ভালোয় ফিরলে হয়।

 

 

চরের প্রবেশ

 

মন্ত্রী

 

বাছারা, এখানে তোমাদের কাজ হল--

এখন ঘরে গিয়ে জপতপ ব্রতনিয়ম করো গে।

আমাদের কাজ আমরা করি।

 

 

প্রথমা

 

যাচ্ছি, কিন্তু দেখো মন্ত্রীবাবা,

ওই ধোঁওয়াটা যেন শেষ পর্যন্ত থাকে--

আর ওই বিল্বিপত্রটা যেন পড়ে না যায়।

 

 

[ মেয়েদের প্রস্থান

 

চর

 

মন্ত্রীমশায়, গোল বেধেছে শূদ্রপাড়ায়।

 

 

মন্ত্রী

 

কী হল।

 

 

চর

 

দলে দলে ওরা আসছে ছুটে-- বলছে, রথ চালাব আমরা।

 

 

সকলে

 

বলে কী! রশি ছুঁতেই পাবে না।

 

 

চর

 

ঠেকাবে কে তাদের। মারতে মারতে তলোয়ার যাবে ক্ষয়ে। মন্ত্রীমশায়, বসে পড়লে

যে।

 

 

মন্ত্রী

 

দল বেঁধে আসছে বলে ভয় করি নে-- ভয় হচ্ছে পারবে ওরা।

 

 

সৈনিক

 

বল কী মন্ত্রীমহারাজ, শিলা জলে ভাসবে?

 

 

মন্ত্রী

 

নীচের তলাটা হঠাৎ উপরের তলা হয়ে ওঠাকেই বলে প্রলয়,

বরাবর যা প্রচ্ছন্ন তাই প্রকাশ হবার সময়টাই যুগান্তর।

 

 

সৈনিক

 

আদেশ করুন কী করতে হবে, ভয় করি নে আমরা।

 

 

মন্ত্রী

 

ভয় করতেই হবে, তলোয়ারের বেড়া তুলে বন্যা ঠেকানো যায় না।

 

 

চর

 

এখন কী আদেশ বলুন।

 

 

মন্ত্রী

 

বাধা দিয়ো না ওদের।

বাধা পেলে শক্তি নিজেকে নিজে চিনতে পারে--

চিনতে পারলেই আর ঠেকানো যায় না।

 

 

চর

 

ওই-যে এসে পড়েছে ওরা।

 

 

মন্ত্রী

 

কিছু কোরো না তোমরা, থাকো স্থির হয়ে।

 

 

শূদ্রদলের প্রবেশ

 

দলপতি

 

মন্ত্রী

 

তোমরাই তো বাবার রথ চালিয়ে আসছ চিরদিন।

 

 

দলপতি

 

এতদিন আমরা পড়তেম রথের চাকার তলায়,

দ'লে গিয়ে ধুলোয় যেতুম চ্যাপটা হয়ে।

এবার সেই বলি তো নিল না বাবা।

 

 

মন্ত্রী

 

তাই তো দেখলেম।

সকাল থেকে চাকার সামনে ধুলোয় করলে লুটোপুটি--

ভয়ে উপরে তাকালে না, পাছে ঠাকুরের দিকে চোখ পড়ে--

তবু তো চাকার মধ্যে একটুও দেখা গেল না ক্ষুধার লক্ষণ।

 

 

পুরোহিত

 

একেই বলে অগ্নিমান্দ্য,

তেজ ক্ষয় হলেই ঘটে এই দশা।

 

 

দলপতি

 

এবার তিনি ডাক দিয়েছেন তাঁর রশি ধরতে।

 

 

পুরোহিত

 

রশি ধরতে! ভারি বুদ্ধি তোমাদের। জানলে কী করে।

 

 

দলপতি

 

কেমন করে জানা গেল সে তো কেউ জানে না।

ভোরবেলায় উঠেই সবাই বললে সবাইকে,

ডাক দিয়েছেন বাবা। কথাটা ছড়িয়ে গেল পাড়ায় পাড়ায়,

পেরিয়ে গেল মাঠ, পেরিয়ে গেল নদী,

পাহাড় ডিঙিয়ে গেল খবর--

ডাক দিয়েছেন বাবা।

 

 

সৈনিক

 

রক্ত দেবার জন্যে।

 

 

দলপতি

 

না, টান দেবার জন্যে।

 

 

পুরোহিত

 

বরাবর সংসার যারা চালায়, রথের রশি তাদেরই হাতে।

 

 

দলপতি

 

সংসার কি তোমরাই চালাও ঠাকুর?

 

 

পুরোহিত

 

স্পর্ধা দেখো একবার। কথার জবাব দিতে শিখেছে--

লাগল বলে ব্রহ্মশাপ।

 

 

দলপতি

 

মন্ত্রীমশায়, তোমরাই কি চালাও সংসার।

 

 

মন্ত্রী

 

সে কী কথা। সংসার বলতে তো তোমরাই।

নিজগুণেই চল, তাই রক্ষে।

চালাক লোকে বলে আমরাই চালাচ্ছি।

আমরা মান রাখি লোক ভুলিয়ে।

 

 

দলপতি

 

আমরাই তো জোগাই অন্ন, তাই তোমরা বাঁচ;

আমরাই বুনি বস্ত্র, তাতেই তোমাদের লজ্জারক্ষা।

 

 

সৈনিক

 

সর্বনাশ! এতদিন মাথা হেঁট করে বলে এসেছে ওরা,

তোমরাই আমাদের অন্নবস্ত্রের মালিক।

আজ ধরেছে উলটো বুলি, এ তো সহ্য হয় না।

 

 

মন্ত্রী

 

সৈনিকের প্রতি

 

চুপ করো।

সর্দার, মহাকালের বাহন তোমরাই,

তোমরা নারায়ণের গরুড়।

এখন তোমাদের কাজ সাধন করে যাও তোমরা।

তার পরে আসবে আমাদের কাজের পালা।

 

 

দলপতি

 

আয় রে ভাই, লাগাই টান, মরি আর বাঁচি।

 

 

মন্ত্রী

 

কিন্তু বাবা, সাবধানে রাস্তা বাঁচিয়ে চোলো।

বরাবর যে রাস্তায় রথ চলেছে যেয়ো সেই রাস্তা ধরে।

পোড়ো না যেন একেবারে আমাদের ঘাড়ের উপর।

 

 

দলপতি

 

কখ#না বড়ো রাস্তায় চলতে পাই নি, তাই রাস্তা চিনি নে।

রথে আছেন যিনি তিনিই সামলাবেন।

আয় ভাই, দেখছিস রথচূড়ায় কেতনটা উঠছে দুলে।

বাবার ইশারা। ভয় নেই আর, ভয় নেই। ওই চেয়ে দেখ্‌ রে ভাই

মরা নদীতে যেমন বান আসে

দড়ির মধ্যে তেমনি প্রাণ এসে পৌঁচেছে।

 

 

পুরোহিত

 

ছুঁলো, ছুঁলো দেখছি, ছুলো শেষে রশি ছুঁলো পাষণ্ডেরা।

 

 

মেয়েদের ছুটিয়া প্রবেশ

 

সকলে

 

ছুঁয়ো না, ছুঁয়ো না, দোহাই বাবা--

ও গদাধর, ও বনমালী, এমন মহাপাপ কোরো না।

পৃথিবী যাবে যে রসাতলে।

আমাদের স্বামী ভাই বোন ছেলে

কাউকে পারব না বাঁচাতে।

চল্‌ রে চল্‌, দেখলেও পাপ আছে।

 

 

[ প্রস্থান

 

পুরোহিত

 

চোখ বোজো, চোখ বোজো তোমরা।

ভস্ম হয়ে যাবে ক্রুদ্ধ মহাকালের মূর্তি দেখলে।

 

 

সৈনিক

 

এ কি, এ কি, চাকার শব্দ নাকি--

না আকাশটা উঠল আর্তনাদ করে?

 

 

পুরোহিত

 

হতেই পারে না-- কিছুতেই হতে পারে না--

কোনো শাস্ত্রেই লেখে না।

 

 

নাগরিক

 

নড়েছে রে, নড়েছে, ওই তো চলেছে।

 

 

সৈনিক

 

কী ধুলোই উড়ল-- পৃথিবী নিশ্বাস ছাড়ছে।

অন্যায়, ঘোর অন্যায়! রথ শেষে চলল যে--

পাপ, মহাপাপ!

 

 

শূদ্রদল

 

জয় জয়, মহাকালনাথের জয়!

 

 

পুরোহিত

 

তাই তো, এও দেখতে হল চোখে!

 

 

সৈনিক

 

ঠাকুর, তুমিই হুকুম করো, ঠেকাব রথ-চলা।

বৃদ্ধ হয়েছেন মহাকাল, তাঁর বুদ্ধিভ্রংশ হল--

দেখলেম সেটা স্বচক্ষে।

 

 

পুরোহিত

 

সাহস হয় না হুকুম করতে।

অবশেষে জাত খোওয়াতেই বাবার যদি খেয়াল গেল

এবারকার মতো চুপ করে থাকো 'রঞ্জুলাল।

আসছে বারে ওঁকে হবেই প্রায়শ্চিত্ত করতে।

হবেই, হবেই, হবেই।

ওঁর দেহ শোধন করতে গঙ্গা যাবে শুকিয়ে।

 

 

সৈনিক

 

গঙ্গার দরকার হবে না।

ঘড়ার ঢাকনার মতো শূদ্রগুলোর মাথা দেব উড়িয়ে,

ঢালব ওদের রক্ত।

 

 

নাগরিক

 

মন্ত্রীমশায়, যাও কোথায়?

 

 

মন্ত্রী

 

যাব ওদের সঙ্গে রশি ধরতে।

 

 

সৈনিক

 

ছি ছি, ওদের হাতে হাত মেলাবে তুমি!

 

 

মন্ত্রী

 

ওরাই যে আজ পেয়েছে কালের প্রসাদ।

স্পষ্টই গেল দেখা, এ মায়া নয়, নয় স্বপ্ন।

এবার থেকে মান রাখতে হবে ওদের সঙ্গে সমান হয়ে।

 

 

সৈনিক

 

তাই বলে ওদেরই এক সারে রশি ধরা!

ঠেকাবই আমরা, রথ চলুক আর নাই চলুক।

 

 

মন্ত্রী

 

এবার দেখছি চাকার তলায় পড়বার পালা তোমাদেরই।

 

 

সৈনিক

 

সেও ভালো। অনেক কাল চণ্ডালের রক্ত শুষে চাকা আছে

অশুচি, এবার পাবে শুদ্ধ রক্ত। স্বাদ বদল করুক।

 

 

পুরোহিত

 

কী হল মন্ত্রী, এ কোন্‌ শনিগ্রহের ভেলকি?

রথটা যে এরই মধ্যে নেমে পড়েছে রাজপথে।

পৃথিবী তবু তো নেমে গেল না রসাতলে।

মাতাল রথ কোথায় পড়ে কোন্‌ পল্লীর ঘাড়ে, কে জানে।

 

 

সৈনিক

 

ওই দেখো, ধনপতির দল আর্তনাদ করে ডাকছে আমাদের।

রথটা একেবারে সোজা চলেছে ওদেরই ভাণ্ডারের মুখে।

যাই ওদের রক্ষা করতে।

 

 

মন্ত্রী

 

নিজেদের রক্ষার কথা ভাবো।

দেখছ না, ঝুঁকেছে তোমাদের অস্ত্রশালার দিকে।

 

 

সৈনিক

 

উপায়?

 

 

মন্ত্রী

 

ওদের সঙ্গে মিলে ধরো-সে রশি।

বাঁচবার দিকে ফিরিয়ে আনো রথটাকে--

দো-মনা করবার সময় নেই।

 

 

[ প্রস্থান

 

সৈনিক

 

কী করবে ঠাকুর, তুমি কী করবে।

 

 

পুরোহিত

 

বীরগণ, তোমরা কী করবে বলো আগে।

 

 

সৈনিক

 

কী করতে হবে বলো-না, ভাইসকল!

সবাই যে একেবারে চুপ করে গেছ!

রশি ধরব না লড়াই করব?

ঠাকুর, তুমি কী করবে বলোই-না।

 

 

পুরোহিত

 

কী জানি, রশি ধরব না শাস্ত্র আওড়াব।

 

 

সৈনিক

 

গেল, গেল সব। রথের এমন হাঁক শুনি নি কোনো পুরুষে।

 

 

দ্বিতীয় সৈনিক

 

চেয়ে দেখো-না, ওরাই কি টানছে রথ

না রথটা আপনিই চলেছে ওদের ঠেলে নিয়ে।

 

 

তৃতীয় সৈনিক

 

এতকাল রথটা চলত যেন স্বপ্নে--

আমরা দিতেম টান আর ও পিছে পিছে আসত দড়িবাঁধা গোরুর মতো।

আজ চলছে জেগে উঠে। বাপ রে, কী তেজ।

মানছে না আমাদের বাপদাদার পথ--

একটা কাঁচা পথে ছুটেছে বুনো মহিষের মতো।

পিঠের উপর চড়ে বসেছে যম।

 

 

দ্বিতীয় সৈনিক

 

ওই যে আসছে কবি, ওকে জিঞ্জাসা করি ব্যাপারটা কী।

 

 

পুরোহিত

 

পাগলের মতো কথা বলছ তোমরা।

আমরাই বুঝলেম না মানে, বুঝবে কবি?

ওরা তো বানিয়ে বানিয়ে বলে কথা-- শাস্ত্র জানে কী?

 

 

কবির প্রবেশ

 

দ্বিতীয় সৈনিক

 

এ কী উলটোপালটা ব্যাপার, কবি।

পুরুতের হাতে চলল না রথ, রাজার হাতে না--

মানে বুঝলে কিছু?

 

 

কবি

 

ওদের মাথা ছিল অত্যন্ত উঁচু,

মহাকালের রথের চুড়ার দিকেই ছিল ওদের দৃষ্টি--

নীচের দিকে নামল না চোখ,

রথের দড়িটাকেই করলে তুচ্ছ।

মানুষের সঙ্গে মানুষকে বাঁধে যে বাঁধন তাকে ওরা মানে নি।

রাগী বাঁধন আজ উন্মত্ত হয়ে ল্যাজ আছড়াচ্ছে--

দেবে ওদের হাড় গুঁড়িয়ে।

 

 

পুরোহিত

 

তোমার শূদ্রগুলোই কি এত বুদ্ধিমান--

ওরাই কি দড়ির নিয়ম মেনে চলতে পারবে।

 

 

কবি

 

পারবে না হয়তো।

একদিন ওরা ভাববে, রথী কেউ নেই, রথের সর্বময় কর্তা ওরাই।

দেখো, কাল থেকেই শুরু করবে চেঁচাতে--

জয় আমাদের হাল লাঙল চরকা তাঁতের।

তখন এঁরাই হবেন বলরামের চেলা--

হলধরের মাতলামিতে জগৎটা উঠবে টলমলিয়ে।

 

 

পুরোহিত

 

তখন যদি রথ আর-একবার অচল হয়

বোধ করি তোমার মতো কবিরই ডাক পড়বে--

তিনি ফুঁ দিয়ে ঘোরাবেন চাকা।

 

 

কবি

 

নিতান্ত ঠাট্টা নয় পুরুতঠাকুর!

রথযাত্রায় কবির ডাক পড়েছে বারে বারে,

কাজের লোকের ভিড় ঠেলে পারে নি সে পৌঁছতে।

 

 

পুরোহিত

 

রথ তারা চালাবে কিসের জোরে। বুঝিয়ে বলো।

 

 

কবি

 

গায়ের জোরে নয়, ছন্দের জোরে।

আমরা মানি ছন্দ, জানি একঝোঁকা হলেই তাল কাটে।

মরে মানুষ সেই অসুন্দরের হাতে

চাল-চলন যার এক পাশে বাঁকা;

কুম্ভকর্ণের মতো গড়ন যার বেমানান,

যার ভোজন কুৎসিত,

যার ওজন অপরিমিত।

আমরা মানি সুন্দরকে। তোমরা মানো কঠোরকে--

অস্ত্রের কঠোরকে, শাস্ত্রের কঠোরকে।

বাইরে ঠেলা-মারার উপর বিশ্বাস,

অন্তরের তালমানের উপর নয়।

 

 

সৈনিক

 

তুমি তো লম্বা উপদেশ দিয়ে চললে,

ও দিকে যে লাগল আগুন।

 

 

কবি

 

যুগাবসানে লাগেই তো আগুন।

যা ছাই হবার তাই ছাই হয়,

যা টিঁকে যায় তাই নিয়ে সৃষ্টি হয় নবযুগের।

 

 

সৈনিক

 

তুমি কী করবে কবি!

 

 

কবি

 

আমি তাল রেখে রেখে গান গাব।

 

 

সৈনিক

 

কী হবে তার ফল?

 

 

কবি

 

যারা টানছে রথ তারা পা ফেলবে তালে তালে।

পা যখন হয় বেতালা

তখন ক্ষুদে ক্ষুদে খালখন্দগুলো মারমূর্তি ধরে।

মাতালের কাছে রাজপথও হয়ে ওঠে বন্ধুর।

 

 

মেয়েদের প্রবেশ

 

প্রথমা

 

এ হল কী ঠাকুর!

তোমরা এতদিন আমাদের কী শিখিয়েছিলে!

দেবতা মানলে না পুজো, ভক্তি হল মিছে।

মানলে কিনা শুদ্দুরের টান, মেলেচ্ছের ছোঁওয়া!

ছি, ছি, কী ঘেন্না।

 

 

কবি

 

পুজো তোমরা দিলে কোথায়।

 

 

দ্বিতীয়া

 

এই তো এইখানেই।

ঘি ঢেলেছি, দুধ ঢেলেছি, ঢেলেছি গঙ্গাজল--

রাস্তা এখনো কাদা হয়ে আছে!

পাতায় ফুলে ওখানটা গেছে পিছল হয়ে।

 

 

কবি

 

পুজো পড়েছে ধুলোয়, ভক্তি করেছে মাটি।

রথের দড়ি কি পড়ে থাকে বাইরে।

সে থাকে মানুষে মানুষে বাঁধা, দেহে দেহে প্রাণে প্রাণে।

সেইখানে জমেছে অপরাধ, বাঁধন হয়েছে দুর্বল।

 

 

তৃতীয়া

 

আর ওরা-- যাদের নাম করতে নেই?

 

 

কবি

 

ওদের দিকেই ঠাকুর পাশ ফিরলেন--

নইলে ছন্দ মেলে না। এক দিকটা উঁচু হয়েছিল অতিশয় বেশি,

ঠাকুর নীচে দাঁড়ালেন ছোটোর দিকে,

সেইখান থেকে মারলেন টান, বড়োটাকে দিলেন কাত করে।

সমান করে নিলেন তাঁর আসনটা।

 

 

প্রথমা

 

তার পরে হবে কী।

 

 

কবি

 

তার পরে কোন্‌-এক যুগে কোন্‌-একদিন

আসবে উলটোরথের পালা।

তখন আবার নতুন যুগের উঁচুতে নিচুতে হবে বোঝাপড়া।

এই বেলা থেকে বাঁধনটাতে দাও মন--

রথের দড়িটাকে নাও বুকে তুলে, ধুলোয় ফেলো না;

রাস্তাটাকে ভক্তিরসে দিয়ো না কাদা করে।

আজকের মতো বলো সবাই মিলে--

যারা এতদিন মরে ছিল তারা উঠুক বেঁচে;

যারা যুগে যুগে ছিল খাটো হয়ে, তারা দাঁড়াক একবার মাথা তুলে।

 

 

সন্ন্যাসীর প্রবেশ

 

সন্ন্যাসী

 

জয়-- মহাকালনাথের জয়!

 

 

১৫ আষাঢ়, ১৩১৮  শিলাইদহ

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতাবোধ
হাবিবুর রহমান স্বপন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে জাত-পাত ছিল না। যদিও তখন জাত-পাতের বিষয়টি ছিল প্রকট। শাহজাদপুরের কাছারিবাড়িতে ১৮৯১ সালে (যখন জাত-ধর্ম প্রবল) মুসলমান বাবুর্চি এনাত আলীর হাতের রান্না খেতেন। অতি দরিদ্র এনাত আলী ভাল রান্না করতেন। পতিসরে জমিদারবাড়িতে যে বাবুর্চি ছিলেন তিনিও ছিলেন মুসলমান। শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথের ভৃত্য মোমিন মিঞা একদিন সকালে কাজে আসে বিলম্বে। ঘুম থেকে উঠে কবি দেখলেন পানি না থাকায় স্নান করা যাচ্ছে না। বেশ দেরিতে মোমিন মিঞা আসলে রবীন্দ্রনাথ রাগতস্বরে বললেন কোথায় ছিলি এতক্ষণ? শোকবিহ্বল কণ্ঠে মোমিন মিঞা উত্তর দেয়_ 'রাত দুপুরে আমার ৮ বছরের মেয়ে মারা গেছে।' এ কথা শুনে কবিমন বেদনায় গলে গেল। প্রভুচিত্তের আড়াল থেকে বেড়িয়ে এলো একটি চিরন্তন মানবমন। কবি ভাবলেন এক্ষেত্রে তো মোমিনের কোন দোষ নেই। ভৃত্য হলেও সে তো মানুষ, মানুষের মতো সুখ দুঃখবোধ তো তারও আছে। কবি তখনই মোমিন মিঞাকে ছুটি দিয়ে দিলেন। মোমিন মিঞার এই ঘটনা নিয়েই রবীন্দ্রনাথ 'চৈতালী' কাব্য গ্রন্থে 'কর্ম ' নামে কবিতা লেখেন।
শাহজাদপুরের নিকটবর্তী মাদলা গ্রামের গরিব মাঝি রামগতি খাজনা পরিশোধ না করতে পারায় তার জমি নিলামে ওঠে। রামগতি মাঝি একদিন শাহজাদপুর কাছারিবাড়িতে চিতল মাছ আনেন জমিদার বাবুকে উপহার দেয়ার জন্য। রবীন্দ্রনাথ মাছ খেয়ে খুশি হয়ে রামগতিকে ডাকলেন। রামগতি জমিদার বাবুর কাছে তার জমি নিলাম সংক্রান্ত বিষয়টি অবহিত করলে জমিদার রবীন্দ্রনাথ তার সাত বছরের খাজনা মাফ করে দেন। সঙ্গে তার মাছের দাম দুই টাকা পরিশোধ করে দেয়ার নির্দেশ দেন পেশকারকে।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী কবি। রবীন্দ্রসাহিত্যের প্রধান ধর্ম-মানবধর্ম। বিশ্বের অনাদৃত, শোষিত- তথাকথিত নিম্ন শ্রেণীর সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁর সমবেদনা ও সহানুভূতি ছিল যেমন গভীর তেমনি আন্তরিক। এজন্যেই তো তিনি বিশ্বকবি। যৌবনে শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসরে অবস্থানকালে জমিদারীর কাজকর্ম দেখাশোনার সময়েই তাঁর উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব রূপায়ণ দেখা যায় দুঃস্থ প্রজাদের কল্যাণে নানা পরিকল্পনা গ্রহণের মধ্যে। আদর্শ জমিদার রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন দরিদ্র কৃষকদের উন্নতি করতে হলে তাদেরকে মহাজনের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। সেজন্যে প্রয়োজন কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের। তাই তিনি নোবেল পুরস্কারের ১ লাখ ৮ হাজার টাকায় পতিসরে কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। তাছাড়া কৃষির প্রকৃত উন্নতি করতে হলে যে জমির প্রকৃত মালিকানা কৃষকদের দেয়া প্রয়োজন সে কথা অনুভব করে পরবর্তীকালে তিনি রাশিয়ার চিঠিতে লিখেছিলেন- 'চাষিকে আত্মশক্তিতে দৃঢ় করে তুলতে হবে, এই ছিল আমার অভিপ্রায়। এ সম্বন্ধে দুটো কথা সর্বদাই আমার মনে আন্দোলিত হয়েছে_ জমির স্বত্ব ন্যায়ত জমিদারের নয়, সে চাষির ...।' তিনি আরও অনুভব করেছিলেন যে দরিদ্র কৃষকদের উন্নতি করতে হলে, দুঃখ দূর করতে হলে 'জনসাধারণের প্রতি দরদ-বোধ প্রয়োজন।' দুঃখীর দুঃখ দূরীকরণে রবীন্দ্রনাথের আনত্মরিক প্রচেষ্টার পরিচয় পাওয়া যায় শিলাইদহের কৃষকদের ডেকে সমবায়ভিত্তিক কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যে। রবীন্দ্রনাথের এই মানবপ্রীতি তথা সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর সহানুভূতি ও সমবেদনা ধীরে ধীরে যে পূর্ণতর রূপ লাভ করেছে তা তাঁর বিভিন্ন ধরনের রচনা পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রত্যেক্ষ সংযোগের ফলে রবীন্দ্রনাথ আপন জমি থেকে বঞ্চিত কৃষকের মনোবেদনা কত গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন তা 'চিত্র' কাব্যের 'দুই বিঘা জমি' কবিতাটি পড়লেই বোঝা যায়। উপেনের প্রতি ভূ-স্বামীর অত্যাচারের চিত্র তাই জীবন্ত হয়ে উঠেছে এবং নিঃস্ব উপেনের প্রতি কবির গভীর সমবেদনা প্রকাশিত হয়েছে।
গরিব প্রজাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর সখ্য ছিল। ১৯৩৭ সালের ২৬ জুলাই কবি শেষ বারের মতো পতিসর আসেন। তখন সাম্প্রদায়িক দুর্দিন চলছিল। পতিসরের মুসলমানবহুল প্রজাদের পক্ষ থেকে কবিকে দেয়া হয় মুদ্রিত শ্রদ্ধাঞ্জলি। "প্রভুরুপে হেথা আস নাই তুমি দেব রূপে এসে দিলে দেখা, দেবতার দান অক্ষয় হউক হৃদিপটে থাক্ স্মৃতিরেখা।" একজন বৃদ্ধ মুসলমান কৃষক কবিকে বলেন, "আমরা তো হুজুর বুড়ো হয়েছি, আমরাও তো চলতি পথে, আপনিও চলতি পথে; বড়ই দুঃখ হয়, প্রজা-মনিবের এমন মধুর সম্বন্ধের ধারা বুঝি বন্ধ হয়ে যায়। ছেলেপিলেদের মতি-গতি বদলে যাচ্ছে, তারা আমাদের সব নাদান মনে করে। এমন জমিদারের জমিদারিতে বাস করবার সৌভাগ্যবোধ তাদের বুঝি হবে না।" রবীন্দ্রনাথ মৃতু্যর পূর্বে গরিব প্রজাদের এসব স্মৃতিচারণ করেন অশ্রম্নসজল চোখে।
পিতা যখন রবীন্দ্রনাথকে জমিদারি কাজের দায়িত্ব দিয়ে পূর্ব বাংলায় পাঠালেন তিনি শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে এসে দেখলেন প্রজাদের বসবার জন্য আসনের তারতম্য। প্রজারা কেউ বা বসেছেন চৌকিতে, কেউ বা পাটিতে আবার কেউ বা বসেছেন মাটিতে। এই বিষয়টি যুবক কবি জমিদার রবীন্দ্রনাথের ভাল লাগেনি। জমিদারদের রীতি-রেওয়াজকে তুচ্ছজ্ঞান করে, তিনি প্রজাদের সম্মানের কথা বিবেচনা করে সম আসনের ব্যবস্থা করেন। প্রজারা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে বিরক্ত হতেন এবং বাধা দিতেন। শাহজাদপুরের প্রধান কর্মচারী বিপিনচন্দ্রকে ডেকে বলেন, 'সবাই আমার প্রজা, আমার কাছে সবাই সমান, বেণী ম-ল, আলি নেওয়াজ খাঁ। হিন্দু ব্রাহ্মণ এরা ফরাসে বসবেন, আর মুসলমান বা নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা ভদ্রলোক হলেও, শিক্ষিত হলেও আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে! এর পর থেকে সকলকেই ফরাসে বসার ব্যবস্থা করা হয়। প্রথম জমিদারির দায়িত্ব পেয়েই রবীন্দ্রনাথ শাহজাদপুর এলাকার গরিব প্রজাদের ১ লাখ ৮ হাজার টাকা খাজনা মাফ করে দিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি চিঠি থেকে প্রমাণ মেলে তিনি প্রজাদের কল্যাণে কাজ করেছেন। মানুষের দুঃখে তাঁর হৃদয় ব্যথিত হতো। তিনি লিখেছেন,'আমি জমিদারিকে কেবল নিজের লাভ-লোকসানের দিক হইতে দেখিতে পারি না। অনেকগুলি লোকের মঙ্গল আমাদের উপর নির্ভর করে ইহাদের প্রতি কর্তব্য পালনের দ্বারা ধর্মরক্ষা করিতে হইবে।' রবীন্দ্রনাথের উদারতার প্রমাণ মেলে তাঁর জামাতাকে লেখা চিঠি থেকে। 'মনে রেখো জমিদারদের টাকা চাষিদের টাকা এবং চাষিরাই তোমাদের শিক্ষার ব্যয় ভার নিজেরা আধপেটা খেয়ে না খেয়ে বহন করছে এদের এই ঋণ সম্পূর্ণ শোধ করবার দায় তোমাদের উপর রইল। নিজেদের সাংসারিক উন্নতির চেয়েও এইটাই তোমাদের প্রথম কর্তব্য হবে।'
অস্পৃশ্যতা যে আমাদের একটি বিরাট সামাজিক ব্যাধি রবীন্দ্রনাথ তা বহুদিন থেকেই অনুভব করেছেন। অস্পৃশ্য বলে যে বিরাট জনসমাজকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, অবমাননার অতলে তলিয়ে রাখা হয়েছে, তাদেরকে যদি কাছে টেনে নেয়া না যায়, ওপরে ওঠানো না যায় তাহলে সমাজব্যবস্থা একদিন না একদিন ভেঙ্গে পড়বেই। 'গীতাঞ্জলি'র ১০৮ সংখ্যক কবিতাতেই কবি তাঁর ক্ষোভ, হতাশা ও বেদনার কথা সুদৃঢ়ভাবে প্রকাশ করে বলেছেন_
হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
মানুষের অধিকারে
বঞ্চিত করেছে যারে,
সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান,
অপমান হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে
ঘৃণা করিয়াছ তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে।
১৩১৭ সালের ২০ আষাঢ় (১৯১০ খ্রিস্টাব্দে) রবীন্দ্রনাথ এই কবিতাটি লেখেন। তখনও ভারতবর্ষে অস্পৃশ্যতার বিরম্নদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। কিন্তু গীতাঞ্জলি-গীতালি-গীতিমাল্য পর্বে কবির অরূপানুভূতি যতই গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে তাঁর মানবপ্রীতিও ততই ঘনিষ্ঠ ও সর্বাঙ্গীণ হয়ে উঠেছে। এই পর্বেই রচিত তাঁর 'অচলায়তন' (রচনা সমাপ্তিকাল ১৫ আষাঢ় ১৩১৮, প্রকাশ : প্রবাসী/আশ্বিন, ১৩১৮) নাটকে অস্পৃশ্যতা ও পুরনো কুসংস্কারের সহায়তাতেই দাদাঠাকুর বা গোঁসাই অচলায়তনের কুসংস্কারের প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলেছেন। যাদের অচলায়তন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল অচলায়তনের 'গুর' (?) তাদের তো দূরে সরিয়ে রাখেনইনি পরন্তু তিনি তাদের একানত্ম আপনজনে পরিণত হয়েছেন। দাদাঠাকুর রবীন্দ্র-অঙ্কিত একজন শ্রেষ্ঠ সমাজ-বিপস্নবী।
'রথের রশি' নাটকটিতেও অস্পৃশ্যতার বিরম্নদ্ধে রবীন্দ্রনাথের বিশিষ্ট ভাবনার পরিচয় মেলে। এখানেও তিনি দেখিয়েছেন যারা অবমানিত, লাঞ্ছিত তাদের স্পর্শেই মহাকালের অচল রথ চলছে। কবি নাটকটির মূল ভাবটি পরিস্ফুট করতে গিয়ে লিখেছিলেন- 'মানুষে মানুষে যে সম্বন্ধ বন্ধন দেশে দেশে যুগে-যুগে প্রসারিত, সেই বন্ধনই এই রথ টানবার রশি। সেই বন্ধনে অনেক গ্রন্থি পড়ে গিয়ে মানব-সম্বন্ধ অসত্য ও অসমান হয়ে গেছে, তাই চলছে না রথ। এই সম্বন্ধের অসত্য এতকাল যাদের বিশেষভাবে পীড়িত করেছে, অবমানিত করেছেন তাঁর রথের বাহনরূপে; তাদের অসম্মান ঘুচলে তবে সম্বন্ধের অসাম্য দূর হয়ে রথ সম্মুখের দিকে চলবে।'
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯১ সালের ১ ফেব্রম্নয়ারি শাহজাদপুর থেকে ভাতিজি ইন্দিরা দেবীকে চিঠিতে লিখেছিলেন, "প্রজারা যখন সসম্ভ্রম কাতরভাবে দরবার করে এবং আমলারা বিনীত করজোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন আমার মনে হয় এদের চেয়ে এমনি আমি কী মসত্ম লোক যে আমি একটু ইঙ্গিত করলেই এদের জীবন রক্ষা এবং আমি একটু বিমুখ হলেই এদের সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। আমি যে চৌকিটার উপরে বসে বসে ভান করছি যেন এই সমসত্ম মানুষের থেকে আমি একটি স্বতন্ত্র সৃষ্টি, আমি এদের হর্তাকর্তা বিধাতা, এর চেয়ে অদ্ভুত আর কি হতে পারে! অনত্মরের মধ্যে আমিও যে এদেরই মতো দরিদ্র সুখ-দুঃখ কাতর মানুষ, পৃথিবীতে আমারও কত ছোট ছোট বিষয়ে দরবার, কত সামান্য কারণে মমর্ানত্মিক কান্না কত লোকের প্রসন্নতার উপরে জীবনের নির্ভর। এই সমসত্ম ছেলে পিলে-গোরু লাঙল, ঘর-কন্না ওয়ালা সরল হৃদয় চাষা-ভূষারা আমাকে কী ভুলই জানে! আমাকে এদের সমজাতি মানুষ বলেই জানে না।
অস্পৃশ্য নিম্ন শ্রেণীর মানুষের প্রতি রবীন্দ্রনাথের সমবেদনা ও সহানুভূতি যে কত গভীর ছিল তা আরও নানা রচনা বিশেস্নষণ করেও দেখানো যেতে পারে। তবে মূল কথাটি হলো মানবতাবাদী কবি অনুভব করেছিলেন যে এক ভারত গড়ে তুলতে হলে সব জাতি ও সব ধর্মের মধ্যে সমন্বয় একানত্ম প্রয়োজন। বিভেদমূলক দৃষ্টিভঙ্গি দেশকে চরম দুরবস্থায় ঠেলে দেবে। তাই কেবল ব্রাহ্মহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্রের ব্যবধান দূর করলেই চলবে না_হিন্দু-মুসলমান-জৈন-খ্রীস্টান-বৌদ্ধ-প্রভৃতির মধ্যসত্ম ধর্মীয় ব্যবধানও দূর করতে হবে। 'সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থ নীরেই যে ভারতের পুণ্য অভিষেক সম্ভব_ এই ছিল তাঁর একানত্ম বিশ্বাস। আর তাঁর সেই দৃষ্টিভঙ্গি যে একজন সহৃদয় ও মহান মানবাতাবাদীর দৃষ্টিভঙ্গি সে কথা বলাই বাহুল্য।
লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

অন্ত্যজ, রবীন্দ্রনাথ ও মানবতাবোধ
 হাবিবুর রহমান স্বপন
কোন জাতপাতের বিচার করতেন না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যদিও জাত-পাতের বিষয়টি সে-সময়ে প্রকট আকার ধারণ করেছিল। শাহজাদপুরের কাছারি বাড়িতে ১৮৯১ সালে (যখন জাত-ধর্ম প্রবল) মুসলমান বাবুর্চি এনাত আলীর হাতের রান্না খেতে হতো তাঁকে। অতি দরিদ্র এনাত আলী ভাল রান্না করতেন। শিলাইদহ এবং পতিসরে জমিদার বাড়িতে যে বাবুর্চি ছিলেন তারাও ছিলেন মুসলমান। শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথের ভৃত্য মোমিন মিঞা একদিন সকালে কাজে আসে বিলম্বে। ঘুম থেকে উঠে কবি দেখলেন পানি না থাকায় স্নান করা যাচ্ছে না। বেশ দেরিতে মোমিন মিঞা এলে রবীন্দ্রনাথ রাগতঃস্বরে বললেন_ 'কোথায় ছিলি এতক্ষণ?' শোক বিহ্বল কণ্ঠে মোমিন মিঞা উত্তর দেয়, 'রাত দুপুরে আমার ৮ বছরের মেয়ে মারা গেছে।' এ কথা শুনে কবি মনোবেদনায় গলে গেলেন। প্রভুচিত্তের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো একটি চিরন্তন মানবমন। কবি ভাবলেন এক্ষেত্রে তো মোমিনের কোন দোষ নেই। ভৃত্য হলেও সে তো মানুষ, মানুষের মত সুখ দুঃখবোধ তো তারও আছে। কবি তখনই মোমিন মিঞাকে ছুটি দিয়ে দিলেন। মোমিন মিঞার এই ঘটনা নিয়েই রবীন্দ্রনাথ 'চৈতালী' কাব্যগ্রন্থে 'কর্ম' নামে কবিতা লেখেন।
শাহজাদপুরের নিকটবর্তী মাদলা গ্রামের গরিব মাঝি রামগতি খাজনা পরিশোধ না করতে পারায় তার জমি নিলামে ওঠে। রামগতি মাঝি একদিন শাহজাদপুর কাছারি বাড়িতে চিতল মাছ নিয়ে হাজির হয় জমিদার বাবুকে ঊপহার দেয়ার জন্য। রবীন্দ্রনাথ মাছ খেয়ে খুশি হয়ে রামগতিকে ডাকলেন। রামগতি জমিদার বাবুর কাছে তার জমি নিলাম সংক্রান্ত বিষয়টি অবহিত করলে জমিদার রবীন্দ্রনাথ তার সাত বছরের খাজনা মাফ করে দেন। সঙ্গে তার মাছের দাম দুই টাকা পরিশোধ করে দেয়ার নির্দেশ দেন পেশকারকে। 
শাহজাদপুরের 'হরকান্ত চক্রবর্তীর বাকি খাজনার নালিশের খরচা ও ড্যামেজ' মাফ করে দিয়েছিলেন এবং তোরাপ আলী ম-লের আবেদন মঞ্জুর করে লেখেন, 'জলি জমি যাহা ভোগ করিতেছে তাহা কায়েমি স্বরূপে দেওয়া যায়'। জমিদারি ছিল এজমালি অর্থাৎ অন্যান্য শরিকদের সাথে। তিনি ছিলেন সেটা পরিচালনার দায়িত্বে। তাই জমিদার কবি রবীন্দ্রনাথ (১৯১৭ খৃঃ) তাঁর মনের দুঃখের কথা প্রমথ চৌধুরীকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, "আমার দুঃখ... প্রজাদের জন্য লোকসান করবার পূর্ণ অধিকার আমার হাতে নেই, তা হলে আমি শান্তি নিকেতন ছেড়ে আমি ওদের মধ্যে গিয়ে বসতুস্ত্তমনের সাধে বিষয় নষ্ট করতে করতে সুখে মরতুম।... ডাক্তার ও ডাক্তারখানায় আমাদের জমিদারীর এবং চতুপাশ্র্বের লোকের বিশেষ উপকার হয়েছে এই কথা যখন শুনতে পাই তখন সকল অভাবের দুঃখের উপর ঐ সুখটাই বড় হয়ে ওঠে।" ইংরেজ বন্ধু পীয়ার্সন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পতিসর এসে এক সপ্তাহ ছিলেন। তিনি লিখেছেন, 'রবীন্দ্রনাথকে তাঁর প্রজাদের সঙ্গে দেখা খুবই আনন্দের। ওরা তাকে গভীরভাবে ভালবাসে।'
পর পর কয়েক বছর বন্যা ও খরায় ভাল ফসল না হওয়ায় দুর্দশাগ্রস্ত প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের ব্যাপারে পতিসরের নায়েব শৈলেশচন্দ্র মজুমদারকে চাপ না দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বহু প্রজার খাজনা মাফ করে দিয়েছেন। কবি অমিয় চক্রবর্তীকে তিনি লিখেছিলেন, 'প্রজারা নিঃস্ব, শস্যের দাম অসম্ভব কমে গেছে, খাজনা প্রায় একেবারেই বন্ধ। নোবেল প্রাইজের সুদ বন্ধ'। উল্লেখ্য রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কারের প্রাপ্ত সমস্ত টাকা দিয়ে পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন কৃষকের উন্নতির জন্য। এসময় যে ঋণ দেয়া হয়েছিল কৃষকদের, সেই ঋণ কৃষকরা শোধ করতে পারছেন না, তার কথাই তিনি উক্ত চিঠিতে উল্লেখ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ পুত্র এবং জামাতাদের এসময় চিঠি লেখেন 'তোমরা দুর্ভিক্ষপীড়িত প্রজার অন্নগ্রাসের অংশ নিয়ে বিদেশে কৃষি শিখতে গেছ_ ফিরে এসে এই হতভাগ্যদের অন্নগ্রাস কিছু পরিমাণেও যদি বাড়িয়ে দিতে পার তাহলে মনে সান্ত্বনা পাব। মনে রেখো জমিদারের টাকা চাষীর টাকা এবং এই চাষীরাই তোমাদের শিক্ষার ব্যয়ভার নিজেরা আধপেটা খেয়ে এবং না খেয়ে বহন করছে। এদের ঋণ সম্পূর্ণ শোধ করবার দায় তোমাদের উপর রইল। নিজেদের সাংসারিক উন্নতির চেয়েও এইটেই তোমাদের প্রথম কর্তব্য হবে।' ছোট্ট এই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের সমাজচেতনা এবং মানবিকবোধের প্রকাশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথই বলতে পারেন এবং বলেছেন, 'জমির স্বত্ব ন্যায়ত জমিদারের নয়, সে চাষীর।' তিনি বলেছিলেন, চাষীকে আত্মশক্তিতে দৃঢ় করে তুলতে হবে। যাতে জমিদার তাদের উপর অন্যায় অত্যাচার করার সুযোগ না পায়।' 
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী কবি। রবীন্দ্রসাহিত্যের প্রধান ধর্ম_ মানবধর্ম। বিশ্বের অনাদৃত, শোষিত-তথাকথিত নিম্ন শ্রেণীর সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁর সমবেদনা ও সহানুভূতি ছিল যেমন গভীর তেমনি আন্তরিক। এজন্যেই তো তিনি বিশ্ব কবি। যৌবনে শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসরে অবস্থানকালে জমিদারীর কাজকর্ম দেখাশোনার সময়েই তাঁর উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব রূপায়ণ দেখা যায় দুঃস্থ প্রজাদের কল্যাণে নানা পরিকল্পনা গ্রহণের মধ্যে। আদর্শ জমিদার রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন দরিদ্র কৃষকদের উন্নতি করতে হলে তাদেরকে মহাজনের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। সেজন্যে প্রয়োজন কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের। তাই তিনি নোবেল পুরস্কারের ১ লাখ ৮ হাজার টাকায় পতিসরে কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। তাছাড়া কৃষির প্রকৃত উন্নতি করতে হলে যে জমির প্রকৃত মালিকানা কৃষকদেরকে দেওয়া প্রয়োজন সেকথা অনুভব করে পরবর্তীকালে তিনি রাশিয়ার চিঠিতে লিখেছিলেন_ 'চাষীকে আত্মশক্তিতে দৃঢ় করে তুলতে হবে, এই ছিল আমার অভিপ্রায়। এ সম্বন্ধে দুটো কথা সর্বদাই আমার মনে আন্দোলিত হয়েছে_ জমির স্বত্ব ন্যায়ত জমিদারের নয়, সে চাষীর ...।' তিনি আরও অনুভব করেছিলেন যে দরিদ্র কৃষকদের উন্নতি করতে হলে, দুঃখ দূর করতে হলে 'জনসাধারণের প্রতি দরদবোধ প্রয়োজন'। দুঃখীর দুঃখ দূরীকরণে রবীন্দ্রনাথের আন্তরিক প্রচেষ্টার পরিচয় পাওয়া যায় শিলাইদহের কৃষকদের ডেকে সমবায় ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যে। রবীন্দ্রনাথের এই মানবপ্রীতি তথা সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর সহানুভূতি ও সমবেদনা ধীরে ধীরে যে পূর্ণতর রূপ লাভ করেছে তা তাঁর বিভিন্ন ধরনের রচনা পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগের ফলে রবীন্দ্রনাথ আপন জমি থেকে বঞ্চিত কৃষকের মনোবেদনা কত গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন তা 'দুইবিঘা জমি' কবিতাটি পড়লেই বোঝা যায়। উপেনের প্রতি ভূ-স্বামীর অত্যাচারের চিত্র তাই জীবন্ত হয়ে উঠেছে এবং নিঃস্ব উপেনের প্রতি কবির গভীর সমবেদনা প্রকাশিত হয়েছে।
গরিব প্রজাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর সখ্য ছিল। ১৯৩৭ সালের ২৬ জুলাই কবি শেষ বারের মত পতিসর আসেন। তখন সাম্প্রদায়িক দুর্দিন চলছিল। পতিসরের মুসলমান বহুল প্রজাদের পক্ষ থেকে কবিকে দেয়া হয় মুদ্রিত শ্রদ্ধাঞ্জলি। "প্রভুরূপে হেথা আস নাই তুমি দেব রূপে এসে দিলে দেখা, দেবতার দান অক্ষয় হউক হৃদিপটে থাক্ স্মৃতিরেখা।" একজন বৃদ্ধ মুসলমান কৃষক কবিকে বলেন, "আমরা তো হুজুর বুড়ো হয়েছি, আমরাও তো চলতি পথে, আপনিও চলতি পথে; বড়ই দুঃখ হয়, প্রজা-মনিবের এমন মধুর সম্বন্ধের ধারা বুঝি বন্ধ হয়ে যায়। ছেলে-পিলেদের মতি-গতি বদলে যাচ্ছে, তারা আমাদের সব নাদান মনে করে। এমন জমিদারের জমিদারিতে বাস করবার সৌভাগ্যবোধ তাদের বুঝি হবে না।" রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর পূর্বে গরিব প্রজাদের এসব স্মৃতিচারণ করেন অশ্রু সজল চোখে।
পিতা যখন রবীন্দ্রনাথকে জমিদারি কাজের দায়িত্ব দিয়ে পূর্ব বাংলায় পাঠালেন তিনি শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে এসে দেখলেন প্রজাদের বসবার জন্য আসনের তারতম্য। প্রজারা কেউ বা বসেছেন চৌকিতে কেউ বা পাটিতে আবার কেউ বা বসেছেন মাটিতে। এই বিষয়টি যুবক কবি জমিদার রবীন্দ্রনাথের ভাল লাগেনি। জমিদারদের রীতি-রেওয়াজকে তুচ্ছ জ্ঞান করে, তিনি প্রজাদের সম্মানের কথা বিবেচনা করে সম আসনের ব্যবস্থা করেন। প্রজারা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে বিরক্ত হতেন এবং বাধা দিতেন। শাহজাদপুরের প্রধান কর্মচারী বিপিনচন্দ্রকে ডেকে বলেন, 'সবাই আমার প্রজা, আমার কাছে সবাই সমান, বেনী ম-ল, আলি নেওয়াজ খাঁ, হিন্দু ব্রাহ্মণ এরা ফরাসে বসবেন, আর মুসলমান বা নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা ভদ্রলোক হলেও, শিক্ষিত হলেও আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে!' এর পর থেকে সকলকেই ফরাসে বসার ব্যবস্থা করা হয়। প্রথম জমিদারির দায়িত্ব পেয়েই রবীন্দ্রনাথ শাহজাদপুর এলাকার গরিব প্রজাদের ১ লাখ ৮ হাজার টাকা খাজনা মাফ করে দিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি চিঠি থেকে প্রমাণ মেলে তিনি প্রজাদের কল্যাণে কাজ করেছেন। মানুষের দুঃখে তাঁর হৃদয় ব্যথিত হতো। তিনি লিখেছেন, 'আমি জমিদারিকে কেবল নিজের লাভ-লোকসানের দিক হইতে দেখিতে পারি না। অনেকগুলি লোকের মঙ্গল আমাদের উপর নির্ভর করে ইহাদের প্রতি কর্তব্য পালনের দ্বারা ধর্মরক্ষা করিতে হইবে'। রবীন্দ্রনাথের উদারতার প্রমাণ মেলে তাঁর ছেলে ও জামাতাকে লেখা চিঠি থেকে। 'মনে রেখো জমিদারদের টাকা চাষীদের টাকা এবং চাষীরাই তোমাদের শিক্ষার ব্যয়ভার নিজেরা আধপেটা খেয়ে না খেয়ে বহন করছে এদের এই ঋণ সম্পূর্ণ শোধ করবার দায় তোমাদের উপর রইল। নিজেদের সাংসারিক উন্নতির চেয়েও এইটাই তোমাদের প্রথম কর্তব্য হবে।'
অস্পৃশ্যতা যে আমাদের একটি বিরাট সামাজিক ব্যাধি রবীন্দ্রনাথ তা বহুদিন থেকেই অনুভব করেছেন। অস্পৃশ্য বলে যে বিরাট জনসমাজকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, অবমাননার অতলে তলিয়ে রাখা হয়েছে, তাদেরকে যদি কাছে টেনে নেওয়া না যায়, ওপরে ওঠানো না যায় তাহলে সমাজ-ব্যবস্থা একদিন না একদিন ভেঙ্গে পড়বেই। 'গীতাঞ্জলি'র ১০৮ সংখ্যক কবিতাতেই কবি তাঁর ক্ষোভ, হতাশা ও বেদনার কথা সুদৃঢ়ভাবে প্রকাশ করে বলেছেন_ 
হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
মানুষের অধিকারে
বঞ্চিত করেছে যারে,
সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে
ঘৃণা করিয়াছ তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে।
১৩১৭ সালের ২০ আষাঢ় (১৯১০ খৃস্টাব্দে) রবীন্দ্রনাথ এই কবিতাটি লেখেন। তখনো ভারতবর্ষে অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। কিন্তু গীতাঞ্জলি-গীতালি-গীতিমাল্য পর্বে কবির অরূপানুভূতি যতই গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে তাঁর মানবপ্রীতিও ততই ঘনিষ্ঠ ও সর্বাঙ্গীন হয়ে উঠেছে। এই পর্বেই রচিত তাঁর 'অচলায়তন' (রচনা সমাপ্তিকাল ১৫ আষাঢ় ১৩১৮, প্রকাশ : প্রবাসী/ আশ্বিন, ১৩১৮) নাটকে অস্পৃশ্যতা ও পুরোনো কুসংস্কারের সহায়তাতেই দাদাঠাকুর বা গোঁসাই অচলায়তনের কুসংস্কারের প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলেছেন। যাদেরকে অচলায়তন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল অচলায়তনের 'গুরু' (?) তাদেরকে তো দূরে সরিয়ে রাখেনই-নি উপরন্তু তিনি তাদের একান্ত আপনজনে পরিণত হয়েছেন। দাদাঠাকুর রবীন্দ্র-অঙ্কিত একজন শ্রেষ্ঠ সমাজ-বিপ্লবী।
'পুনশ্চ' কাব্যের কয়েকটি কবিতায় রবীন্দ্রনাথের উদার মানবীয় ভাবের সার্থক প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে সে সময়ের অস্পৃশ্যতা সমস্যা অবলম্বনে রচিত "প্রথম পূজাও "শুচি" কবিতা দু'টিতে অস্পৃশ্যদের সম্বদ্ধে রবীন্দ্রনাথের মনোভাবের সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। ডাঃ ক্ষুদিরাম দাস 'প্রথম পূজা' কবিতাটি সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন_ 'কবি তাঁর গভীর সহানুভূতি ও সমাজ-অধ্যয়ন নিয়ে লক্ষ্য করেছেন আর্য শ্রেণীতে ব্রাহ্মহ্মণ-ক্ষত্রিয়াদি কীভাবে অনার্য ও নিম্নবর্ণের সংস্কৃতি আত্মসাৎ করে ঐ নিম্নবর্ণের মানুষদের নিষ্ঠুরভাবে বঞ্চিত করেছে তাদের নিজস্ব সম্পদ থেকে।' ত্রিলোকেশ্বরের যে মন্দিরে হাজার বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেছিল কিরাত সম্প্রদায়ের লোকেরা, _ক্ষত্রিয়রা একদিন তাদেরকে পরাভূত করে তাদের দেবতাদের ওপরও আধিপত্য বিস্তার করে। ক্ষত্রিয়রা কিরাতদেরকে সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে_ মন্দিরের দেবতার দর্শন পায় না তারা_ 'কিরাত আজ অস্পৃশ্য, এ মন্দিরে তাদের প্রবেশপথ লুপ্ত।' কিন্তু যাদের দেবতা তদেরকে দেবতার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়াতে দেবতার রোষাগি্নতে ভেঙ্গে পড়ে মন্দির, দেবতার মূর্তিও বিদীর্ণ হয়ে যায়। কিরাতরা ছাড়া আর কারাও জানে না মন্দির আর মূর্তি গড়ার রহস্য। তাই রাজা নিরুপায় হয়ে ডাক দেন কিরাতদের সর্দার মাধবকে_ 
'তোমরা না হলে দেবালয় সংস্কার হয় না।'
দেবতাকে ছুঁলে পাপ হয় না, ক্ষতি হয় না দেবতার, _শুধু কিরাতের নগ্ন দৃষ্টি দিয়ে
দেখলে দেবতা অপবিত্র হয়ে যায়! তাই অন্তরের দৃষ্টি দিয়ে কাজ করার পর অন্তর্যামীর
মূর্তি সম্পূর্ণ হলে মাধব তাঁকে না দেখে আর পারে না। _চোখের বাঁধন খুলে ফেলে_
একদৃষ্টে চেয়ে রইল দেবতার মুখে,
দু'চোখে বইল জলের ধারা।
আজ হাজার বছরের ক্ষুধিত দেখা দেবতার সঙ্গে ভক্তের।
কিন্তু ক্ষত্রিয় রাজা কি অস্পৃশ্য কিরাতদের এই স্পর্ধা সহ্য করতে পারেন। তাই_
রাজা প্রবেশ করলেন মন্দিরে।
তখন মাধবের মাথা নত বেদীমূলে।
রাজার তলোয়ারে মুহূর্তে ছিন্ন হল সেই মাথা।
দেবতার পায়ে এই প্রথম পূজা, এই শেষ প্রণাম।
'শুচি' কবিতাটিতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আচ-ালে কোল দানের আদর্শটিকে চৈতন্যভক্ত বৈষ্ণবগুরু রায় রামানন্দের আচরণের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। এই কবিতাটির মূল ভাবটি 'প্রথম পূজার'ই অনুরূপ। অশুচি বলে যাদেরকে মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি তাদের মধ্যেও যে দেবতার স্পর্শ রয়েছে তা উচ্চবর্ণের মানুষেরা ভুলে যায়_ তাই অন্তর্যামী গুরুকে মনে করিয়ে দেন_ 
ঠাকুর বললেন, 'আমার বাস কি কেবল বৈকুণ্ঠে।
সেদিন আমার মন্দিরে যারা প্রবেশ পায়নি
আমার স্পর্শ যে তাদের সর্বাঙ্গে
আমারই পাদোদক নিয়ে
প্রাণ প্রবাহিণী বইছে তাদের শিরায়।
তাদের অপমান আমাকে বেজেছে,
আজ তোমার হাতের নৈবেদ্য অশুচি।
রামানন্দ বুঝতে পারলেন তাঁর ভুল। তাই রাত্রি অবসানের পূর্বেই তিনি মন্দির থেকে বের হয়ে অস্পৃশ্য জোলা কবীরের কাছে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। অস্পৃশ্য ইতর সাধারণ মানুষদের মধ্যে যে বিস্ময়কর আসাধারণত্ব বর্তমান। কবি যেন তারই স্বরূপ উদ্্ঘাটন করেছেন উলি্লখিত কবিতা দুটিতে। মাধব আর কবীর তাঁদের আন্তরিক ভক্তি ও নিষ্ঠার জন্য উচ্চবর্ণের ব্যক্তিদের চেয়ে অনেক মহনীয় রূপলাভ করেছেন।
'রথের রশি' নাটকটিতেও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের বিশিষ্ট ভাবনার পরিচয় মেলে। এখানেও তিনি দেখিয়েছেন যারা অবমানিত, লাঞ্ছিত তাদের স্পর্শেই মহাকালের অচল রথ চলছে। কবি নাটকটির মূল ভাবটি পরিস্ফুট করতে গিয়ে লিখেছিলেন_ 'মানুষে মানুষে যে সম্বন্ধ বন্ধন দেশে দেশে যুগে-যুগে প্রসারিত, সেই বন্ধনই এই রথ টানবার রশি। সেই বন্ধনে অনেক গ্রন্থি পড়ে গিয়ে মানব-সম্বন্ধ অসত্য ও অসমান হয়ে গেছে, তাই চলছে না রথ। এই সম্বন্ধের অসত্য এতকাল যাদের বিশেষভাবে পীড়িত করেছে, অবমানিত করেছেন তাঁর রথের বাহনরূপে; তাদের অসম্মান ঘুচলে তবে সম্বন্ধের অসাম্য দূর হয়ে রথ সম্মুখের দিকে চলবে।'
পুরোহিত রাজা, বণিক কারও শক্তিতে যে রথ চলেনি শূদ্রের স্পর্শে সেই রথ চলেছে। এ যুগে শূদ্র-শক্তিই যে প্রধান শক্তি কবি বোধহয় এই নাটকটিতে সে ইঙ্গিতটিও দান করেছেন। মন্ত্রীর মুখ দিয়ে কবির উক্ত অভিপ্রায়টি এইভাবে প্রকশিত হয়েছে। _'রথযাত্রা আমাদের একটি পরীক্ষা। কাদের শক্তিতে সংসারটি সত্যিই চলছে, রথচক্র ঘোরার দ্বারা সেইটেই প্রমাণ হয়ে যাবে।' 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি শাহজাদপুর থেকে ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে চিঠিতে লিখেছিলেন, "প্রজারা যখন সসম্ভ্রম কাতরভাবে দরবার করে এবং আমলারা বিনীত করজোরে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন আমার মনে হয় এদের চেয়ে এমনি আমি কী মস্ত লোক যে আমি একটু ইঙ্গিত করলেই এদের জীবন রক্ষা এবং আমি একটু বিমুখ হলেই এদের সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। আমি যে চৌকিটার উপরে বসে বসে ভান করছি যেন এই সমস্ত মানুষের থেকে আমি একটি স্বতন্ত্র সৃষ্টি, আমি এদের হর্তাকর্তা বিধাতা, এর চেয়ে অদ্ভুত আর কি হতে পারে! অন্তরের মধ্যে আমিও যে এদেরই মতো দরিদ্র সুখ-দুঃখ কাতর মানুষ, পৃথিবীতে আমারও কত ছোটো ছোটো বিষয়ে দরবার, কত সামান্য কারণে মর্মান্তিক কান্না কত লোকের প্রসন্নতার উপরে জীবনের নির্ভর। এই সমস্ত ছেলে পিলে-গোরু লাঙল, ঘরকন্নাওয়ালা সরল হৃদয় চাষা-ভূষারা আমাকে কী ভুলই জানে! আমাকে এদের সমজাতি মানুষ বলেই জানে না।
কবি এই চিঠিতেই লিখেছেন 'প্রেজটিজ' মানে হচ্ছে মানুষ সম্মন্ধে মানুষের ভুল বিশ্বাস! আমাকে এখানকার প্রজারা যদি ঠিক জানত, তা হলে আপনাদের একজন বলে চিনতে পারত, সেই ভয়ে সর্বদা মুখোষ প'রে থাকতে হয়। রবীন্দ্রনাথ মানুষ হিসাবে যে অতি সাধারণ ছিলেন এসব লেখা থেকেই তার প্রমাণ মেলে অস্পৃশ্য নিম্ন শ্রেণীর মানুষের প্রতি রবীন্দ্রনাথের সমবেদনা ও সাহানুভূতি যে কত গভীর ছিল তা আরও নানা রচনা বিশ্লেষণ করেও দেখানো যেতে পারে। তবে মূল কথাটি হলো মানবতাবাদী কবি অনুভব করেছিলেন যে এক ভারত গড়ে তুলতে হলে সব জাতি ও সব ধর্মের মধ্যে সমন্বয় একান্ত প্রয়োজন। বিভেদমূলক দৃষ্টিভঙ্গি দেশকে চরম দূরবস্থায় ঠেলে দেবে। তাই কেবল ব্রাহ্মহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্রের ব্যবধান দূর করলেই চলবে না-হিন্দু-মুসলমান-জৈন-খ্রীস্টান-বৌদ্ধ-প্রভৃতির মধ্যস্থ ধর্মীয় ব্যবধানও দূর করতে হবে। 'সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরেই যে ভারতের পুণ্য অভিষেক সম্ভব_ এই ছিল তাঁর একান্ত বিশ্বাস। আর তাঁর সেই দৃষ্টিভঙ্গি যে একজন সহৃদয় ও মহান মানবাতাবাদীর দৃষ্টিভঙ্গি সে কথা বলাই বাহুল্য।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন, সাহিত্য ও দর্শন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (বাংলা ২৫ বৈশাখ, ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮) (খ্রিস্টীয় ৭ মে, ১৮৬১ – ৭ অগস্ট, ১৯৪১) ছিলেন বাংলা তথা ভারতের বিশিষ্ট কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার, সংগীতস্রষ্টা, নট ও নাট্যকার, চিত্রকর, প্রাবন্ধিক, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। তিনি বাংলা ভাষার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। রবীন্দ্রনাথকে 'গুরুদেব', 'বিশ্বকবি' ও 'কবিগুরু' অভিধায় অভিহিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস, ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। তাঁর মোট ৯৫টি ছোটগল্প এবং ১৯১৫টি গান যথাক্রমে 'গল্পগুচ্ছ' ও 'গীতবিতান' সংকলনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত এবং গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২টি খণ্ডে 'রবীন্দ্র রচনাবলী' নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য ১৯ খণ্ডে 'চিঠিপত্র' সংকলনে ও অন্য চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি প্রায় দু'হাজার ছবিও এঁকেছিলেন। তাঁর রচনা আজ বিশ্বের নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে ও হচ্ছে।

ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতার এক ধনাঢ্য সংস্কৃতিবান পিরালি ব্রাহ্মণ পরিবারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম। বাল্যে প্রথাগত শিক্ষা গ্রহণে তিনি অসম্মত হয়েছিলেন। তাই গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করে বাড়িতেই তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। মাত্র আট বছর বয়সে কাব্যরচনায় প্রবৃত্ত হন তিনি। ১৮৭৪ সালে 'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা'য় তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। কবিতাটির নাম ছিল 'অভিলাষ'। এটিই ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা। ১৮৭৮ সালে সতেরো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ প্রথম ইংল্যান্ড ভ্রমণ করেন। ১৮৮৩ সালে মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। ১৮৯০ সাল থেকে তিনি পূর্ববঙ্গের শিলাইদহের জমিদারি এস্টেটে বসবাস শুরু করেন। ১৯০১ সালে চলে আসেন পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে। এখানেই ব্রহ্মচর্যাশ্রম স্থাপন করে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। ১৯০২ সালে তাঁর পত্নীবিয়োগ হয়। ১৯০৫ সালে জড়িয়ে পড়েন বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে। ১৯১৩ সালে 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথই এশিয়া মহাদেশের প্রথম নোবেলজয়ী সাহিত্যিক। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধি প্রদান করে। কিন্তু ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি সেই উপাধি ত্যাগ করেন। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীনিকেতন। এই সংস্থা গ্রামীণ সমাজের সার্বিক উন্নয়নের কাজে আত্মনিয়োগ করে। ১৯২৩ সালে শান্তিনিকেতনেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বভারতী বিদ্যালয়। দীর্ঘজীবনে বহুবার বিদেশভ্রমণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রচার করেছিলেন সৌভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বমানবতার বাণী। ১৯৪১ সালে দীর্ঘ রোগভোগের পর কলকাতার পৈত্রিক বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রবীন্দ্রনাথের কাব্যসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য তাঁর ভাবগভীরতা, গীতিধর্মিতা চিত্ররূপময়তা, অধ্যাত্মচেতনা, ঐতিহ্যপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, রোম্যান্টিক সৌন্দর্যচেতনা, ভাব, ভাষা, ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র্য, বাস্তবচেতনা ও প্রগতিচেতনা। তাঁর গদ্যভাষাও কাব্যিক। ভারতের ধ্রুপদি ও লৌকিক সংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞানচেতনা ও শিল্পদর্শন তাঁর রচনায় গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে নিজ মতামত প্রকাশ করেছিলেন। গ্রামীণ উন্নয়ন ও গ্রামীণ জনসমাজে শিক্ষার বিস্তারের মাধ্যমে সার্বিক সমাজকল্যাণের তত্ত্ব প্রচার করতেন তিনি। পাশাপাশি সামাজিক ভেদাভেদ, অস্পৃশ্যতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধেও তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের দর্শনে ঈশ্বর এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অধিকারী। রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরের মূল নিহিত রয়েছে মানব সংসারের মধ্যেই। তিনি দেববিগ্রহের পরিবর্তে মানুষ অর্থাৎ কর্মী ঈশ্বরকে পূজার কথা বলতেন। সংগীত ও নৃত্যকে তিনি শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ মনে করতেন। রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ কীর্তি তাঁর গান। ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংগীত 'জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে' ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা' তাঁরই রচনা।

জীবন

*

উদয়দিগঙ্গনে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারে। তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মগুরু মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর পত্নী সারদাসুন্দরী দেবীর চতুর্দশ সন্তান। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার শুধু ব্রাহ্ম আদিধর্ম মতবাদের প্রবক্তাই ছিল না, বরং সেযুগের কলকাতার শ্রেষ্ঠ ধনী ও সংস্কৃতিবান পরিবার হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছিল। কিন্তু এহেন পরিবারের সন্তান হয়েও পিতামাতার সান্নিধ্য থেকে দূরে ভৃত্য ও অন্যান্য আত্মীয়দের শাসনে ছেলেবেলা কেটেছিল রবীন্দ্রনাথের। তাঁর নিজের ভাষায় সে ছিল 'ভৃত্যরাজক-তন্ত্র'। শৈশবে কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্ম্যাল স্কুল, বেঙ্গল অ্যাকাডেমি ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে কিছুদিন করে পড়াশোনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণহীন বিদ্যার আয়োজনে বিতৃষ্ণ হয়ে শেষ পর্যন্ত বালক রবীন্দ্রনাথ বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেন। তখন বাড়িতেই গৃহশিক্ষক রেখে তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। অতি শৈশবে একবার জোড়াসাঁকোর বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। গঙ্গাতীরে পানিহাটির বাগানবাড়িতে সেই প্রথম মুক্ত প্রকৃতির সংস্পর্শে আসেন তিনি।

প্রথম দেশভ্রমণের সুযোগ অবশ্য পেয়েছিলেন ১১ বছর বয়সে। ১৮৭৩ সালে তাঁর উপনয়ন হয়। বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেশভ্রমণের নেশা তাঁকে বছরের অধিকাংশ সময়ই দেশান্তরী করে রাখত। উপনয়নের পর দেবেন্দ্রনাথ পুত্রকে নিয়ে দেশভ্রমণে বের হন। প্রথমে তাঁরা আসেন শান্তিনিকেতনে। এখানে বসেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রথম নাটক 'পৃথ্বীরাজ পরাজয়' রচনা করেন। এই নাটকটির পাণ্ডুলিপি তাঁর জীব্বদশাতেই হারিয়ে যায়। শান্তিনিকেতনে কিছুকাল কাটিয়ে চলে যান পাঞ্জাবের অমৃতসরে। এখানে থাকাকালীন স্বর্ণমন্দিরে শিখদের ভজন ও উপাসনা পদ্ধতি চাক্ষুষ করেন পিতাপুত্র। এরপর আসেন ডালহৌসির নিকট বক্রোটা পাহাড়ের চূড়ায়। জায়গাটি বর্তমানে হিমাচল প্রদেশ রাজ্যে, সেই সময় অবশ্য পাঞ্জাবেরই অন্তর্গত ছিল। বক্রোটার বাংলোয় দেবেন্দ্রনাথ নিজে বালক রবীন্দ্রনাথকে কিছু কিছু পাঠ দিতে থাকেন। পিতার কাছে এই সময় রবীন্দ্রনাথ সংস্কৃত ব্যাকরণ, ইংরেজি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান ও ইতিহাসের পাঠ নিতে থাকেন। পিতার অনুপ্রেরণায় উৎসাহিত হন মহামানবদের জীবনী, কালিদাসের ধ্রুপদি সংস্কৃত কাব্য-নাটক এবং উপনিষদ্ পাঠে। ফিরে এসে গৃহশিক্ষক জ্ঞানচন্দ্র ভট্টাচার্যের কাছে পাঠগ্রহণকালে রবীন্দ্রনাথ শেকসপিয়রের 'ম্যাকবেথ' ও কালিদাসের 'কুমারসম্ভবম্' নাটকের কিয়দংশ অনুবাদ করেন।

১৮৭৪ সালে 'ভারতী' পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের 'অভিলাষ' কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটিই তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা। ১৮৭৫ সালে বার্ষিক হিন্দুমেলা উৎসব উপলক্ষ্যে তিনি রচনা করেন 'হিন্দুমেলার উপহার'। কবিতাটি প্রকাশিত হয় 'অমৃতবাজার পত্রিকা'য়। এই বছরই মাতৃবিয়োগ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের। ১৮৭৭ সালে 'ভারতী' পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা প্রকাশিত হয়। এগুলি হল 'মেঘনাদবধ কাব্যের সমালোচনা', ভানুসিং-ভণিতাযুক্ত রাধাকৃষ্ণ-বিষয়ক কবিতাগুচ্ছ (যা পরবর্তীকালে 'ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী' নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়) এবং 'ভিখারিণী' ও 'করুণা' নামে দুটি গল্প। উল্লেখ্য, 'ভিখারিণী' বাংলা সাহিত্যের প্রথম ছোটোগল্প। ১৮৭৭ সালেই দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'অলীকবাবু' নাটকে নামভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমে রঙ্গালয়ে আবির্ভাব ঘটে নট রবীন্দ্রনাথের। ১৮৭৮ সালে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'কবিকাহিনী'। এটি রবীন্দ্রনাথের প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থও বটে। এই বছরই বিলেত যাত্রার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সেকালের বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে অবস্থিত আমেদাবাদ শহরে যান রবীন্দ্রনাথ। সেখানে আনা তড়খড় নামে একটি মারাঠি মেয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই ব্যর্থ প্রণয়ের ছায়া পড়েছিল ১৮৮৪ সালে প্রকাশিত তাঁর 'নলিনী' নাট্যকাব্যে।

যৌবননিকুঞ্জে

১৮৭৮ সালে সদ্যযুবক রবীন্দ্রনাথ দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে গেলেন ইংল্যান্ডে। উদ্দেশ্য ছিল ব্যারিস্টার হওয়া। প্রথমে এলেন ব্রাইটনে। ভর্তি হলেন সেখানকার একটি পাবলিক স্কুলে। পরে ১৮৭৯ সালে ভর্তি হলেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুরু হল আইনবিদ্যা পাঠ। কিন্তু সাহিত্যের আকর্ষণে সেই পাঠ খুব একটা এগোল না। এই সময় শেকসপিয়র ও অন্যান্য ইংরেজ সাহিত্যিকদের রচনা নিবিড়ভাবে অধ্যয়নের সুযোগ পেলেন রবীন্দ্রনাথ। বিশেষ মনোযোগ দিয়ে পাঠ করলেন 'রিলিজিও মেদিচি', 'কোরিওলেনাস' ও 'অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা'। নিজের ইংল্যান্ড বাসের অভিজ্ঞতার কথা 'ভারতী' পত্রিকায় পত্রাকারে পাঠাতে থাকেন রবীন্দ্রনাথ। বড়োদাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের টীকা সহকারে 'য়ুরোপযাত্রী কোনো বঙ্গীয় যুবকের পত্রধারা' নামে প্রকাশিত হতে লাগল, সেই ভ্রমণবৃত্তান্ত। ১৮৮১ সালে 'য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র' নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিতও হল সেটি। 'য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র'ই রবীন্দ্রনাথের প্রথম গদ্যগ্রন্থ তথা চলিত ভাষায় লেখা প্রথম বই। দেড় বছর ইংল্যান্ডে কাটানোর পর ১৮৮০ সালে কোনো ডিগ্রি ছাড়াই দেশে ফিরে এলেন রবীন্দ্রনাথ। সঙ্গে আনলেন পাশ্চাত্য সংগীতের সুর ও অপেরা নাট্যশৈলী সম্পর্কে কিছু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার ফসল ১৮৮১ সালের 'বাল্মীকি-প্রতিভা'। ১৮৮২ সালে রমেশচন্দ্র দত্তের কন্যার বিবাহসভায় সদ্যপ্রকাশিত 'সন্ধ্যাসংগীত' কাব্যগ্রন্থ থেকে কবিতা পাঠ করলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই কবিতা শুনে নিজের গলার মালা খুলে রবীন্দ্রনাথের গলায় পরিয়ে দিয়েছিলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর (২৪ অগ্রহায়ণ, ১২৯০ বঙ্গাব্দ) ঠাকুরবাড়ির অধস্তন কর্মচারী বেণীমাধব রায়চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হল। বিবাহিত জীবনে ভবতারিণী হলেন মৃণালিনী দেবী (১৮৭৩–১৯০২ )।

১৮৮৪ সালের ১৯ এপ্রিল রবীন্দ্রনাথের বাল্য সহচরী তথা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্নী কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করেন। এই আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ জানা যায় না। তবে এই ঘটনা রবীন্দ্রনাথের মনে এক গভীর রেখাপাত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ-কাদম্বরী সম্পর্কের রসায়ন তাই পরবর্তীকালের গবেষকদের গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

১৮৮৪ সালেই রবীন্দ্রনাথ আদি ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৮৮৬ সালে জন্ম হয় জ্যেষ্ঠ সন্তান মাধুরীলতার (১৮৮৬–১৯১৮)। ১৮৮৮ সালে রবীন্দ্রনাথ সপরিবারে চলে আসেন উত্তর ভারতের গাজিপুরে। 'মানসী' কাব্যগ্রন্থের বেশ কিছু কবিতা তিনি এখানে বসেই লিখেছিলেন। এই বছর ২৭ নভেম্বর জন্ম হয় রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৮৮–১৯৬১)। ১৮৯০-৯১ সাল নাগাদ দেবেন্দ্রনাথের আদেশক্রমে নদিয়া, কুষ্টিয়া, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের জমিদারিগুলির তদারকি শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ। এই সময় দীর্ঘ কয়েক বছর সপরিবারে কলকাতা ও শিলাইদহে পর্যায়ক্রমে বসবাস করেন। ১৮৯১ সালে দ্বিতীয়া কন্যা রেণুকা (১৮৯১–১৯০৩), ১৮৯৪ সালে কনিষ্ঠা কন্যা মীরা (১৮৯৪–১৯৬৯) ও ১৮৯৬ সালে কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথের (১৮৯৬–১৯০৭) জন্ম হয়।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে রবীন্দ্রনাথের ন'টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এগুলি হল: 'মানসী' (১৮৯০), 'সোনার তরী' (১৮৯৪), 'চিত্রা', 'চৈতালি' (১৮৯৬), 'কণিকা' (১৮৯৯), 'কথা', 'কাহিনী', 'কল্পনা' ও 'ক্ষণিকা' (১৯০০)। ১৮৯০ সালে পূর্ববঙ্গের সাজাদপুরে বসে তিনি লেখেন 'বিসর্জন' নাটকটি। ১৮৯২ সালে প্রকাশিত হয় নাট্যকাব্য 'চিত্রাঙ্গদা'। সেই সঙ্গে নিয়মিত গীতিচর্চাও করতে থাকেন রবীন্দ্রনাথ। ১৮৯৪ সালে গ্রহণ করেন 'সাধনা' পত্রিকার সম্পাদনার ভার। এই পত্রিকাতেই সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ কিছু গদ্যরচনা প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, 'গল্পগুচ্ছ' গল্পসংকলনের প্রথম ৮৪টি গল্পের অর্ধেকই এই সময়ের রচনা। এই গল্পগুলির রসদ তিনি সংগ্রহ করেছিলেন পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ হিন্দুসমাজ থেকে।

বিশ্ববীণারবে

১৯০১ সালে শিলাইদহ ছেড়ে পাকাপাকিভাবে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের উপকণ্ঠে শান্তিনিকেতনে চলে এলেন রবীন্দ্রনাথ। ইতিপূর্বে এখানে দেবেন্দ্রনাথ একটি আশ্রম ও ব্রহ্মমন্দির স্থাপন করেছিলেন। এই আশ্রম, ব্রহ্মমন্দির, আম্রকুঞ্জ ও একটি গ্রন্থাগার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ চালু করলেন একটি পরীক্ষামূলক স্কুল। নাম দিলেন 'ব্রহ্ম বিদ্যালয়'। এরই মধ্যে একের পর এক নিকটজনের মৃত্যু রবীন্দ্রনাথকে ব্যথিত করে তুলল। ১৯০২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী চলে গেলেন। ১৯০৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর চলে গেলেন কন্যা রেণুকা। ১৯০৫ সালের ১৯ জানুয়ারি কবির পিতৃবিয়োগ হল। সবচেয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুশোক এল ১৯০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে। এই মৃত্যুশোক থেকেই উৎসারিত হল তাঁর কাব্যধারার 'গীতাঞ্জলি' পর্যায়টি।

এসবের মধ্যেই ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ জড়িয়ে পড়লেন বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে। যৌবনে পূর্ববঙ্গের গ্রামজীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দেওয়ার প্রত্যক্ষ অনুভূতি তাঁকে স্বদেশের প্রকৃত উন্নতির পথটি সম্পর্কে ভাবিয়ে তুলল। রবীন্দ্রনাথ বুঝলেন, গ্রামীণ সমাজের সার্বিক উন্নতি ছাড়া দেশের উন্নতি অসম্ভব। ব্রহ্মবিদ্যালয়ের মাধ্যমে মুক্তশিক্ষার প্রচারের পাশাপাশি গ্রামোন্নয়নের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন তিনি। ১৯০৬ সালে জ্যেষ্ঠপুত্র রথীন্দ্রনাথকে আধুনিক কৃষি ও গোপালন বিদ্যা শিক্ষা এবং ১৯০৭ সালে কনিষ্ঠ জামাতা নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে কৃষিবিজ্ঞান শিক্ষার জন্য পাঠালেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁদের শিক্ষার খরচ বহন করলেন নিজেই। এই সময়ে শান্তিনিকেতন আশ্রমে দেখা দিল তীব্র অর্থসংকট। স্ত্রীর গয়না, পুরীর বসতবাটী, বইয়ের স্বত্ব বিক্রি করে চলতে লাগল ব্যয়নির্বাহ।

ইতিমধ্যেই বাংলায় তো বটেই, বাংলার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ল তাঁর কবিখ্যাতি। 'নৈবেদ্য' (১৯০১), 'খেয়া' (১৯০৬) ও 'গীতাঞ্জলি' (১৯১০) কাব্যগ্রন্থের নির্বাচিত কিছু কবিতার অনুবাদ পাশ্চাত্য সমাজে রবীন্দ্রনাথকে পরিচিত করে তুলল। এই অনুবাদগুলির সংকলন 'সংস অফারিংস' বা ইংরেজি 'গীতাঞ্জলি' (১৯১৩) প্রকাশিত হওয়ার পর সুইডিশ আকাদেমি তাঁকে ভূষিত করল সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দিয়ে। রবীন্দ্রনাথই ছিলেন প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে 'স্যার' উপাধিতে ভূষিত করল। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এই উপাধি ত্যাগ করলেন রবীন্দ্রনাথ।

বিংশ শতাব্দীর বিশের দশক থেকে প্রত্যক্ষভাবে গ্রামোন্নয়নের কাজ শুরু করলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯২১ সালে স্থাপিত হল 'পল্লীসংগঠন কেন্দ্র'। রবীন্দ্রনাথকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন মার্কিন কৃষি-অর্থনীতিবিদ লেনার্ড নাইট এলমহার্স্ট, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শান্তিনিকেতনের একাধিক শিক্ষক ও ছাত্র। সংস্থাটির উদ্দেশ্য ছিল কৃষির উন্নতিসাধন, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি রোগ নিবারণ, সমবায় প্রথায় ধর্মগোলা স্থাপন, চিকিৎসার সুব্যবস্থা এবং সাধারণ গ্রামবাসীদের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি করা। ১৯২৩ সালে রবীন্দ্রনাথ এই সংস্থার নাম পরিবর্তন করে রাখলেন 'শ্রীনিকেতন'। দেশ ও বিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও বিশেষজ্ঞেরা শ্রীনিকেতনকে আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য প্রেরণ করতেন। শ্রীনিকেতন আন্দোলনের পাশাপাশি সামাজিক কুপ্রথা ও কুসংস্কারগুলির বিরুদ্ধের সোচ্চার হতে শুরু করলেন রবীন্দ্রনাথ। ত্রিশের দশকের প্রথম ভাগ থেকে কবিতা-গান ও বক্তৃতার মাধ্যমে বর্ণাশ্রম প্রথা ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে থাকেন।

দিনান্তবেলায়

রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ দশকটি (১৯৩২-১৯৪১) তাঁর সৃষ্টিকলার ইতিহাসে এক অত্যাশ্চর্য পর্যায়। এই পর্বে তাঁর সাকুল্যে ৫০টি বই প্রকাশিত হয়। সাহিত্যের নানা ধারায় নব নব সৃষ্টিপরীক্ষায় মেতে উঠেছিলেন সপ্ততিপর রবীন্দ্রনাথ। এই পরীক্ষানিরীক্ষার ফসল তাঁর গদ্যগীতিকা ও নৃত্যনাট্যগুলি। রবীন্দ্রনাথের এই সময়কার গদ্যকবিতাগুলি সংকলিত হয়েছে 'পুনশ্চ' (১৯৩২), 'শেষ সপ্তক' (১৯৩৫), 'শ্যামলী' ও 'পত্রপুট' (১৯৩৬) – এই চারটি সংকলনে। বাংলা নাট্যসাহিত্যের এক যুগান্তর তাঁর এই সময়কার নৃত্যনাট্যগুলি – 'নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা' (১৯৩৬; 'চিত্রাঙ্গদা' (১৮৯২) কাব্যনাট্যের নৃত্যাভিনয়-উপযোগী রূপ),'শ্যামা' (১৯৩৯) ও 'চণ্ডালিকা' (১৯৩৯)। জীবনের শেষ দশকে তিনি রচনা করে ফেলেছিলেন তিনটি ভিন্নধর্মী উপন্যাসও – 'দুই বোন' (১৯৩৩), 'মালঞ্চ' (১৯৩৪) ও 'চার অধ্যায়' (১৯৩৪)। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন 'বিশ্বপরিচয়'। এই গ্রন্থে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের আধুনিকতম সিদ্ধান্তগুলি সরল বাংলা গদ্যে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর অর্জিত জ্ঞানের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় তাঁর কাব্যেও। 'সে' (১৯৩৭), 'তিন সঙ্গী' (১৯৪০) ও 'গল্পসল্প' (১৯৪১) গল্পসংকলন তিনটিতে তাঁর বিজ্ঞানী চরিত্র-কেন্দ্রিক একাধিক গল্প সংকলিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাঁর আঁকা অধিকাংশ ছবিও এই সময়েরই সৃষ্টি।

বিজ্ঞানচর্চা ও কুসংস্কারের বিরোধিতা জীবনের এই পর্যায়ে রবীন্দ্র-চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিহার প্রদেশে এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে বহু লোকের মৃত্যু হয়। মহাত্মা গান্ধী এই ভূমিকম্পকে 'ঈশ্বরের রোষ' বলে চিহ্নিত করলে, এহেন অবৈজ্ঞানিক মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান রবীন্দ্রনাথ। পাশাপাশি বাংলার আর্থিক দুরবস্থা ও ভারতের রাজনৈতিক সমস্যাও এই সময়ে রবীন্দ্রনাথকে বিশেষ চিন্তিত করে রেখেছিল।

জীবনের শেষ চারটি বছর রবীন্দ্রনাথের কেটেছিল ধারাবাহিক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে। ১৯৩৭ সালে একবার তিনি গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেবার সেরে উঠলেও, ১৯৪০ সালের অসুস্থতার পর আর সেরে ওঠেননি। অসুখ-আরোগ্য-অসুখের লুকোচুরি খেলার মধ্যে লেখা তাঁর শেষ চারটি কাব্যগ্রন্থে মৃত্যুচেতনাকে ঘিরে রবীন্দ্রনাথ সাজিয়ে তোলেন কিছু অসামান্য পংক্তি। ১৯৪০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সাম্মানিক ডি. লিট. প্রদান করে। মৃত্যুর সাত দিন আগে পর্যন্ত কবি সৃষ্টিশীল ছিলেন। দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৪১ সালে জোড়াসাঁকোর পৈত্রিক বাসভবনেই তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটে।

ভুবনবীণা

১৮৭৮ থেকে ১৯৩২। এই সময়পর্বের মধ্যে বারোটি বিশ্বভ্রমণ কর্মসূচি। আর তারই মাধ্যমে ৫টি মহাদেশের ৩০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেন রবীন্দ্রনাথ।

যৌবনে দু'বার ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন তিনি। প্রথম বার ১৮৭৮ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে। দ্বিতীয়বার গিয়েছিলেন ১৮৯০ সালে। কেন গিয়েছিলেন, তার কারণ ঠিক স্পষ্ট নয়। ১৯১২ সালে তৃতীয়বার ইংল্যান্ডে গেলেন ব্যক্তিগত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। এই সময়েই ইয়েটস প্রমুখ ইংরেজ কবি ও বিদ্বজ্জনেদের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি। 'গীতাঞ্জলি'র ইংরেজি অনুবাদ রবীন্দ্রনাথ পাঠ করে শোনালেন এই নতুন বন্ধুমহলে। সকলে মুগ্ধ। ইয়েটস স্বয়ং লিখে দিলেন বইটির ভূমিকা। এরপর ১৯১৩ সালে এই বইটির জন্যই রবীন্দ্রনাথ পেলেন সাহিত্যে নোবেল। উল্লেখ্য, এই তৃতীয় বিলেত সফরের সময়েই দীনবন্ধু সি এফ অ্যান্ড্রুজের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ হয়েছিল।

১৯১৬-১৭ সালে প্রথমে জাপানে ও পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ কতকগুলি বক্তৃতা দেন। এই বক্তৃতামালায় সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ সোচ্চার হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ উভয় দেশেই প্রত্যাখ্যাত হন রবীন্দ্রনাথ। তবে তাঁর এই বক্তৃতাগুলি সংকলিত হয়ে থাকে 'ন্যাশনালিজম্' (১৯১৭) সংকলনে।

১৯২০-২১ সাল নাগাদ আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ভ্রমণে যান রবীন্দ্রনাথ। এই সফরকালে পাশ্চাত্য দেশগুলিতে সংবর্ধিতও হন তিনি। ১৯২৪ সালে যান চীন সফরে। সেখান থেকে আবার যান জাপানে। এবারেও জাতীয়তাবাদ-বিরোধী বক্তৃতা দেন জাপানে।

১৯২৪ সালের শেষ দিকে পেরু সরকারের কাছ থেকে সেদেশে যাওয়ার আমন্ত্রণ পান রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু পথে আর্জেন্টিনায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। পেরুর বদলে থেকে যান সেই দেশেই। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর আতিথেয়তায় কাটান তিনটি মাস। অসুস্থতার জন্য পেরু যাওয়া বাতিল হয়ে যায়।

১৯২৬ সালে বেনিতো মুসোলিনি রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণ জানান ইতালিতে। প্রথমে মুসোলিনির আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু ক্রমে লোকমুখে মুসোলিনির স্বৈরাচার-অত্যাচারের কথা জানতে পেরে তাঁর সমালোচনায় মুখর হলেন তিনি। ফলত, উভয়ের উষ্ণ সম্পর্কে অচিরেই পড়ল ছেদ। গ্রিস, তুরস্ক ও মিশর ঘুরে রবীন্দ্রনাথ ফিরে এলেন ভারতে।

১৯২৭ সালে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ চার সঙ্গীকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ চললেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ভ্রমণে। দেখলেন বালি, জাভা, কুয়ালালামপুর, মালাক্কা, পেনাং, সিয়াম ও সিঙ্গাপুর। ১৯৩০ সালে শেষ বার ইংল্যান্ড গেলেন অক্সফোর্ডে হিবার্ট বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। এরপর গেলেন ফ্রান্স, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, সোভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৩২ সালে ইরাক ও পারস্য ভ্রমণ করলেন। ১৯৩৪ সালে গেলেন সিংহলে। এই ছিল তাঁর শেষ বিদেশ সফর।

একাধিক বইতে রবীন্দ্রনাথ লিপিবদ্ধ করেছিলেন তাঁর বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এই বইগুলি হল: 'য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র' (১৮৮১), 'য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি' (১৮৯১, ১৮৯৩), 'জাপান-যাত্রী' (১৯১৯), 'যাত্রী' ('পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারি' ও 'জাভা-যাত্রীর পত্র', ১৯২৯), 'রাশিয়ার চিঠি' (১৯৩১), 'পারস্যে' (১৯৩৬) ও 'পথের সঞ্চয়' (১৯৩৯)। সাক্ষাৎ করেছিলেন অরিঁ বের্গসঁ, আলবার্ট আইনস্টাইন, রবার্ট ফ্রস্ট, টমাস মান, জর্জ বার্নার্ড শ, এইচ জি ওয়েলস, রোম্যাঁ রোলাঁ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে। জীবনের শেষপর্বে পারস্য, ইরাক ও সিংহল ভ্রমণের সময় জাতিগত ভেদবুদ্ধি ও জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে তাঁর বিতৃষ্ণা তীব্রতর হয়েছিল মাত্র। আর জীবনব্যাপী বিশ্বভ্রমণের ফলে ভারত ও পাশ্চাত্যের মধ্যে আদানপ্রদানের পথটিই প্রশস্ত করেছিলেন কবি।

সাহিত্য

*

রসতীর্থ-পথের পথিক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রধান পরিচয় তিনি কবি। মাত্র আট বছর বয়সে কবিতা রচনায় হাতেখড়ি হয় তাঁর। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন বিহারীলাল চক্রবর্তীর (১৮৩৫-১৮৯৪) অনুসারী কবি। তাঁর 'কবিকাহিনী' (১৮৭৮), 'বনফুল' (১৮৮০) ও 'ভগ্নহৃদয়' (১৮৮১) কাব্য তিনটিতে বিহারীলালের প্রভাব সুস্পষ্ট। 'সন্ধ্যাসংগীত' (১৮৮২) কাব্যগ্রন্থ থেকে প্রকাশিত হতে লাগল কবি রবীন্দ্রনাথের নিজের বাণী। এই পর্বের 'সন্ধ্যাসংগীত', 'প্রভাতসংগীত' (১৮৮৩), 'ছবি ও গান', 'কড়ি ও কোমল', 'ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী' (১৮৮৪) কাব্যগ্রন্থের মূল বিষয়বস্তু ছিল মানব হৃদয়ের বিষণ্ণতা, আনন্দ, মর্ত্যপ্রীতি ও মানবপ্রেম। ১৮৯০ সালে প্রকাশিত 'মানসী' এবং তার পর প্রকাশিত 'সোনার তরী' (১৮৯৪), 'চিত্রা' (১৮৯৬), 'চৈতালি' (১৮৯৬), 'কল্পনা' (১৯০০) ও 'ক্ষণিকা' (১৯০০) কাব্যগ্রন্থে ফুটে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের প্রেম ও সৌন্দর্য সম্পর্কিত রোম্যান্টিক ভাবনা। ১৯০১ সালে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠার পর রবীন্দ্রনাথের কবিতায় আধ্যাত্মিক চিন্তার প্রাধান্য লক্ষিত হয়। এই চিন্তা ধরা পড়েছে 'নৈবেদ্য' (১৯০১), 'খেয়া' (১৯০৬), 'গীতাঞ্জলি' (১৯১০), 'গীতিমাল্য' (১৯১৪) ও 'গীতালি' (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থে। ১৯১৫ সালে বেজে উঠল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা। আধ্যাত্মলোকের পরিবর্তে পুনরায় মর্ত্যলোকের দিকে তাকালেন কবি। এই নবদৃষ্টির ফসল 'বলাকা' (১৯১৬)। এরপর 'পলাতকা' (১৯১৮) কাব্যে গল্প-কবিতার আকারে তিনি নারীজীবনের সমসাময়িক সমস্যাগুলি তুলে ধরেন। এরপর 'পূরবী' (১৯২৫) ও 'মহুয়া' (১৯২৯) কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ আবার ফিরে এলেন প্রেমের আশ্রয়ে। জীবনের শেষ দশকে কবিতার আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু নিয়ে কয়েকটি নতুন পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রথমে প্রকাশিত হল 'পুনশ্চ' (১৯৩২), 'শেষ সপ্তক' (১৯৩৫), 'পত্রপুট' (১৯৩৬) ও 'শ্যামলী' (১৯৩৬) নামে চারটি গদ্যকাব্য। তারপর জীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে 'রোগশয্যায়' (১৯৪০), 'আরোগ্য' (১৯৪১), 'জন্মদিনে '(১৯৪১) ও 'শেষ লেখা' (১৯৪১, মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত) কাব্যে মৃত্যু ও মর্ত্যপ্রীতিকে একটি নতুন আঙ্গিকে পরিস্ফুট করেছিলেন তিনি। শেষ কবিতা 'তোমার সৃষ্টির পথ' মৃত্যুর আট দিন আগে মৌখিকভাবে রচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথের কাব্যে প্রতিফলিত হয় প্রাচীন উপনিষদ্, মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলি, কবীরের দোঁহা, লালন ও অন্যান্য বাউল কবিদের মানবতাবাদী গীতিকবিতা ও রামপ্রসাদ সেনের শাক্ত সাহিত্যের মর্মবাণী। প্রাচীন সাহিত্যের দুরূহতা পরিহার করে রবীন্দ্রনাথ গ্রহণ করেছিলেন কাব্য রচনার এক সহজ, সরল ও সরস আঙ্গিক। আবার বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশক থেকে কিছু পরীক্ষামূলক লেখালেখির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতা ও বাস্তবতাবোধের প্রাথমিক আবির্ভাব প্রসঙ্গে নিজ প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছিলেন কবি। বহির্বিশ্বে তাঁর সর্বাপেক্ষা সুপরিচিত কাব্যগ্রন্থটি হল গীতাঞ্জলি। এ বইটির জন্যই তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। নোবেল ফাউন্ডেশন তাঁর এই কাব্যগ্রন্থটিকে বর্ণনা করেছিল একটি "গভীরভাবে সংবেদনশীল, উজ্জ্বল ও সুন্দর কাব্যগ্রন্থ" রূপে।

ছোটো ছোটো দুঃখকথা

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ছোটোগল্পকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মূলত হিতবাদী, সাধনা, ভারতী, সবুজ পত্র প্রভৃতি মাসিক পত্রিকাগুলির চাহিদা মেটাতে তিনি তাঁর ছোটগল্পগুলি রচনা করেছিলেন। গল্পগুলি উচ্চ সাহিত্যমূল্য-সম্পন্ন। রবীন্দ্রনাথের জীবনের 'সাধনা' পর্বটি (১৮৯১–৯৫) ছিল সর্বাপেক্ষা সৃষ্টিশীল পর্যায়। তাঁর 'গল্পগুচ্ছ' গল্পসংকলনের প্রথম তিন খণ্ডের চুরাশিটি গল্পের অর্ধেকই রচিত হয় এই সময়কালের মধ্যে। গল্পগুচ্ছ সংকলনের অন্য গল্পগুলির অনেকগুলিই রচিত হয়েছিল রবীন্দ্রজীবনের 'সবুজ পত্র' পর্বে (১৯১৪–১৭; প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত পত্রিকার নামানুসারে)। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গল্প হল 'কঙ্কাল', 'নিশীথে', 'মণিহারা', 'ক্ষুধিত পাষাণ', 'স্ত্রীর পত্র', 'নষ্টনীড়', 'কাবুলিওয়ালা', 'হৈমন্তী', 'দেনাপাওনা', 'মুসলমানীর গল্প' ইত্যাদি। শেষ জীবনে রবীন্দ্রনাথ 'লিপিকা', 'সে' ও 'তিনসঙ্গী' গল্পগ্রন্থে নতুন আঙ্গিকে গল্পরচনা করেছিলেন।

সমসাময়িক ঘটনাবলি, বাঙালি হিন্দু সমাজের নানা সমস্যা, আধুনিক ধ্যানধারণার খণ্ড খণ্ড ছবি উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথের গল্পে। নানা শ্রেণির চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের বৌদ্ধিক বিশ্লেষণই অনেক ক্ষেত্রে তাঁর গল্পের প্রধান বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের একাধিক ছোটোগল্প চলচ্চিত্র, নাটক ও টেলিভিশন ধারাবাহিকের আকারে পুনঃসৃজিত হয়েছে। তাঁর গল্পের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রায়ণ সত্যজিৎ রায় পরিচালিত 'তিন কন্যা' ('মনিহারা', 'পোস্টমাস্টার' ও 'সমাপ্তি' অবলম্বনে) ও 'চারুলতা' ('নষ্টনীড়' অবলম্বনে), তপন সিংহ পরিচালিত 'অতিথি', 'কাবুলিওয়ালা' ও 'ক্ষুধিত পাষাণ'[১৩৯], পূর্ণেন্দু পত্রী পরিচালিত 'স্ত্রীর পত্র' ইত্যাদি।

রডোডেনড্রনগুচ্ছ

রবীন্দ্রনাথ উপন্যাস লিখেছেন মাত্র তেরোটি। এগুলি হল: 'বৌ-ঠাকুরাণীর হাট' (১৮৮৩), 'রাজর্ষি' (১৮৮৭), 'চোখের বালি' (১৯০৩), 'নৌকাডুবি' (১৯০৬), 'প্রজাপতির নির্বন্ধ' (১৯০৮), 'গোরা' (১৯১০), 'ঘরে বাইরে' (১৯১৬), 'চতুরঙ্গ' (১৯১৬), 'যোগাযোগ' (১৯২৯), 'শেষের কবিতা' (১৯২৯), 'দুই বোন' (১৯৩৩), 'মালঞ্চ' (১৯৩৪) ও 'চার অধ্যায়' (১৯৩৪)। বৌ-ঠাকুরাণীর হাট ও রাজর্ষি ঐতিহাসিক উপন্যাস। রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপন্যাস রচনার প্রচেষ্টা। এরপর থেকে ছোটগল্পের মতো তাঁর উপন্যাসগুলিও মাসিকপত্রের চাহিদা অনুযায়ী নবপর্যায় বঙ্গদর্শন, প্রবাসী, সবুজ পত্র, বিচিত্রা প্রভৃতি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে।

'চোখের বালি' উপন্যাসে এক অকাল-বিধবার অবৈধ প্রণয়কে কেন্দ্র করে একাধিক চরিত্রের মানসিক দ্বন্দ্ব প্রধান বিষয় হিসেবে ফুটিয়ে তোলেন রবীন্দ্রনাথ। 'নৌকাডুবি'ও জটিল পারিবারিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে লেখা। কিন্তু এই উপন্যাসে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের বদলে কাহিনির গতিশীলতাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। 'গোরা' রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। এই উপন্যাসে ফুটে উঠেছে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ, সনাতন হিন্দু ও ব্রাহ্মসমাজের সংঘাত, ভারতের তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলি। 'ঘরে বাইরে' উপন্যাসের বিষয়বস্তু ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নারী ও পুরুষের সম্পর্কের জটিলতা। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের জটিলতা আরও সূক্ষ্মভাবে উঠে এসেছে তাঁর পরবর্তী 'যোগাযোগ' উপন্যাসেও। 'চতুরঙ্গ' উপন্যাসটি রবীন্দ্রনাথের "ছোটগল্পধর্মী উপন্যাস"। 'শেষের কবিতা' প্রেমের উপন্যাস। এই উপন্যাসের চালিকাশক্তি একটি বিশেষভাবে উপস্থাপিত প্রেমতত্ত্ব। স্ত্রীর অসুস্থতার সুযোগে স্বামীর অন্য স্ত্রীলোকের প্রতি আসক্তি – এই বিষয়টিকে উপজীব্য করে রবীন্দ্রনাথ 'দুই বোন' ও 'মালঞ্চ' উপন্যাসদুটি লেখেন। এর মধ্যে প্রথম উপন্যাসটি মিলনান্তক ও দ্বিতীয়টি বিয়োগান্তক। রবীন্দ্রনাথের শেষ উপন্যাস 'চার অধ্যায়' সমসাময়িক বিপ্লবী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে একটি বিয়োগান্তক প্রেমের উপন্যাস।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সত্যজিৎ রায়ের 'ঘরে বাইরে' ও ঋতুপর্ণ ঘোষের 'চোখের বালি'।

সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় অসংখ্য প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। এইসব প্রবন্ধে তিনি সমাজ, রাষ্ট্রনীতি, ধর্ম, সাহিত্যতত্ত্ব, ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব, ছন্দ, সংগীত ইত্যাদি নানা বিষয়ে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করেন। রবীন্দ্রনাথের সমাজচিন্তামূলক প্রবন্ধগুলি 'সমাজ' (১৯০৮) সংকলনে সংকলিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন সময়ে লেখা রাজনীতি-সংক্রান্ত প্রবন্ধগুলি সংকলিত হয়েছে 'কালান্তর' (১৯৩৭) সংকলনে। রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা ও আধ্যাত্মিক অভিভাষণগুলি সংকলিত হয়েছে 'ধর্ম' (১৯০৯) ও 'শান্তিনিকেতন' (১৯০৯-১৬) অভিভাষণমালায়। রবীন্দ্রনাথের ইতিহাস-সংক্রান্ত প্রবন্ধগুলি স্থান পেয়েছে 'ভারতবর্ষ' (১৯০৬), 'ইতিহাস' (১৯৫৫) ইত্যাদি গ্রন্থে। 'সাহিত্য' (১৯০৭), 'সাহিত্যের পথে' (১৯৩৬) ও 'সাহিত্যের স্বরূপ' (১৯৪৩) গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যতত্ত্ব আলোচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ধ্রুপদি ভারতীয় সাহিত্য ও আধুনিক সাহিত্যের সমালোচনা করেছেন যথাক্রমে 'প্রাচীন সাহিত্য' (১৯০৭) ও 'আধুনিক সাহিত্য' (১৯০৭) গ্রন্থদুটিতে। 'লোকসাহিত্য' (১৯০৭) প্রবন্ধমালায় তিনি আলোচনা করেছেন বাংলা লোকসাহিত্যের প্রকৃতি। ভাষাতত্ত্ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথের চিন্তাভাবনা লিপিবদ্ধ রয়েছে 'শব্দতত্ত্ব' (১৯০৯), 'বাংলা ভাষা পরিচয়' (১৯৩৮) ইত্যাদি গ্রন্থে। ছন্দ ও সংগীত নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন যথাক্রমে 'ছন্দ' (১৯৩৬) ও 'সংগীতচিন্তা' (১৯৬৬) গ্রন্থে। বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠাতা রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষা-সংক্রান্ত ভাবনাচিন্তার কথা প্রকাশ করেছেন 'শিক্ষা' (১৯০৮) প্রবন্ধমালায়। 'ন্যাশনালিজম' (ইংরেজি, ১৯১৭) গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ উগ্র জাতীয়তাবাদের বিশ্লেষণ করে তার বিরোধিতা করেছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দর্শন বিষয়ে যে বিখ্যাত বক্তৃতাগুলি দিয়েছিলেন সেগুলি 'রিলিজিয়ন অফ ম্যান' (ইংরেজি, ১৯৩০; বাংলা অনুবাদ 'মানুষের ধর্ম', ১৯৩৩) নামে সংকলিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা জন্মদিনের অভিভাষণ 'সভ্যতার সংকট' (১৯৪১) তাঁর সর্বশেষ প্রবন্ধগ্রন্থ। জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ 'বিশ্বপরিচয়' (১৯৩৭) নামে একটি তথ্যমূলক প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। 'জীবনস্মৃতি' (১৯১২), 'ছেলেবেলা' (১৯৪০) ও 'আত্মপরিচয়' (১৯৪৩) তাঁর আত্মকথামূলক গ্রন্থ।

রবীন্দ্রনাথের সামগ্রিক পত্রসাহিত্য আজ পর্যন্ত উনিশটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া 'ছিন্নপত্র' ও 'ছিন্নপত্রাবলী' (ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীকে লেখা), 'ভানুসিংহের পত্রাবলী' (রানু অধিকারীকে (মুখোপাধ্যায়) লেখা) ও 'পথে ও পথের প্রান্তে' (নির্মলকুমারী মহলানবিশকে লেখা) বই তিনটি রবীন্দ্রনাথের তিনটি উল্লেখযোগ্য পত্রসংকলন।

কেহ বলে ড্রামাটিক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধারে ছিলেন নট ও নাট্যকার। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পারিবারিক নাট্যমঞ্চে মাত্র ষোলো বছর বয়সে অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'হঠাৎ নবাব' নাটকে (মলিয়ের লা বুর্জোয়া 'জাঁতিরোম' অবলম্বনে রচিত) ও পরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথেরই 'অলীকবাবু' নাটকে নামভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৮৮১ সালে তাঁর প্রথম গীতিনাট্য 'বাল্মীকি-প্রতিভা' মঞ্চস্থ হয়। এই নাটকে তিনি ঋষি বাল্মীকির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ১৮৮২ সালে রবীন্দ্রনাথ রামায়ণের উপাখ্যান অবলম্বনে 'কালমৃগয়া' নামে আরও একটি গীতিনাট্য রচনা করেছিলেন।এই নাটক মঞ্চায়নের সময় তিনি অন্ধমুনির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

গীতিনাট্য রচনার পর রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি কাব্যনাট্য রচনা করেন। শেকসপিয়রীয় পঞ্চাঙ্ক রীতিতে রচিত তাঁর 'রাজা ও রাণী' (১৮৮৯) ও 'বিসর্জন' (১৮৯০) বহুবার সাধারণ রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয় এবং তিনি নিজে এই নাটকগুলিতে অভিনয়ও করেন। ১৮৮৯ সালে 'রাজা ও রাণী' নাটকে বিক্রমদেবের ভূমিকায় অভিনয় করেন রবীন্দ্রনাথ। 'বিসর্জন' নাটকটি দুটি ভিন্ন সময়ে মঞ্চায়িত করেছিলেন তিনি। ১৮৯০ সালের মঞ্চায়নের সময় যুবক রবীন্দ্রনাথ বৃদ্ধ রঘুপতির ভূমিকায় এবং ১৯২৩ সালের মঞ্চায়নের সময় বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথ যুবক জয়সিংহের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। কাব্যনাট্য পর্বে রবীন্দ্রনাথের আরও দুটি উল্লেখযোগ্য নাটক হল চিত্রাঙ্গদা (১৮৯২) ও মালিনী (১৮৯৬)।

কাব্যনাট্যের পর রবীন্দ্রনাথ প্রহসন রচনায় মনোনিবেশ করেন। এই পর্বে প্রকাশিত হয় 'গোড়ায় গলদ' (১৮৯২), 'বৈকুণ্ঠের খাতা' (১৮৯৭), 'হাস্যকৌতুক' (১৯০৭) ও 'ব্যঙ্গকৌতুক' (১৯০৭)। 'বৈকুণ্ঠের খাতা' নাটকে রবীন্দ্রনাথ কেদারের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ১৯২৬ সালে তিনি 'প্রজাপতির নির্বন্ধ' উপন্যাসটিকেও 'চিরকুমার সভা' নামে একটি প্রহসনমূলক নাটকের রূপ দেন।

১৯০৮ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথ রূপক-সাংকেতিক তত্ত্বধর্মী নাট্যরচনা শুরু করেন। ইতিপূর্বে 'প্রকৃতির প্রতিশোধ' (১৮৮৪) নাটকে তিনি কিছুটা রূপক-সাংকেতিক আঙ্গিক ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু ১৯০৮ সালের পর থেকে একের পর এক নাটক তিনি এই আঙ্গিকে লিখতে শুরু করেন। এই নাটকগুলি হল: 'শারদোৎসব' (১৯০৮), 'রাজা' (১৯১০), 'ডাকঘর' (১৯১২), 'অচলায়তন' (১৯১২), 'ফাল্গুনী' (১৯১৬), 'মুক্তধারা' (১৯২২), 'রক্তকরবী' (১৯২৬), 'তাসের দেশ' (১৯৩৩), 'কালের যাত্রা' (১৯৩২) ইত্যাদি। এই সময় রবীন্দ্রনাথ প্রধানত শান্তিনিকেতনে মঞ্চ তৈরি করে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে অভিনয়ের দল গড়ে মঞ্চস্থ করতেন। কখনও কখনও কলকাতায় গিয়েও ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করতেন তিনি। এই সব নাটকেও একাধিক চরিত্রে অভিনয় করেন রবীন্দ্রনাথ। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ১৯১১ সালে 'শারদোৎসব' নাটকে সন্ন্যাসী এবং 'রাজা' নাটকে রাজা ও ঠাকুরদাদার যুগ্ম ভূমিকায় অভিনয়; ১৯১৪ সালে 'অচলায়তন' নাটকে অদীনপুণ্যের ভূমিকায় অভিনয়; ১৯১৫ সালে 'ফাল্গুনী' নাটকে অন্ধ বাউলের ভূমিকায় অভিনয়; ১৯১৭ সালে 'ডাকঘর' নাটকে ঠাকুরদা, প্রহরী ও বাউলের ভূমিকায় অভিনয়। নাট্যরচনার পাশাপাশি এই পর্বে ছাত্রছাত্রীদের অভিনয়ের প্রয়োজনে রবীন্দ্রনাথ পুরোন নাটকগুলি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ করে নতুন নামে প্রকাশ করেন। 'শারদোৎসব' নাটকটি হয় 'ঋণশোধ' (১৯২১), 'রাজা' হয় 'অরূপরতন' (১৯২০), 'অচলায়তন' হয় 'গুরু' (১৯১৮), 'গোড়ায় গলদ' হয় 'শেষরক্ষা' (১৯২৮), 'রাজা ও রাণী' হয় 'তপতী' (১৯২৯) এবং 'প্রায়শ্চিত্ত' হয় 'পরিত্রাণ' (১৯২৯)।

১৯২৬ সালে 'নটীর পূজা' নাটকে প্রথম অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে নাচ ও গানের প্রয়োগ ঘটান রবীন্দ্রনাথ। এই ধারাটিই তাঁর জীবনের শেষ পর্বে "নৃত্যনাট্য" নামে পূর্ণ বিকাশ লাভ করে। নটীর পূজা নৃত্যনাট্যের পর রবীন্দ্রনাথ একে একে রচনা করেন 'শাপমোচন' (১৯৩১), 'তাসের দেশ' (১৯৩৩), 'নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা' (১৯৩৬), 'নৃত্যনাট্য চণ্ডালিকা' (১৯৩৮) ও 'শ্যামা' (১৯৩৯)। এগুলিও শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীরাই প্রথম মঞ্চস্থ করেছিলেন।

মনের কথার টুকরো

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৫টি গান রচনা করেছিলেন। এই গানগুলি 'রবীন্দ্রসংগীত' নামে পরিচিত। ধ্রুপদি ভারতীয় সংগীত (হিন্দুস্তানি ও কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সংগীত), বাংলা লোকসংগীত ও ইউরোপীয় সংগীতের ধারা তিনটিকে আত্মস্থ করে তিনি একটি স্বকীয় সুরশৈলীর জন্ম দেন।রবীন্দ্রনাথ তাঁর বহু কবিতাকে গানে রূপান্তরিত করেছিলেন। রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ সুকুমার সেন রবীন্দ্রসংগীত রচনার ইতিহাসে চারটি পর্ব নির্দেশ করেছেন। প্রথম পর্বে তিনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্ট গীতের অনুসরণে গান রচনা শুরু করেছিলেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে (১৮৮৪-১৯০০) পল্লীগীতি ও কীর্তনের অনুসরণে রবীন্দ্রনাথ নিজস্ব সুরে গান রচনা শুরু করেন। এই পর্বের রবীন্দ্রসংগীতে ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট সংগীতস্রষ্টা মধুকান, রামনিধি গুপ্ত, শ্রীধর কথক প্রমুখের প্রভাবও সুস্পষ্ট। এই সময় থেকেই তিনি স্বরচিত কবিতায় সুর দিয়ে গান রচনাও শুরু করেছিলেন। ১৯০০ সালে শান্তিনিকেতনে বসবাস শুরু করার পর থেকে রবীন্দ্রসংগীত রচনার তৃতীয় পর্বের সূচনা ঘটে। এই সময় রবীন্দ্রনাথ বাউল গানের সুর ও ভাব তাঁর নিজের গানের অঙ্গীভূত করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রবীন্দ্রনাথের গান রচনার চতুর্থ পর্বের সূচনা হয়।,কবির এই সময়কার গানের বৈশিষ্ট্য ছিল নতুন নতুন ঠাটের প্রয়োগ এবং বিচিত্র ও দুরূহ সুরসৃষ্টি। তাঁর রচিত সকল গান সংকলিত হয়েছে 'গীতবিতান' গ্রন্থে। এই গ্রন্থের 'পূজা', 'প্রেম', 'প্রকৃতি', 'স্বদেশ', 'আনুষ্ঠানিক' ও 'বিচিত্র' পর্যায়ে মোট দেড় হাজার গান সংকলিত হয়। পরে গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য, নাটক, কাব্যগ্রন্থ ও অন্যান্য সংকলন গ্রন্থ থেকে বহু গান এই বইতে সংকলিত হয়েছিল। ইউরোপীয় অপেরার আদর্শে 'বাল্মীকি-প্রতিভা', 'কালমৃগয়া' গীতিনাট্য এবং 'চিত্রাঙ্গদা', 'চণ্ডালিকা', ও 'শ্যামা' সম্পূর্ণ গানের আকারে লেখা।

বিদ্রোহী পরমাণু

রবীন্দ্রনাথের সময় বাংলার শিক্ষিত পরিবারে নৃত্যের চর্চা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীর পাঠক্রমে সংগীত ও চিত্রকলার সঙ্গে সঙ্গে নৃত্যকেও অন্তর্ভুক্ত করেন। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের লোকনৃত্য ও ধ্রুপদি নৃত্যশৈলীগুলির সংমিশ্রণে তিনি এক নতুন শৈলীর প্রবর্তন করেন। মূলত মণিপুরি রাসনৃত্য, গুজরাতি গড়বা নৃত্য, পাঞ্জাবি ভাঙড়া ও সিদ্ধা নৃত্যের রীতিগুলি মিশ্রিতভাবে গ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ। সঙ্গে সিংহলের ক্যান্ডিনৃত্য এবং ইন্দোনেশিয়ার বালি ও জাভা অঞ্চলের লোকনৃত্যের কয়েকটি চলন ও ভঙ্গিমাকে মিশিয়েছেন তাতে। সমবেত নাচের ক্ষেত্রে সাঁওতালি গোষ্ঠীনৃত্যের একটি আদল পাওয়া যায়। তবে ভরতনট্যম বা কথাকলির কয়েকটি ভঙ্গিমা ছাড়া আর কিছুই তিনি গ্রহণ করেননি। এই শৈলীটি 'রবীন্দ্রনৃত্য' নামে পরিচিত। রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যগুলিতে গানের পাশাপাশি নাচও অপরিহার্য। বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী উদয় শংকর যে আধুনিক ভারতীয় নৃত্যধারার প্রবর্তন করেছিলেন, তার পিছনেও রবীন্দ্রনাথের প্রেরণা ছিল।

চিত্ররেখাডোরে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়মিত ছবি আঁকা শুরু করেন প্রায় সত্তর বছর বয়সে। চিত্রাঙ্কনে কোনো প্রথাগত শিক্ষা তাঁর ছিল না। প্রথমদিকে তিনি লেখার হিজিবিজি কাটাকুটিগুলিকে একটি চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। এই প্রচেষ্টা থেকেই তাঁর ছবি আঁকার সূত্রপাত ঘটে। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৯ কালপরিধিতে অঙ্কিত তাঁর স্কেচ ও ছবির সংখ্যা আড়াই হাজারের ওপর, যার ১৫৭৪টি শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত আছে। দক্ষিণ ফ্রান্সের শিল্পীদের উৎসাহে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয় প্যারিসের পিগাল আর্ট গ্যালারিতে। এরপর সমগ্র ইউরোপেই কবির একাধিক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ছবিতে রং ও রেখার সাহায্যে রবীন্দ্রনাথ সংকেতের ব্যবহার করতেন। রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্য চিত্রকলার পুনরুত্থানে আগ্রহী হলেও, তাঁর নিজের ছবিতে আধুনিক বিমূর্তধর্মিতাই বেশি প্রস্ফুটিত হয়েছে। মূলত কালি-কলমে আঁকা স্কেচ, জলরং ও দেশজ রঙের ব্যবহার করে তিনি ছবি আঁকতেন। তাঁর ছবিতে দেখা যায় মানুষের মুখের স্কেচ, অনির্ণেয় প্রাণীর আদল, নিসর্গদৃশ্য, ফুল, পাখি ইত্যাদি। তিনি নিজের প্রতিকৃতিও এঁকেছেন। নন্দনতাত্ত্বিক ও বর্ণ পরিকল্পনার দিক থেকে তাঁর চিত্রকলা বেশ অদ্ভুত ধরণেরই বলে মনে হয়। তবে তিনি একাধিক অঙ্কনশৈলী রপ্ত করেছিলেন। তন্মধ্যে, কয়েকটি শৈলী হল- নিউ আয়ারল্যান্ডের হস্তশিল্প, কানাডার (ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশ) পশ্চিম উপকূলের "হাইদা" খোদাইশিল্প ও ম্যাক্স পেকস্টাইনের কাঠখোদাই শিল্প।

দর্শন

*

বিশ্বমায়ের আঁচল

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজনৈতিক দর্শন অত্যন্ত জটিল। সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করলেও তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী নেতৃবর্গকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। ১৮৯০ সালে প্রকাশিত মানসী কাব্যগ্রন্থের কয়েকটি কবিতায় রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র মামলার তথ্যপ্রমাণ এবং পরবর্তীকালে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ গদর ষড়যন্ত্রের কথা শুধু জানতেনই না, বরং উক্ত ষড়যন্ত্রে জাপানি প্রধানমন্ত্রী তেরাউচি মাসাতাকি ও প্রাক্তন প্রিমিয়ার ওকুমা শিগেনোবুর সাহায্যও প্রার্থনা করেছিলেন। আবার ১৯২৫ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে স্বদেশী আন্দোলনকে 'চরকা-সংস্কৃতি' বলে বিদ্রুপ করে রবীন্দ্রনাথ কঠোর ভাষায় তার বিরোধিতা করেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তাঁর চোখে ছিল "আমাদের সামাজিক সমস্যাগুলির রাজনৈতিক উপসর্গ"। তাই বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বৃহত্তর জনসাধারণের স্বনির্ভরতা ও বৌদ্ধিক উন্নতির উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। ভারতবাসীকে অন্ধ বিপ্লবের পন্থা ত্যাগ করে দৃঢ় ও প্রগতিশীল শিক্ষার পন্থাটিকে গ্রহণ করার আহ্বান জানান রবীন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথের এই ধরনের মতাদর্শ অনেককেই বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ১৯১৬ সালের শেষ দিকে সানফ্রান্সিসকোয় একটি হোটেলে অবস্থানকালে একদল চরমপন্থী বিপ্লবী রবীন্দ্রনাথকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ উপস্থিত হওয়ায় তাঁদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি নাইটহুড বর্জন করেন। নাইটহুড প্রত্যাখ্যান-পত্রে লর্ড চেমসফোর্ডকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, "আমার এই প্রতিবাদ আমার আতঙ্কিত দেশবাসীর মৌনযন্ত্রণার অভিব্যক্তি।" রবীন্দ্রনাথের 'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য' ও 'একলা চলো রে' রাজনৈতিক রচনা হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। 'একলা চলো রে' গানটি গান্ধীজির বিশেষ প্রিয় ছিল। যদিও মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল অম্লমধুর। হিন্দু নিম্নবর্ণীয় জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গান্ধীজি ও আম্বেডকরের যে মতবিরোধের সূত্রপাত হয়, তা নিরসনেও রবীন্দ্রনাথ বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। ফলে গান্ধীজিও তাঁর অনশন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।

যেমন করে গাইছে আকাশ

'তোতা-কাহিনী' গল্পে রবীন্দ্রনাথ বিদ্যালয়ের মুখস্ত-সর্বস্ব শিক্ষাকে প্রতি তীব্রভাবে আক্রমণ করেন। দেখিয়ে দেন, দেশের ছাত্রসমাজকে খাঁচাবদ্ধ পাখিটির মতো শুকনো বিদ্যা গিলিয়ে কীভাবে তাদের বৌদ্ধিক মৃত্যুর পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ১৯১৭ সালের ১১ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার সান্টা বারবারা ভ্রমণের সময় রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা সম্পর্কে প্রথাবিরুদ্ধ চিন্তাভাবনা শুরু করেন। শান্তিনিকেতন আশ্রমকে দেশ ও ভূগোলের গণ্ডীর বাইরে বের করে ভারত ও বিশ্বকে একসূত্রে বেঁধে একটি বিশ্ব শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও এই সময়েই গ্রহণ করেছিলেন কবি। ১৯১৮ সালের ২২ অক্টোবর 'বিশ্বভারতী' নামাঙ্কিত তাঁর এই বিদ্যালয়ের শিলান্যাস করা হয়েছিল। এরপর ১৯২২ সালের ২২ ডিসেম্বর উদ্বোধন হয়েছিল এই বিদ্যালয়ের। বিশ্বভারতীতে কবি সনাতন ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ব্রহ্মচর্য ও গুরুপ্রথার পুনর্প্রবর্তন করেছিলেন। এই বিদ্যালয়ের জন্য অর্থসংগ্রহ করতে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন তিনি। নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য হিসেবে প্রাপ্ত সম্পূর্ণ অর্থ তিনি ঢেলে দিয়েছিলেন এই বিদ্যালয়ের পরিচালন খাতে। নিজেও শান্তিনিকেতনের অধ্যক্ষ ও শিক্ষক হিসেবেও অত্যন্ত ব্যস্ত থাকতেন তিনি। সকালে ছাত্রদের ক্লাস নিতেন এবং বিকেল ও সন্ধ্যায় তাদের জন্য পাঠ্যপুস্তক রচনা করতেন। ১৯১৯ সাল থেকে ১৯২১ সালের মধ্যে বিদ্যালয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে তিনি একাধিকবার ইউরোপ ও আমেরিকা ভ্রমণ করেন।

প্রাণের প্রদীপ

ধর্ম ও ঈশ্বরচেতনা রবীন্দ্রনাথের সারা জীবনের কর্ম ও সাহিত্যের মধ্যেই নিহিত। তবে রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের উপাস্য দেবতা নন। তাঁর ধর্মও সমাজ-প্রচলিত মতবাদগুলির থেকে অনেকাংশে পৃথক। তাঁর ঈশ্বর কর্মী ঈশ্বর। তাঁর অবস্থান স্বর্গলোক নয়, মানবের সংসার। তাঁর মূর্তি নেই। মানুষের মধ্যেই তাঁর প্রকাশ, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় তিনি "রূপসাগরের অরূপরতন"। তাঁর ধর্মও মানুষের ধর্ম। এই ধর্ম মানুষে-মানুষে ঐক্যবন্ধন করতে শেখায়। এই দর্শন সৌভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়। রবীন্দ্রনাথ আজীবন ধর্মীয় উন্মাদনার বিরোধিতা করে এসেছেন। যে ধর্ম মানুষে-মানুষে ঘৃণার বীজ রোপণ করে, যে ধর্ম সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে সংঘাত-প্রতিঘাতের বাতাবরণ সৃষ্টি করে, যে ধর্ম আমাদের সামাজিক ঐক্যকে খণ্ডবিখণ্ড করে, রবীন্দ্রনাথ বরাবর সেই ধর্মের বিরোধিতা করে এসেছেন। তাঁর এই দর্শন এক অখণ্ড মানবতাবাদের নিদর্শন। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি মিশতে চেয়েছিলেন মানুষের মধ্যে। সারা জীবন গেয়েছিলেন মানুষের জয়গান, জীবনের জয়গান।

(বাংলা উইকিপিডিয়ায় আমার লেখা "রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর" নিবন্ধটি সামান্য পরিবর্তন করে এখানে দেওয়া হয়েছে।)

http://bangabharati.wordpress.com/%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%A4-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7/%E0%A6%B0%E0%A6%AC%E0%A7%80%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%A5-%E0%A6%A0%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%81%E0%A6%B0-%E0%A6%9C%E0%A7%80%E0%A6%AC%E0%A6%A8-%E0%A6%B8-2/

রবীন্দ্রনাথ, এই সময়ে

রবীন্দ্রনাথের সার্ধশততম জন্মবর্ষে এই সময়ের অভিজ্ঞতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাসঙ্গিকতা বুঝে নেওয়ার প্রয়াসে ১৮ ও ১৯ জুন প্রথম আলো ও ব্র্যাক ব্যাংকের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় সেমিনার 'রবীন্দ্রনাথ, এই সময়ে'। দুই দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন দেশের কবি-সাহিত্যিক-লেখক ও রবীন্দ্রভক্ত পাঠক। দুই দিনের জমাট সেই আসরের নানা দিক নিয়ে আমাদের এই মূল রচনা।

বিষয়: রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্য
কাছে ফেরার তাগিদ
 কাজল রশীদ
১০০ বছর বা তারও আগে লেখা রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাসের প্রয়োজন কি শুধুই একাডেমিক বা ঐতিহাসিক? প্রবন্ধকার ওয়াসি আহমেদ নিজে এ প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণ করেছেন। আলোচকত্রয় ও সভাপতিও বিচিত্র পথে একই সত্য অনুসন্ধান করেছেন। 'রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্য বিষয়ে' প্রবন্ধকার বলেন: 'রবীন্দ্রনাথকে খণ্ডিত করে গল্প-উপন্যাসের রচয়িতা গণ্য করলেও তাঁর কথাসাহিত্যিক পরিচয়ের স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকে না। ১০০টির কাছাকাছি গল্পই লেখেননি, বাংলা সাহিত্যের এই উজ্জ্বল শাখাটির তিনিই জনক। উপন্যাস লিখেছেন এক ডজনের বেশি। শ্রেণী বিভাগের প্রয়োজনে কথাসাহিত্যকে আলাদা করলেও রবীন্দ্রনাথের কবিতা-নাটকসহ বহুবিধ সৃজনী কর্মকাণ্ডের নির্যাসকে একটি অভিন্ন চিন্তাচেতনার ঐক্যে গাঁথা চলে। রবীন্দ্রনাথ কোনো ডকট্রাইনেয়ার দর্শনের প্রবক্তা ছিলেন না। মৌলিক চিন্তাভাবনাপ্রসূত কোনো নন্দনতাত্ত্বিক দর্শনও তিনি প্রতিষ্ঠিত করেননি। প্রয়োজনমতো নানা উৎস থেকে এর উপাদান সংগ্রহ করেছেন।'
ভাবনা, যৌক্তিকতা ও বিশ্লেষণের সমন্বয়ে কথাসাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথকে এভাবেই খুঁজে ফিরেছেন প্রবন্ধকার।
রবীন্দ্রনাথের সৃজনসম্ভারের সঙ্গে পূর্বাপর বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করেছেন কখনো প্রত্যক্ষে, কখনো বা পরোক্ষে। হাজির করেছেন তাঁর সমসাময়িক, আগের কিংবা পরের লেখক-সাহিত্যিক, কবি-সমালোচক, তাত্ত্বিক ও সাহিত্যবোদ্ধাদের। আন্তর্জাতিকতার নিরিখে, দেশজ প্রেক্ষাপটে, সমাজ-রাষ্ট্র-ব্যক্তির আলোকেও প্রবন্ধকার রবীন্দ্র কথাসাহিত্যের একটি স্বর্ণরেখা টেনেছেন। যে রেখা কখনো গন্তব্যে গেছে, কখনো যায়নি। তবে পরিব্রাজক সত্তাকে উন্মোচিত করেছেন। যার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্র কথাসাহিত্যের অপরূপ রূপ বিন্যস্ত হয়েছে।
প্রবন্ধকারের ভাষায়:
দার্শনিক বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথের সামগ্রিক সাহিত্যকৃতিতে ঐক্যের সন্ধান মিললেও তাঁর গল্প ও উপন্যাসের জগৎ বিষয়ভাবনা ও প্রকারগত দিক থেকে একে অন্যের থেকে আলাদা।…গল্পগুচ্ছ-এ স্বল্প পরিসরে হলেও তিনি গল্পের ভেতর দিয়ে ভাবনাকে ছুঁয়েছেন, অন্যদিকে উপন্যাসে আইডিয়াকে দাঁড় করাতেই গল্পের কাঠামোর আশ্রয় নিয়েছেন, এমনকি চরিত্রেরও।
কথাসাহিত্যে তাঁর মানবতাবাদী শ্রেয়নীতিকে বলা যায় জীবনদেবতারই প্রতিরূপ।…এ প্রসঙ্গে ঘরে বাইরের দৃষ্টান্ত টানা যেতে পারে। উপন্যাসের ঢঙে এখানে রবীন্দ্রনাথ যা দাঁড় করিয়েছেন, প্রকৃতপক্ষে তা দেশ, জাতীয়তাবাদবিষয়ক থিসিস।…বিমলা-সন্দীপের রাজনৈতিক রোমান্সের সমাপ্তি ঘটাতে এবং নিখিলেশের থিসিসই যে শ্রেয়নীতি, তা প্রতিষ্ঠিত করতে সন্দীপকে কেবল শভিনিস্ট প্রমাণ করলে চলে না, তাকে হতে হয় লোভী, স্বার্থপর। কিন্তু মুশকিল হলো, সন্দীপ তো ব্যক্তিমাত্র, আর থিসিসের পটভূমি অগ্নিগর্ভ ভারতবর্ষ। তার পরও এক সন্দীপের উদাহরণেই শ্রেয়নীতি প্রতিষ্ঠা পায়। কথাসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথকে কাছের মানুষ অভিহিত করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মহীবুল আজিজ বলেন: 'রবীন্দ্রনাথ কথাসাহিত্যে অনেক বেশি স্পষ্ট, কবিতার মতো রহস্যময়ী নন। তিনি সারা জীবন ছিলেন ঔপনিবেশিক লেখক, সে কারণে তাঁর ওপর একটা চাপ ছিল। সে চাপ তাঁর সমকালীন পশ্চিমা লেখকদের ছিল না। পূর্ববঙ্গবাস রবীন্দ্র কথাসাহিত্যের জন্য আশীর্বাদ, পরম পাওয়া। গল্পগুচ্ছ-এর গল্পগুলোয় যার প্রমাণ ও বৈশিষ্ট্য প্রকৃষ্টরূপে বিদ্যমান।'
তাঁর মতে, হোমারের ইলিয়াড, ওডেসিকে যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি বর্তমানের প্রাসঙ্গিকতায় রবীন্দ্রনাথের গোরাকেও অস্বীকার করা যায় না।
রবীন্দ্রনাথ জীবন-জগৎকে দেখার ক্ষেত্রে নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। বিষয়, আঙ্গিক, ভাবনায়, বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। আধুনিক কালের লেখকেরাও তা অব্যাহত রেখেছেন তাঁকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সম্যকভাবে বিচার করার কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী।
রবীন্দ্রনাথ শুধু পথ চলেননি, পথ তৈরিও করেছেন। নিজের তৈরি ভাষায় লিখেছেন। বিশ্বসাহিত্যের প্রতিভাধর লেখকদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পার্থক্য এখানেই বলে উল্লেখ করেন প্রথম আলোর উপসম্পাদক কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। প্রবন্ধকারের সঙ্গে সহমত প্রকাশ না করে তিনি বলেন: 'রবীন্দ্রনাথ সোনার তরীর 'বর্ষাযাপন' কবিতায় ছোটগল্প সম্পর্কে যে কথা বলেছেন, তা মেনে ভালোই করেছেন। রবীন্দ্রনাথ আমাদের গল্প পড়তে শিখিয়েছেন। গল্পের অপূর্ব ভাষাভঙ্গির জন্যই তিনি প্রাসঙ্গিক ও বেঁচে থাকবেন।'
সভাপতি হাসান আজিজুল হক সহজ করে কঠিন কথাটি বলেছেন: 'রবীন্দ্রনাথ আকাশের মতো উদার, আবার পলায়নপর। তাঁকে নিয়ে শেষ কথাটি বলা অত সহজ নয়।'
তিনি বলেন, সাহিত্য ক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তিযোগ্য কিছুই নেই।
সত্যেরও যেমন নির্ধারিত রূপ নেই, মিথ্যারও নেই। দুটোই নড়াচড়া করছে। আসল কথা হলো, নিজেদের রবীন্দ্রনাথের কাছে নিয়ে যাওয়া। অন্যের মূল্যায়নের প্রতি নির্ভর না করে নিজে অনুসন্ধান করা। তাঁকে পড়া। সেখান থেকেই নিজের মতো করে গ্রহণ বা বর্জন করা। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নানামুখী আলোচনা হচ্ছে। আলোচনা করে তিনি বড় কি ছোট, প্রমাণ করে লাভ নেই। আমাদের ভেতরের সব দেয়াল ভেঙে তাঁর কাছে ফেরার মধ্যেই রবীন্দ্র কথাসাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা অন্বেষণ সম্ভব।'

বিষয়: রবীন্দ্রনাথের কবিতা
নতুনের অপেক্ষায়
 পিয়াস মজিদ
রবীন্দ্রজন্মের ১৫০ বছর এবং প্রয়াণের ৭০ বছর পর সৈয়দ শামসুল হক রবীন্দ্রনাথের কবিতার দিকে নতুন দৃষ্টিতে তাকাতে চান। রবীন্দ্র-কবিতার বিষয়ভাগ নয়, বরং আঙ্গিকগত দিকই তাঁর আগ্রহের বস্তু। বিশেষত কবিজীবনের প্রথম থেকে শেষাবধি ছন্দের নানা নিরীক্ষা সৈয়দ হকের কাছে বিস্ময়-উদ্রেকী। 'রবীন্দ্রনাথ: তাঁর কবিতা, আমার কাছে' শীর্ষক প্রবন্ধে লেখকের বলার কথা এই যে মহৎ বক্তব্য পথে পড়ে থাকতে পাওয়া যায়। ইত্যাকার বক্তব্য উত্তরকালের কোনো সৃজনশীলের কাছে মহার্ঘ্য হতে পারে না। পূর্বজ কবির কাছ থেকে নেওয়ার যা থাকে তা হচ্ছে তার সৃষ্টির কারিগরি কাঠামো।
রবীন্দ্রনাথ সৈয়দ শামসুল হকের কাছে সোনার ঠাকুর নন; ভীষণভাবে একজন মানুষ কবি। তাই তিনি ফিরে তাকাতে চান তার বহুভঙ্গিম কবিজীবনের পানে। দেখেন রবীন্দ্রনাথেরও গেছে কবিতা-বন্ধ্যা সময়। দেখেন আবার এক দিনেও লিখেছেন স্মরণীয় একাধিক কবিতা। দেখেন কাটাকুটিময় কবিতার পাণ্ডুলিপি। অবিরাম শোধন-মার্জনের মধ্য দিয়ে তৈরি করছেন কবিতার কায়া। তখন অনুধাবন হয় যে কবিতা নেহায়েত ভাবের প্রসূন নয়, কবিতা কবির সচেতন নির্মাণ।
রবীন্দ্র-কবিতার কাছ থেকে এই শিক্ষা লাভ হয় আজকের কবির যে শব্দের পাশে শব্দ সংস্থাপনের ইন্দ্রজালবিদ্যা আয়ত্ত থাকতে হয় যেকোনো কবির। প্রবন্ধকার রবীন্দ্রনাথের কবিত্ব দৃষ্টিগোচরভাবে শনাক্ত করেন শব্দকে চিরকালের মতো নিজস্ব করে নেওয়ার প্রতিভাতে।
তবে রবীন্দ্র-কবিতার বিষয়ভাগে যে আধ্যাত্মিক জগতের বিস্তার তাকে সৈয়দ শামসুল হক নিজের জগৎ ভাবতে পারেন না। এ পথে সমসময়ের মানুষের মুক্তি বা স্ফূরণ সম্ভব কি না এ ব্যাপারে তিনি সংশয়াকীর্ণ। রবীন্দ্রনাথের সময় থেকে এ কালের কবির সময় গেছে বদলে। জীবন ও সমাজে এসেছে বিপুল পরিবর্তন। তাই রবীন্দ্র-কবিতার সেই দার্শনিক নেপথ্য-চালক 'জীবনদেবতা' এখন তার কাছে পূজনীয় নয়। দুটি মহাযুদ্ধ, সহিংসতা ও সমর, মানুষের পতন ও মূল্যবোধের বিপর্যয় ইত্যাদি নেতিমূলক পরিস্থিতির দ্রষ্টা কবিকে রবীন্দ্রনাথের 'জীবনদেবতা'র শান্ত-সৌম্য বাণী সম্মোহিত করে না। বরং 'তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি/ বিচিত্র ছলনাজালে/ হে ছলনাময়ী!' রবীন্দ্র জীবনের অন্ত্যপর্যায়ী এই উচ্চারণেই সৈয়দ হক খুঁজে পান সমসাময়িক স্বরভঙ্গি।
আলোচকদের একজন খোন্দকার আশরাফ হোসেন প্রবন্ধকার সৈয়দ শামসুল হকের মতের বিরোধিতা করে বলেন যে তিনি রবীন্দ্র-কবিতার আঙ্গিকে আকর্ষিত নন বরং বিষয়ভাগের প্রতিই তাঁর মনোযোগ। ইউরোপবাহিত মডার্নিজমের চোখে রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে দেখার ফলেই আমরা রবীন্দ্র-কবিতার স্বাদ-আস্বাদনে ব্যর্থ বলে মনে করেন তিনি। রবীন্দ্র-কবিতার ভূগোলব্যাপী আধ্যাত্মিকতার বিস্তার বলে সৈয়দ হক তাঁর ভেতর এই সময়ের কবির মুক্তি খুঁজে পান না কিন্তু খোন্দকার আশরাফ হোসেন আধ্যাত্মিকতাকেই একটি অচিকিৎস্য ব্যাপার বলে মনে করেন। টিএস এলিয়টের উদাহরণ দিয়ে আশরাফ বলেন যে তাঁর অধিকাংশ কবিতাই আধ্যাত্মিকতা-ভারাতুর কিন্তু এই সময়ের কবি বা পাঠকের কাছে তিনি মোটেও অগ্রহণীয় নন বরং দিনে দিনে এলিয়ট আরও বেশি পঠিত হচ্ছেন।
কবি নির্মলেন্দু গুণ রবীন্দ্রনাথকে দেখেন একজন পরিশ্রমী পূর্বজ কবি হিসেবে, রবীন্দ্রনাথের প্রভাব রবীন্দ্র-পরবর্তী কবিদের ভেতর প্রত্যক্ষভাবে না হলেও অন্তঃশীলে গভীরভাবে প্রবহমান বলে তাঁর ধারণা।
অপর আলোচক বিশ্বজিৎ ঘোষ দৃঢ়ভাবে মনে করেন রবীন্দ্র-কবিতার বিষয়বস্তু এখনো প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক। ফ্যাসিবাদী উন্মত্ততা, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন, পরিবেশবিরোধী তৎপরতার কালে 'আফ্রিকা', 'বৃক্ষবন্দনা'র মতো কবিতার কাছে বারবার যেতে হবে।
অধিবেশনের সভাপতি জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, সাহিত্যের ধর্মই পরিবর্তনশীলতা। সুতরাং এই সময়ের কবির কাছে রবীন্দ্র-কবিতা যে নতুনভাবে মূল্যায়িত হবে তা-ই স্বাভাবিক, তবে কবি রবীন্দ্রনাথের মূল গুরুত্বের জায়গা হচ্ছে তাঁর কবিতাভাষা। কারণ তিনি কবিতার তৈরি-ভাষা পাননি। মেধা ও শ্রমের যুগল সম্মিলনে রবীন্দ্রনাথ তৈরি করেছেন নিজের এবং বাংলার কবিতার ভাষা।
সেমিনারে অংশগ্রহণকারীদের তর্ক-বিতর্ক, বিশ্লেষণ-সংশ্লেষণে কোনো মীমাংসায় পৌঁছানো না গেলেও এই অভিন্ন উপলব্ধির কিনারে পৌঁছানো গেছে যে কবি রবীন্দ্রনাথ নতুন আবিষ্কারের অপেক্ষায়।

বিষয়: রবীন্দ্রনাথের গান
গানের ঝর্ণাতলায়
 আশীষ-উর-রহমান
'গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি/ তখন তারে চিনি আমি, তখন তারে জানি'—এ কথা তিনি নিজেই বলেছিলেন। আবার সেই ভুবন ছেড়ে যাওয়ার সময় শেষ সম্বল হিসেবে যা নিতে চেয়েছেন তাঁর বিপুল সৃজনসম্ভারের মধ্য থেকে তাও গানই। গানের প্রতিই যে তাঁর আস্থা ছিল গভীর সে কথা আরও নানাভাবে ব্যক্ত করেছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর গান যে আমাদের গাইতেই হবে সে সম্পর্কেও নিঃসন্দেহ ছিলেন তিনি।
সেমিনারে প্রথম দিনের তৃতীয় অধিবেশনটি ছিল রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে। সভাপতি, প্রাবন্ধিক, আলোচক সবাই গানের জগতেরই মানুষ। তাঁরা যেমন রবীন্দ্রনাথের গানের বৈশিষ্ট্য, তাঁর অনন্যতা, তাঁর স্বাতন্ত্র্য এসব নিয়ে যুক্তিনিষ্ঠ বিচার-বিশ্লেষণ করেন, তেমনি তার সঙ্গে যোগ করেন গানের গায়কি কেমন হবে, হচ্ছে; কোথায় এ ক্ষেত্রে ভুলত্রুটিগুলো থেকে যাচ্ছে। রবীন্দ্রসংগীতচর্চার প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে বাধা-প্রতিবন্ধকতার বিষয়ও তাতে বাদ পড়েনি। উপরন্তু এসব তত্ত্ব-পদ্ধতিগত আলোচনার সঙ্গে তারা যোগ করেছিলেন নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। ফলে পুরো আলোচনাটি যেমন বহুমাত্রিকতা পেয়েছিল, তেমনি হয়ে উঠেছিল রসোত্তীর্ণ।
এ পর্বে সভাপতিত্ব করেন সংগীতজ্ঞ অধ্যাপক করুণাময় গোস্বামী। প্রথমেই আসা যাক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে। এটি উপস্থাপন করেছেন ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী। প্রবন্ধটি তিনি রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র সৃজনসম্ভারের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সেখানে গানের অবস্থানটি কোন পর্যায়ে, এবং বর্তমানে তার প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু সেই মূল্যায়ন করে। তিনি বলেন, 'এই সময়ে মানে কোন সময়ে? বর্তমান বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত বিশ্বমন্দার এই প্রেক্ষাপটে? যদি তাই ধরে নিই তা-ই, তাহলে কবির কথা ধার করে বলতে হয়: "হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিয়ত নিঠুর দ্বন্দ্ব"। এরই মধ্যে তাঁরই সৃষ্ট লেখনীতে সান্ত্বনা খুঁজে পাওয়া যায় এই পঙিক্তমালায় "বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি"।'
তিনি বলেন, ষড়ঋতুর রূপকল্প তাঁর গানের ভেতর দিয়ে যেমন অনুভব করা যায় তেমন আর কিছুতে পাওয়া যায় না। আমাদের পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনে তাঁর গান প্রেরণা জুগিয়েছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ রোধ আন্দোলনে রচিত গানগুলো বিশ্লেষণ করলে লক্ষ করা যাবে, কালোয়াতি-ধ্রুপদী গানের ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে উঠেও তিনি প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ও স্বদেশপ্রেমে জাতিকে উজ্জীবিত করতে বেছে নিয়েছিলেন স্বতোৎসারিত মাটি-মানুষের দেশজ লোকসুর। নিজেকে বাউল, ব্রাত্য বলতে দ্বিধাবোধ করেননি।
প্রবন্ধকার বলেন, জমিদারির দায়িত্বভার নিয়ে পূর্ববঙ্গে এসে তিনি ১৮৯০-১৯০১ পর্যন্ত প্রায় এক যুগ ধরে সাধারণ মানুষ ও লোকজ গানের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ লাভ করেন। এ সময় তিনি অবহেলিত লোকসংগীত, গ্রাম্য ছড়াগান সংগ্রহ করেছেন। বাউল লালনের গান সংগ্রহ করে মাসিক প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশ করেছেন। লালনশিষ্য গগন হরকরার 'আমি কোথায় পাব তারে' গানের সুরে যে গানটি রচনা করেছিলেন, 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি', সেই গানটি এখন আমাদের জাতীয় সংগীত।
আলোচনা পর্বে শিল্পী সাদি মহম্মদ প্রাধান্য দেন রবীন্দ্রসংগীত চর্চার বিষয়ে। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংগীত মহাবিদ্যালয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, প্রধান সমস্যা হলো স্বরলিপি নিয়ে। আমরা অনেকেই স্বরলিপি বুঝতে চাই না। নবীন শিক্ষার্থীদের অনেকেই চর্চাটা শেষ পর্যন্ত অব্যাহত রাখে না। একটা পর্যায়ে গিয়ে ছেড়ে দেয়। এ ছাড়া বড় ধরনের আরও একটি সমস্যা রয়েছে উচ্চারণ নিয়ে। অনেকেই হয়তো বেশ ভালো গাইছে, গলায় সুরও আছে চমৎকার, কিন্তু উচ্চারণের বেলায় তাঁর আঞ্চলিকতার ত্রুটিগুলো এড়াতে পারে না। এগুলো এড়ানো জরুরি।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ও শিল্পী লুভা নাহিদ চৌধুরী জোর দিয়েছেন নতুন প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথকে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার ওপর। তিনি বলেন, 'আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁকে চেনাতে পারিনি। বাঙালি জাতীয়তাবোধের চেতনা জাগাতে তিনিই ছিলেন আশ্রয়। গানের মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের ছুঁয়ে গেছেন। এখন সময় বদলেছে। নতুন সময়ে তাঁর বোধ ও চেতনার আত্মীকরণের মধ্য দিয়েই তিনি প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন।'
শিল্পী অদিতি মহসীন বলেন, বাঙালির জীবনের নানা উপলক্ষ ও বোধকে তিনি গানটিতে স্পর্শ করেছেন। সুরের ক্ষেত্রে যেখানে যা ভালো মনে করেছেন তা আত্মস্থ করে নিজের মতো করে প্রয়োগ করেছেন।
অধ্যাপক করুণাময় গোস্বামী সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ভাষা ও সংগীত মিলে গান তৈরি হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষা এখনো পুরোনো হয়ে যায়নি। কিছু প্রেমের গানের ক্ষেত্রে, যেমন 'চরণ ধরিতে দিও গো আমারে', এমন করে আমরা এখন 'চরণ' শব্দ ব্যবহার করি না, তবে গানের অন্য ভাষা এখনো সমকালীন। কাজেই ভাষাগতভাবে তাঁর গান অনেক প্রাচীন বা দুর্বোধ্য হয়নি। সুরের ক্ষেত্রেও তিনি হিন্দুস্তানি রাগসংগীতের কড়াকড়ি থেকে বাংলা গানকে বের করে এনে আধুনিক করে তুলেছিলেন।
উপসংহারে তিনি বলেন, মানুষের ভাষা, দেশ-কাল আলাদা হলেও মানবিক অনুভূতি সব মানুষের প্রায় অভিন্ন। সেই মানবিক অনুভবের জায়গায় রবীন্দ্রনাথের গানের, তাঁর সুরের আবেদন থেকেই যাবে। সময় যত যাবে, তাঁর গানের শ্রোতাও তত বাড়তে থাকবে।

বিষয়: রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা
শেষ বয়সের প্রিয়া
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ জীবনের সৃজনসম্ভার মূলত তাঁর চিত্রকলা। আঁকাজোকার হাতেখড়ি অবশ্য হয়েছিল শৈশবেই। তবে কাব্য, সংগীত, সাহিত্যে যেভাবে আত্মনিবেদন করেছিলেন, আঁকাটা সে তুলনায় উপেক্ষিতই থেকে গিয়েছিল। কাব্য-সংগীত প্রভৃতি রচনাকর্মে পঙিক্ত-চরণ বদলানোর প্রয়োজনে কাটাকুটি করতেন প্রায়ই। সেসব কাটাকুটি কখনো কখনো অভিনব সব নকশা বা আবয়বের আকৃতিও পেয়ে যেত।
পাণ্ডুলিপি দেখে বিষয়টি তাঁর সচেতন গোচরীভূত করেছিলেন তাঁর অনুরাগী আর্জেন্টাই বিদুষী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। পেরুযাত্রার পথে অসুস্থ অবস্থায় যখন তিনি আর্জেন্টিনায় ওকাম্পোর আতিথ্য গ্রহণ করনে তখন পূরবীর কবিতাগুলো লিখছিলেন তিনি। সেই পাণ্ডুলিপির কাটাকুটি দেখে ওকাম্পোর মনে হয়েছিল, সেগুলোর ভেতরে শিল্পগুণ অন্তর্নিহিত আছে। কবিকে চিত্রকর হতে প্রণোদনা জুগিয়েছিলেন তিনি। এসবই আলোচিত হয় 'রবীন্দ্রনাথ এই সময়ে' নামের সেমিনারের প্রথম দিনের শেষ অধিবেশনে।
অধিবেশনটি ছিল ভিন্ন স্বাদের। সভাপতি ছিলেন বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। শিল্পী আবুল মনসুর তাঁর নির্ধারিত প্রবন্ধটি না পড়ে তিনি প্রজেক্টরে রবীন্দ্রনাথের আঁকা এবং তাঁর সমকালে ভারত ও ইউরোপীয় বিভিন্ন শিল্পীর চিত্রকর্ম প্রদর্শন করে স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনা করেছেন। তুলে ধরেছেন রবীন্দ্র চিত্রকলার বৈশিষ্ট্য।
প্রবন্ধকার বলেন, ধারণা করা হয় রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকা শুরু করেছিলেন ৬৭ বছর বয়সে। কবি নিজেই বলেছিলেন এটি তাঁর 'শেষ বয়সের প্রিয়া'। রবীন্দ্রচিত্রকলার দুটো পর্ব ছিল। একটি ১৯২৭-২৮, দ্বিতীয়টি ১৯৪০-৪১ সাল পর্যন্ত। প্রথম পর্বের কাজে ছিল পাণ্ডুলিপির কাটাকুটি থেকে গড়ে ওঠা ছবি। এ পর্বের ছবি পরিকল্পনাবিহীনভাবে বেড়ে উঠেছে রূপ ও ছন্দ বিষয়ে সূক্ষ্ম সচেতনতা থেকে। এগুলো ঠিক পরিপূর্ণ চিত্র নয়। মূলত প্যাটার্ন বা সাদা ও কালোর বিন্যাস। এখানে তিনি রেখার ঘূর্ণন ও ছন্দময়তাকেই উদ্ভাসিত করার প্রয়াস পেয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় পর্বের চিত্রমালা অনেকখানিই ভিন্নতর। এ পর্বের কাজে কাল্পনিক প্রাণীগুলো বদলে এসেছে নারীমুখের ডৌল ঘিরে ব্যাকুল রহস্যময়তা। আছে প্রকৃতিচিত্রও।
এরপর এসেছে তাঁর আত্মপ্রতিকৃতি। নিজের ছবি এঁকেছেন রহস্যময়তার আবরণে। দৃষ্টিতে আছে বিষাদ বা বিপন্নতার ছাপ।
আলোচক শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের মতে, রবীন্দ্রনাথ চিত্রকলার ব্যাপারে কোনো ঐতিহ্যের অনুসরণ করেননি। তিনি ছিলেন ঐতিহ্যছুট শিল্পী।
শিল্পী নিসার হোসেন বলেন, তাঁর ছবির অল্পকিছু আমরা দেখেছি। বহু ছবি অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। কাজেই তাঁর চিত্রকলা নিয়ে চূড়ান্ত করে কিছু বলার সময় এখনো আসেনি।
শিল্পসমালোচক মইনুদ্দিন খালেদ বলেন, তিনি তাঁর কালের ইউরোপ, আমেরিকা, জাপানের শিল্পীদের কাজ দেখেছেন। আমেরিকান ইন্ডিয়ান শিল্পীদের কাজ, ইন্দোনেশিয়ার শিল্পীদের প্রাচীন ঐতিহ্যগত কাজের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। এসবের প্রভাব-প্রচ্ছায়া তাঁর ওপরে প্রভাব ফেলতে পারে কি না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে তাঁর ছবিতে জীবনের সম্মুখীন হওয়ার ভীতি ও বিহ্বলতার প্রকাশ ঘটেছে।
সভাপতি কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, রবীন্দ্রনাথের সম্পূর্ণ কাজ এখনও প্রকাশিত হয়নি। সব কাজ প্রকাশিত হলে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। হয়তো ভীবষ্যতে অন্যান্য ক্ষেত্রের চেয়ে চিত্রকর রবীন্দ্রনাথই প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠবেন। কারণ তাঁর এ দিকটিই এখন পর্যন্ত তেমন সুবিস্তৃতভাবে আলোচনায় আসেনি। পশ্চিমা বিশ্ব যখন জাপান ও চীন ছাড়া প্রাচ্যের কোনো শিল্পকে স্বীকৃতি দিত না, সেখানে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা প্রশংসিত হয়েছে। তিনি একটি নতুন শৈলী সৃষ্টি করেছিলেন। শিল্পসুষমা ও রং প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তিনি বিস্ময়কর উৎকর্ষতায় এগিয়ে ছিলেন। তাঁর চিত্রকলা অমূল্য সম্পদ হয়েই থাকবে।

বিষয়: রবীন্দ্রনাথের নাটক
চির প্রাসঙ্গিকতায় ভাস্বর
 সুদীপ্ত শাহীন
রবীন্দ্রনাথের সামগ্রিক রচনার প্রাসঙ্গিকতা দেশ, কাল ও সমাজের মর্মমূলে প্রোথিত, যা কখনো ম্লান হওয়ার নয়। তাঁর রচনা চির নতুন ও চিরকালের, কারণ তিনি জগৎ ও জীবনকে দেখেছেন 'আজকের চোখ' দিয়ে, যে চোখটি তৈরি হয়েছিল অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দর্শনের সমন্বিত অন্তর্দৃষ্টি থেকে; তাই তিনি সব সময়ই আজকের রবীন্দ্রনাথ। তাঁর নাট্য রচনায় এর ব্যত্যয় ঘটেনি। রবীন্দ্রনাথ নাট্য রচনায় ছিলেন বৈচিত্র্য সন্ধানী এবং সেই কারণে তাঁর নাটকে পাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মনোলোকের সন্ধান। রবীন্দ্রনাথ এই সময়ের সেমিনারের নাটক বিষয়ের প্রবন্ধকার আতাউর রহমান এভাবেই মূল্যায়ন-বিশ্লেষণ করেন রবীন্দ্র নাটকের।
তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথের সমগ্র নাট্যসাহিত্যে পাই ধর্মীয় ভণ্ডামি, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও ক্ষুদ্রতার স্বরূপ উদ্ঘাটন এবং প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সোচ্চার উচ্চারণ। তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রূপকার, বিশ্বের অন্যতম সেরা নাট্যকারও। চির নতুন এবং চির প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্র নাটকের বিশ্ব পর্যটন বাস্তবতা ও সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে এই প্রবন্ধে। ব্যক্তি অভিজ্ঞতার নিরিখে তিনি নাটকগুলোর নানা মাত্রিক নির্যাস তুলে ধরেছেন।
প্রবন্ধকার শেষ রেখা টেনেছেন এভাবে—আমার বিশ্বাস, গীতাঞ্জলির 'দুঃখে যেন করিতে পারি জয়', তাঁর সমগ্র লেখনীসত্তার মূলমন্ত্র ছিল এবং তাঁর নাট্য রচনায় এই জীবনদর্শনের ব্যত্যয় ঘটেনি। … রবীন্দ্রনাথ সমগ্র বিশ্বের অন্যতম সেরা নাট্যকার, চির নতুন এবং চির প্রাসঙ্গিক।
রবীন্দ্রনাথের আকুলভক্ত নন, তবে পরিসীমা বোঝার চেষ্টা করেন বলে আলোচনার সূত্রপাত করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ। তাঁর মতে, বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় রবীন্দ্রনাথ গৃহপালিত হয়ে আছেন। রবীন্দ্রনাথকে খুঁজতে গিয়ে তাঁকে সমালোচনা না করাই হবে সবচেয়ে বড় প্রবঞ্চনা। তিনি বলেন, নাটকের রবীন্দ্রনাথ দোদুল্যমানতায় আন্দোলিত। প্রথম দিকের নাটকে তিনি স্বদেশ ও সমাজ-সংলগ্ন হলেও পরবর্তী সময় সেই সংস্রব থেকে বেরিয়ে আসেন এবং রূপক-সাংকেতিক নাটক নির্মাণে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
রবীন্দ্রনাথ বাউলদের সঙ্গে ঈশ্বরকে খুঁজেছেন জীবন দেবতা রূপে উল্লেখ করে সৈয়দ জামিল আহমেদ স্পষ্ট করে বলেন, যে দেশে সেলফ সেন্সরশিপ হয়, সে দেশে রবীন্দ্র নাট্যচর্চা কিছুটা দুরূহ বৈকি।
রবীন্দ্রনাথের বেশির ভাগ নাটককে বর্তমান সময়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক বলে দাবি করেন অভিনয়শিল্পী সারা যাকের। তাঁর নাটকে বিষয়ের অনেক বেশি পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বলে অভিমত দেন। তাসের দেশ, অচলায়তন, রক্তকরবী নাটকের বিষয়ও তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় রবীন্দ্র নাটক অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক বলে সহমত প্রকাশ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আফসার আহমেদ। তিনি বলেন, শুধু রাজনীতি চিন্তার কারণে নয়, মানুষের সর্বজনীনতায় ও জাতীয় সংকটে রবীন্দ্র নাটক পরম আশ্রয়স্থল।
সভাপতি অধ্যাপক অনুপম সেন বলেন, বহুমুখী প্রতিভা হিসেবে রবীন্দ্রনাথের তুলনা শুধু ভিক্টোর হুগো ও গ্যেটে। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বলেছেন, যে জাতীয়তাবাদে কুফল আছে। তিনি বলেন, তাঁর নাটক সাংকেতিক বা রূপকধর্মী। এই নাটকের মৌলিকতা অতুলনীয়। বিশ্বসাহিত্যে এমন নাটক বিরল। তিনি একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী হয়েও আন্তর্জাতিকতাবাদী। বাঙালিত্বকে অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেছেন। আবার সমাজের প্রত্যেক মানুষের মুক্তির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের মুক্তি ঘটবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। নাটকে সেই বিশ্বাস পরস্ফুিট করে তুলেছেন। তিনি কেবল এই সময়েই প্রাসঙ্গিক নন, তিনি কালজয়ী। শেক্সপিয়র সম্পর্কে তলস্তয়ের তির্যক মন্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, যতই সমালোচনা হোক, রবীন্দ্র নাটক আজ শুধু নয়, শত বছর পরেও পঠিত হবে, মঞ্চস্থ হবে। কেননা, তা সময়কে ধারণ করেছে, তার দাবি মিটিয়েছে। এ কারণে দীর্ঘকাল ধরে রবীন্দ্রনাথ শুধু বাঙালিকে নয়, সারা বিশ্বকে আনন্দ দেবে।

বিষয়:রবীন্দ্র-বিবেচনায় মনুষ্যত্বের দায়
কালের রবীন্দ্রনাথ
 তৈমুর রেজা
অর্থনৈতিক শোষণ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ—এটা প্রসঙ্গ হিসেবে বিরাট। আকবর আলি খান সংক্ষেপে তাই ব্রিটিশ শাসন, জমিদারি ব্যবস্থা, বঞ্চিত মানুষ—এ রকম কয়েকটি প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
ব্রিটিশ শাসনের সাম্রাজ্যবাদী দিকটার প্রতি রবীন্দ্রনাথের স্পষ্ট ঘৃণা ছিল। তাঁর বহু লেখায় তা এসেছে। তবে মহাত্মা গান্ধী বা কার্ল মার্ক্স যেভাবে ব্রিটিশ শাসনকে দেখেছেন, রবীন্দ্রনাথ ঠিক সেভাবে দেখেননি। তিনি মাঝামাঝি একটা দৃষ্টিভঙ্গি বেছে নিয়েছিলেন। গান্ধীর মত ছিল, পাশ্চাত্য সভ্যতা খারাপ জিনিস, তাই বর্জনীয়। আর মার্ক্সের মত ছিল, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ কলোনি আদতে 'আনকনশাস টুল অব হিস্টরি', এই শোষণের মধ্য দিয়েই সমাজ রূপান্তরিত হবে। গান্ধী সত্য হলে ভারতবর্ষ চরকায় সুতা কাটত। আর মার্ক্স সত্য হলে আমাদের সমাজ আমূল বদলে যেত। কিন্তু এ দুটির কোনোটিই ঘটেনি। রবীন্দ্রনাথের কথাই ফলেছে: প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের একটা সমন্বয় ঘটেছে।
জমিদারি সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের মত হলো, জমিদারি ছেড়ে দেওয়া উচিত, কিন্তু মুশকিল হলো, জমিদার চলে গেলে মহাজন ও রায়ত-খাদকদের প্রতিপত্তি বেড়ে যাবে। তাই আইন করে জমিদারি সমস্যার নিদান হবে না। ভেতর থেকে প্রাণসঞ্চার লাগবে। দারিদ্র্য প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ মার্ক্সীয় বা ধ্রুপদি কোনো অর্থনৈতিক ঘরানার মতামতই গ্রহণ করেননি। তিনি মানব উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন: দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, ক্ষমতায়ন করতে হবে। তাঁর মৃত্যুর ৫০ বছর পর এসব কথা আমরা শুনছি অমর্ত্য সেনদের মতো উন্নয়ন-অর্থনীতিকদের মুখে। রবীন্দ্রনাথ শ্রেণিসংগ্রামে বিশ্বাস করতেন না। অর্থনৈতিক কাঠামো বদলালেই সমাজ রূপান্তর হবে, এমনটা তিনি ভাবেননি।
বর্ণবাদ বা জাতিভেদ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মত ঠিক কালোত্তীর্ণ নয়। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের আগে জাতিভেদ যতটা ছিল, পরে তার থেকে বহু গুণে বেড়েছে। কালোর ওপর সাদার শ্রেষ্ঠত্ব তৈরি করে তারাই বর্ণবাদের পত্তন করে। রবীন্দ্রনাথ চিরকাল অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে আপসহীন ছিলেন। তবে জাতিভেদের অন্যতর দিক, যেমন ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব, অসবর্ণ বিয়ে, বিভিন্ন জাতির মধ্যে আহারাদি—এসব নিয়ে তাঁর প্রতিবাদ নেই। বর্ণাশ্রমকে 'মঙ্গল' ভেবেছেন। শূদ্র প্রসঙ্গে তাঁর ধারণা ছিল, 'যারা শূদ্র, শূদ্রত্বে তাদের অসন্তোষ নেই'। জাতিভেদ প্রসঙ্গে তাঁর চিন্তা আসলে দেবেন্দ্রনাথের চিন্তারই প্রতিধ্বনি।
নারীমুক্তির প্রশ্নে অনেক ক্ষেত্রেই তিনি উদারভাবে 'পুরুষশাসিত সমাজের দুর্বলতা'র কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি বোধহয় নারীর সামাজিক অবস্থা নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন ছিলেন না, নারীহূদয় নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর মতে, আমাদের সমাজে স্ত্রীলোকেরা বেশ এক রকম সুখে আছে।
রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় নারীর অবস্থান কি এগিয়েছে? নারী-পুরুষের অনুপাত দেখলে এটা সহজে বোঝা যায়। জৈবিক নিয়মে নারীর সংখ্যা বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক, কম হলে বুঝতে হবে সমাজে বৈষম্য চলছে। অমর্ত্য সেন এসব হারিয়ে যাওয়া নারীকে বলেছেন 'মিসিং উইমেন'। ১৮৭২ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত বাংলায় ক্রমাগতভাবে নারীর অনুপাত কমে গেছে। এর প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ ও অপুষ্টির ফলে ঘটা মাতৃমৃত্যু। এগুলো নারীদের প্রকৃত সমস্যা। রবীন্দ্রনাথ এদিকে আকৃষ্ট হননি। নিজেও শিশুকে বিয়ে করেছেন, মেয়েদেরও শিশু অবস্থায় বিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সাহিত্যে বাল্যবিবাহকে রোমান্টিক করেছেন। আমাদের মেয়েরা সবার খাওয়া শেষে যদি কিছু থাকে, তা-ই খায়। তিনি এর প্রশংসা করেছেন। কিন্তু এটাই আমাদের নারীর অপুষ্টির একটা বড় কারণ।
এসব সীমাবদ্ধতা তাঁর মধ্যে আছে। এমন ভাবার কোনো কারণ নেই যে সব ব্যাপারেই কালকে ছাড়িয়ে উঠবেন তিনি। এতে তাই আঁতকে ওঠার মতো কিছু নেই যে তিনি জাতিভেদ ও নারী প্রশ্নে 'সেকেলে' ছিলেন।
তাঁর লেখার প্রধান শক্তি দুটি: তিনি মানবতাবাদী ছিলেন এবং তিনি আদর্শবাদী ছিলেন না। আদর্শ বা মূল্যবোধের চেয়ে সব সময় তিনি মানুষকে ওপরে ঠাঁই দিয়েছেন। বিপ্লব তাঁর বাসনা ছিল না, কারণ বিপ্লবে সমস্যার নিরাময় ঘটে না বলেই তাঁর বিশ্বাস। তিনি চেয়েছেন বঞ্চিতের ক্ষমতায়ন, শিক্ষার প্রসার আর সচেতনতা।
সংক্ষেপে মোটামুটি এ রকমই দাঁড়াবে আকবর আলি খানের বক্তব্য। আলোচক হায়াৎ মামুদ বললেন, রবীন্দ্রনাথকে তো আর আমরা এভাবে বিচার করি না যে রবীন্দ্রনাথ সমাজসংস্কারক। তিনি নিজেও জানতেন, এ কাজ তাঁর নয়। তিনি যা সংস্কার করবেন তা হলো একটি দেশের, একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সাহিত্য। মালেকা বেগমের মতে, রবীন্দ্রনাথ সমকালীন, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক ও উদার। তাঁকে সামগ্রিকভাবে বুঝতে হবে। রবীন্দ্রনাথ যখন বঞ্চিতের কথা বলেন, তার মধ্যে আমরা নারীকে পাই। খালিকুজ্জামান ইলিয়াস আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত তর্কের প্রসঙ্গ ধরে আলোচনা করেন।
সভাপতি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে জানালেন, গান্ধী ও মার্ক্স দুজনের থেকেই দূরে রবীন্দ্রনাথ। তবে গান্ধী থেকে যতটা দূরে, মার্ক্স থেকে অত দূরে ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথ ধর্মের সঙ্গে শিল্প-সমাজ-রাষ্ট্রকে গুলিয়ে ফেলার পক্ষপাতী ছিলেন না।

বিষয়: রবীন্দ্রনাথের জাতি-ভাবনা
কবির নো-নেশন
বিনায়ক সেনের প্রবন্ধটি কয়েকটি অংশে বিভক্ত। প্রথম ভাগ—মোহ ও মোহভঙ্গ। এই ভাগের আলাপের বিষয় রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনে নেশনের ঘোর, যে কালপর্বে 'বাংলার বাইরের বিশ্বকে তিনি দেখছেন বাঙালির চোখ দিয়ে'। কিন্তু ১৯০৫ সালে হঠাৎ করেই রবীন্দ্রনাথ নিজেকে স্বদেশি আন্দোলন থেকে সরিয়ে নেন। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীকে চিঠিতে লেখেন, '…যতদিন আয়ু আছে, আমার এই প্রদীপটিকে জ্বালিয়া পথের ধারে বসিয়া থাকিব।'
দ্বিতীয় ভাগ—১৮৮৫-১৯০৯: নেশন-ভাবনার প্রথম পর্ব। এ পর্বে বিনায়ক সেন জানাচ্ছেন, একটি বিকল্প নেশনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু নেশনমাত্রই ব্যতিক্রমের ছদ্মাবরণে আসে, ক্রমে তার স্বভাব একই হয়ে দাঁড়ায়।
১৯১০ সালে গোরা উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের মোহভঙ্গ ঘটে। তিনি নেশনের ওপর আস্থা হারান। নানা রকম সামাজিক বিভক্তি জারি থাকায় নেশন নির্মাণ সম্ভব নয়—এটাই ছিল তাঁর অনাস্থার মূল কারণ। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বহু দিন থেকে 'একটা পাপ চলিয়া আসিতেছে', আর শিক্ষিত-মূর্খের ফারাকটা এতদূর যে, আমরা 'এক দেশে থাকিলেও' এক দেশে নেই।
তৃতীয় ভাগ—১৯১০-১৯৪১: নেশন-ভাবনার দ্বিতীয় পর্ব। এই কাল-পর্বে রবীন্দ্রনাথ নেশন আইডিয়াকেই প্রশ্ন করলেন। ন্যাশনালিজমের তিনি নাম দিলেন 'জিওগ্রাফিক্যাল ডেমন'। গোড়ার দিকে তাঁর ধারণা ছিল, 'নেশন একটি মানস পদার্থ'। কিন্তু কিছুকাল পরেই তাঁর মতামত: নেশন হলো 'সেই অস্বাভাবিক অবস্থা' যা গোটা জনসাধারণকে 'যান্ত্রিক প্রয়োজনে' সংঘবদ্ধ করে।
ন্যাশনালিজম বিশেষ করে কেন ভারতবর্ষের বেলায় খাটবে না, সে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ: ইউরোপে শাসক-শোষিতের যে ভেদ ঘটেছিল, 'তা জাতিগত ভেদ নয়, শ্রেণীগত ভেদ'। অথচ ভারতবর্ষে ভেদ ঘটছে মূলত ধর্ম ও জাতির ছুতোয়। ভারতবর্ষে যখন স্বরাজ আন্দোলনের জোয়ার চলছে, তখন রবীন্দ্রনাথের মন পড়ে আছে সমাজের 'বিচিত্র ছলনাজালে'। তিনি নাছোড়বান্দার মতো বলছেন, আগে চাই আত্মশক্তি, তারপর স্বরাজ। রবীন্দ্রনাথের এই চরমপন্থা তখনকার রাজনীতিতে কলকে পায়নি। কিন্তু তাতে তিনি চঞ্চল হননি, তার কারণ বোধহয় রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন প্রবল ভেদের 'দুর্বল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নেশন গড়ার আন্দোলন… এসব ভেদবুদ্ধিকেই আরো বাড়িয়ে তুলবে।'
পরের ভাগ—অনাধুনিক না উত্তর-আধুনিক? এই অংশে রাবীন্দ্রিক-নেশন প্রসঙ্গে পার্থ চট্টোপাধ্যায় যে সমালোচনা দিয়েছেন, সেটা নিয়ে আলাপ তুলছেন সেন। পার্থের মোদ্দা কথা হলো, আধুনিক কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বা গণতন্ত্রের ধারণা রবীন্দ্রনাথের আমলে ছিল না, যন্ত্র বোঝার ধৈর্যও তাঁর ছিল না। এখনকার নেশন-স্টেট বুঝতে রবীন্দ্রনাথ ধরতাই হিসেবে তাই সেকেলে।
পার্থ চট্টোপাধ্যায় যেমন একদিকে রবীন্দ্রনাথের নেশন-ভাবনাকে 'বেহুদা' বলছেন, অন্যদিকে আবার কেউ কেউ তাঁকে ভাবছেন, 'উত্তর-আধুনিক'। ই পি থম্পসনের এ ব্যাপারে সাক্ষ্য আছে, আশিষ নন্দীও রবীন্দ্রনাথের নেশন বিরোধী সমালোচনায় খুঁজে পাচ্ছেন 'স্টেট বিরোধী এক মতাদর্শ যাতে স্বদেশপ্রেমের জায়গা আছে কিন্তু নেশনালিজমের নেই'। আর ইসাহ্ বার্লিন চোখে রবীন্দ্রনাথ 'দুঃসাধ্য মধ্যপন্থার' সাধনায় একাকী পথিক।
শেষ ভাগ—নো-নেশনের সমাজ। রবীন্দ্রনাথ কড়া ভাষায় নেশনের সমালোচনা করেছেন, কিন্তু অতটা কড়া ছোপে 'নো-নেশনের' ছবি আঁকেননি। কিছু ছিটেফোঁটা চিন্তার খোঁজ মিলবে। ঐক্য রাখার প্রয়োজনে তিনি 'ভারতবর্ষে এক রাষ্ট্র শাসন না হয়ে যুক্তরাষ্ট্র শাসননীতির প্রবর্তন' হোক, এটা মেনে নিয়েছিলেন। নো-নেশনের সমাজের দৃষ্টান্ত তিনি খুঁজে পেয়েছেন ভারতবর্ষের বাইরে: চীন, জাপান, পারস্য ও তুরস্কে। তাঁর মতে, নো-নেশনের সমাজের একটা প্রধান অবলম্বন হবে সমগ্র জনসাধারণের উদ্ভাবনী শক্তি। আমলাতন্ত্রেরও কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি।
যন্ত্র বোঝার ধৈর্য তাঁর ছিল না—এই অভিযোগ সর্বাংশে সত্য নয়। বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় 'যৌথতার নতুন নির্মাণের' তিনি স্তুতি করেছেন বটে, আবার মানব চরিত্রের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার রীতিও তিনি ঠিক মনে করেননি।
বিনায়ক সেন সিদ্ধান্ত টানছেন, রবীন্দ্রনাথ 'এ ভূখণ্ডের রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে এক ট্রাজিক চরিত্র'। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, তা-ই বলতেন, তাঁর 'এই-বলার' সঙ্গে 'ঐ-বলা' সব সময় মেলেনি। কিন্তু তিনি দাঁড় বেয়েছেন স্রোতের বিপরীতে। ফলে সমকালীন চিন্তার স্রোত থেকে তিনি ছিটকে গেছেন। সে জন্যই জীবনের উপান্তে নিজেকে তিনি দেখেছেন ব্রাত্যহীনদের দলে।
আলোচকদের মধ্যে সলিমুল্লাহ খান রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। আর সভাপতি আনিসুজ্জামান তাঁর আলোচনায় সামগ্রিকভাবে রবীন্দ্রনাথের জাতি-ভাবনার একটি রূপ নির্মাণ করেছেন।

বিষয়: রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা
পথের দিশা
 জসীম মজুমদার
প্রথম আলো ও ব্র্যাক ব্যাংক আয়োজিত 'রবীন্দ্রনাথ, এই সময়ে' শীর্ষক দুই দিনের সেমিনারের সর্বশেষ অধিবেশনের বিষয় ছিল রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সভাপতিত্বে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রাবন্ধিক-সাংবাদিক আবুল মোমেন। আলোচক ছিলেন মোহিত উল আলম, গোলাম মোস্তফা ও দ্বিজেন শর্মা। প্রবন্ধকার জানান, ইংরেজ-প্রবর্তিত চলমান শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা নিয়ে বাঙালি সারস্বত সমাজে বরাবরই সমালোচনা ছিল। গত পঞ্চাশ বছরে তা জোরদার হয়ে শিক্ষায় নানা রকম সংস্কার ও নবায়ন চলছে বটে কিন্তু তাতেও আশানুরূপ উন্নতি যে হচ্ছে না সে বিষয়েও আমরা সবাই সজাগ। বরং ইদানীং উন্নত বিশ্বে এবং তার রেশ ধরে আমাদের এ অঞ্চলেও পেশা নয় 'জীবনের জন্য শিক্ষার' কথাবার্তাও কিছু কিছু শোনা যাচ্ছে। এই পটভূমিতে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন আবার যেন প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
অন্যের চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষাব্যবস্থায় যে আমরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারব না তা কিন্তু তখনই রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন এবং আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আধুনিক শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি বলে তা মাঝপথেই অনেকখানি হারিয়ে যায়।
আলোচক অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা যেমন বলছেন, রবীন্দ্রনাথ তখনো আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, আমাদের দেশে কিছু বৃত্তিজীবী তৈরি হবে, মানুষ তৈরি হবে না। রবীন্দ্রনাথ এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার কথা ভেবেছিলেন যেটিতে শৃঙ্খল থাকবে না, মুক্তির আনন্দ থাকবে।
রবীন্দ্রনাথের আনন্দের ধারণাটিও বুঝতে হবে তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য ও শিল্পের প্রেক্ষাপটে।
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তায় শিক্ষক ও শিক্ষালয়ের পরিবেশ প্রধান দুটি বিষয়। ১৩৪৩ সনে তিনি শান্তিনিকেতনে স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট বলতে গিয়ে লিখেছেন, 'অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে আমার মনে এই কথাটি জেগে উঠেছিল, ছেলেদের মানুষ করে তোলবার জন্যে যে একটা যন্ত্র তৈরি হয়েছে, যার নাম ইস্কুল, সেটার ভিতর দিয়ে মানবশিশুর শিক্ষার সম্পূর্ণতা হতেই পারে না।'
দ্বিজেন শর্মা বলছেন, পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা কিন্তু নৃভিত্তিক এবং এই ক্ষেত্রে তারা সফল। আর আমরা যা করছি তা হচ্ছে পাশ্চাত্য শিক্ষা পদ্ধতিরই অবিকল সংস্করণ। আমরা যেমন এটা এখন উপলব্ধি করছি, রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তখনই বলেছিলেন, আমাদের শিক্ষাকে আমাদের নিজেদের হাতে নিতে হবে। অর্থাৎ আমাদের উপযোগী করেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
মোহিত উল আলম এর উত্তরণে আবার আমাদের জানাচ্ছেন, আনন্দময় জীবনযাপন বা জীবন উদ্যাপনের মস্ত আকাঙ্ক্ষা মানুষের তা সার্থক হবে তার দুটি সামর্থ্যের ভিত্তিতে—আত্মবিকাশ ও আত্মপ্রকাশ।
বিকাশ হলো ব্যক্তির প্রস্তুতির অংশ আর প্রকাশ হলো সেই প্রস্তুতির ফসল। একটি ঘটবে ভেতরে ভেতরে আর অন্যটি ফুটবে বাইরে। একদিকে অনুশীলন ও সাধনা, অন্যদিকে সক্রিয়তা ও সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন মানুষের সব চর্চার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে—বিকশিত হওয়া, প্রকাশিত হওয়া।
আত্মবিকাশ ও আত্মপ্রকাশের পথটি কীভাবে তৈরি হবে শিশুর জন্য তার জন্য রবীন্দ্র-সাহিত্য থেকেই কতগুলো উপায় বের করেছেন প্রবন্ধকার আবুল মোমেন— ১. শিশুর জন্য ঘরে ও স্কুলে অভয় মন্ত্রে অনুকূল সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে; ২. তার আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার বোধে কোনো আঘাত দেওয়া যাবে না, তা সযত্নে রক্ষা করতে হবে; ৩. তার সুপ্ত সহজাত মৌলিক ক্ষমতার বিকাশে সহায়তা দিতে হবে, যেমন—তার সব ইন্দ্রিয়শক্তির এবং ভাষা, সুর ও দৃশ্যমানের রূপ ও রঙের বোধ; ৪. গাছপালা-নদী-জলাশয়-মাঠ-খেত-সমুদ্র-পর্বত, আকাশ-মহাজগৎ ইত্যাদি সম্পর্কে তাকে সচেতন ও সংবেদনশীল করে তুলতে হবে; ৫. পরিবার-প্রতিবেশ ছাড়াও সাধারণভাবে মানুষ সম্পর্কে তাকে আগ্রহী ও দায়িত্বশীল করে তুলতে হবে; ৬. তার সহজাত যুক্তি-বিবেচনা ও দায়বোধকে এবং বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতাকে ক্রমশ উন্নত ও পরিণত করে তুলতে হবে; ৭. তার জন্য সব কাজে প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় অংশগ্রহণের এবং প্রশ্ন তোলার ও করার অবারিত সুযোগ দিতে হবে; ৮. সৃজনশীল ও প্রায়োগিক কলা চর্চায় তাকে উদ্বুদ্ধ ও সর্বোচ্চ সুযোগ দিতে হবে; ৯. স্বাজাত্যবোধ, মানবসভ্যতার উত্তরাধিকার ও বৈশ্বিক চেতনায় তাকে পুষ্ট করতে হবে; ১০. সমকালীন যেসব ইস্যু প্রকৃতি, মানুষ ও বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা ও উদ্বেগের কারণ সেগুলো সম্পর্কে সচেতন ও সংবেদনশীল হবে।
চাকরি বা অর্থ উপার্জন যদি শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হয় তবে তার চেয়ে ভয়ংকর আর কিছু নেই। দ্বিজেন শর্মা যেমন আশা প্রকাশ করেছেন, হয়তো কোনো মনীষী নতুন কোনো শিক্ষাব্যবস্থা আনবেন, যেটা হবে প্রকৃতিবান্ধব এবং শিক্ষাক্ষেত্র হবে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতামূলক।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আলোচনার ইতি টানেন এভাবে: রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এই উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ রেনেসাঁ-মানব। তিনি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন যার মাধ্যমে এই রেনেসাঁ-মানব তৈরি হবে।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুন ২৪, ২০১১

ট্যাগস:,

http://banglalibrary.evergreenbangla.com/blog/1647

রবীন্দ্রনাথের জমিদারগিরি—জমিদারের রবীন্দ্রগিরি

 
কুলদা রায়

এমএমআর জালাল


প্রথম পর্ব

রবীন্দ্রনাথ জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি জমিদার পরিবারের সন্তান।

ঘটনাচক্রে রবীন্দ্রনাথকেও জমিদারগিরি করতে হয়েছিল। এখানে একটি তবে আছে? সেটা হল অধিকাংশ সময়কালটাই বাবার হয়ে–পরিবারের আত্মীয়স্বজনদের হয়ে রবীন্দ্রনাথকে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। এর জন্য তিনি নিয়মিত বেতন পেয়েছেন।

১৮৮৯ সাল থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৩১ বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এস্টেটের বেতনভোগী হিসাবে জমিদারি দেখেছেন। এই জমিদারির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল সর্বমোট ৫০ বছর। তিনি প্রজাহিতৈষী জমিদার ছিলেন।

এই জমিদারগিরি নিয়েই একটি রবীন্দ্রবিরোধিতা দীর্ঘকাল থেকে নানা কায়দায় চলে আসছে। জমিদাররা যেহেতু শোষক শ্রেণীর প্রতিনিধি–সুতরাং তারা কোনোভাবেই ব্যতিক্রমী হতে পারেন না– ভাল হতে পারেন না। তারা যে কোনো প্রকারেই হোক না কেন প্রজানিপীড়ন করে থাকেন। এইরকম একটি সাধারণ সমীকরণ থেকে বলা যেতে পারে, জমিদার রবীন্দ্রনাথও প্রজানিপীড়ক ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের জীবিতকালেই নানাধরনের বিরোধিতার সম্মুখিন হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে বিরোধিরা তাঁর সাহিত্য কর্ম নিয়ে বিরোধিতা করে জুঁত করতে পারেনি–তখন তারা চোখ বুজে গৎবাঁধা আওয়াজটি দিয়েছেন–বাবু রবীন্দ্রনাথ প্রজানিপীড়ন করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের এই প্রজানিপীড়ন বিষয়ে সম্প্রতি একটি ব্লগে নতুন করে অভিযোগ করা হয়েছে। সে কারণে এই সিরিজে অনুসন্ধান করে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে–'রবীন্দ্রনাথের জমিদারগিরি—জমিদারের রবীন্দ্রগিরি' কেমন ছিল। বোঝার চেষ্টা করা হবে– প্রজানিপীড়নের অভিযোগটির ভাঁড়ার ঘরে কি আছে।

ঠাকুরদের জমিদারীর একটু খতিয়ান—

——————————————-

ডিহি শাহজাদপুর (সদর শাহজাদপুর), বিরাহিমপুর ( যার সদর কাছারি ছিল শিলাইদহে), কালিগ্রাম পরগণা (সদর পতিসর) এবং উড়িষ্যার পাণ্ডুয়া ও বালিয়া তালুক। এছাড়াও নূরনগর পরগণা, হুগলির মৌজা আয়মা হরিপুর, (মণ্ডলঘাট) পাবনার পত্তনী তালুক তরফ চাপড়ি, রংপুরের স্বরূপপুর, যশোরের মহম্মদশাহী ইত্যাদি এলাকাও। গবেষক অমিতাভ চৌধুরীর তথ্যমতে নদীয়া (কুষ্টিয়া)ও ঠাকুর এস্টেটের অধীনে ছিল। তবে প্রধানত বিরাহিমপুর, কালীগ্রাম, শাহজাদপুর ও ওড়িশার কটকের জমিদারি ছাড়া অন্যান্য অঞ্চলের জমিদারি ঠাকুরদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। তার কারণ অবশ্য জানা যায় না।

কিভাবে জমিদারিটা ঠাকুর পরিবারে পেলেন–নীলমণি থেকে দ্বারকানাথ

—————————————————-

জোড়া সাঁকোর ঠাকুর বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা নীলমণি ঠাকুর ছিলেন ব্যবসায়ী। তার পুত্র রামলোচন ঠাকুর বিরাহিমপুর পরগনা (যার সদর কাছারি ছিল শিলাইদহে) জমিদারী কিনেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রখর বিষয়বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি। জমিদারী কিনে পীরালী ঠাকুরদের মধ্যে তিনি কিছুটা আভিজাত্য অর্জন করেছিলেন।

রামলোচন ঠাকুর মৃত্যুর আগে তার দত্তকপুত্র দ্বারকানাথ ঠাকুরকে ১৮০৭ সালে এ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করে যান। তখন তাঁর বয়স মাত্র তের বছর। তার বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এ সম্পত্তি রামলোচন ঠাকুরের স্ত্রী অলকা দেবী ও দ্বারকানাথের বড় ভাই রাধানাথ দেখাশুনা করতেন। সে সময় শিলাইদহ এলাকাটির সুনাম ছিল না। প্রজারা 'দুর্বৃত্ত বলিয়া প্রসিদ্ধ' ছিল। এ জন্য জমিদারী পরিচালনার আইন-কানুন সুপ্রীম কোর্টের ব্যারিস্টার ফার্গুসনের কাছে ভাল করে জেনে নেন।

আইন বিশেষজ্ঞ হওয়ার কারণে ১৮১৮ সালে তিনি চব্বিশ পরগনার কালেক্টরের শেরেস্তাদার নিযুক্ত হন। ১৮২৮ সালে শুল্ক ও আফিং বোর্ডের দেওয়ান হন।

১৮৩০ সালে কালীগ্রাম পরগণা কিনেছিলেন। এ ছাড়া উড়িষ্যার পাণ্ডুয়া ও বালিয়া তালুক তাঁর ছিল। ১৮৩৩ সালে বিরাহিদপুরের কুমারখালি মৌজায় অবস্থিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রেশমের কুঠিটি তিনি কিনে নিলেন। ১৮৩৪ সালে সাহাজাদপুর কেনেন।

সাজাদপুরের জমিদারিটি কিনেছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর, রানী ভবানীর নাটোরের জমিদারির নীলাম থেকে। দাম পড়েছিল ১৩ টাকা ১৩ আনা।

অথ জমিদার দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সমাচার

———————————————

১৮৪৬ সালে দ্বারকানাথের মৃত্যুর পরে তাঁদের হাউসের দেনা এক কোটি টাকা, পাওনা সত্তর লক্ষ টাকা। ৩০ লক্ষ টাকার খবর নাই। ঠাকুর পরিবার গরীব হয়ে গিয়েছিল। সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী লিখেছেন—যাঁহার পিতার ডিনার তিনশত টাকার কমে হইত না, তিনি চারি আনা মূল্যের ডিনার খাইয়া তৃপ্ত হইতেন। সেসময় ১৮৫৫ সালে ঋণের দায়ে দেবেন্দ্রনাথ কারারুদ্ধ হওয়ার পথে। তিনি সংকল্প করলেন দেনা তিনি শোধ করবেন। দেউলিয়া ঘোষিত হবেন না। ছয়মাসের মধ্যেই অবস্থা সামলে ওঠেন। তাঁদের কোনো ব্যবসা বানিজ্য রইল না। শুধু জমিদারীটি টিকে ছিল। তিনি গরীব হওয়ার কারণে বিষয় সম্পত্তিতে মনোযোগী হলেন।

দ্বারকানাথ তাঁর উইলে তিন ছেলের মধ্যে বিষয় সম্পত্তি ভাগ করে দিলেও মৃত্যুর পরে জমিদারি এসে পড়েছে তার বড় ছেলে দেবেন্দ্রনাথের উপর। শিলাইদহে গিয়ে নিজেই জমিদারী পরিচালনা করা শুরু করলেন। গিরীন্দ্রনাথের ভাগে পড়েছিল শাহজাদপুর পরগণা।

দেবেন্দ্রনাথ তাঁর ছোটো দুই ভাই গিরীন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথের অংশের জমিদারি পরিচালনাও এক সঙ্গে করতেন। তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করেন। দেবেন্দ্রনাথের পরামর্শে গিরীন্দ্রনাথ ব্যবসা দেখতেন। তিনি ভাল ব্যবসা বুঝতেন। দ্বারকানাথের অধিকাংশ ঋণই গিরীন্দ্রনাথের সুযোগ্য পরিচালনায় ব্যবসার আয় থেকে শোধ করা হয়। গিরীন্দ্রনাথ ১৮৫৪ সালে মারা যান।

দ্বারকানাথের ছোটো ছেলে নগেন্দ্রনাথ বিলাসী ছিলেন। তিনি সেই পারিবারিক ঋণগ্রস্থ অবস্থায়ও বিপুল পরিমাণ ঋণ করেন। এটা নিয়ে বড় ভাই দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে মনোমালিন্য হয়। দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে অভিমান করে ছোটো ভাই নগেন্দ্রনাথ কলকাতা ছেড়ে বহুদূরে চলে যান। দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হন। তার কোনো সন্তান ছিল না। তিনি সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। ফলে দ্বারকানাথের এই বিপুল জমিদারি দেবেন্দ্রনাথের একার উপরই পড়ে।

গিরীন্দ্রনাথের দুই ছেলে গণেন্দ্রনাথ ও গুণেন্দ্রনাথ অকালে মারা যান। গণেন্দ্রনাথের ব্যবসায়ী বুদ্ধি ছিল ক্ষুরধার। দেবেন্দ্রনাথ ব্যবসা বিষয়ে তার উপরে নির্ভর করতেন। তিনি মাত্র ২৮ বছর বয়সে কলেরা রোগে মারা যান। তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে গিরীন্দ্রনাথের ছোটো ছেলে গুণেন্দ্রনাথও মারা যান। গুণেন্দ্রনাথের নাবালক তিন ছেলের গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের জমিদারী অংশও দেবেন্দ্রনাথকে পরিচালনা করতে হয়। তিনি তাঁদের প্রাপ্য টাকা মিটিয়ে দিতেন।

পরবর্তীকালে দ্বারকানাথের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে সরাসরি জমিদারি পরিচালনা করা ছেড়ে দেন। ব্রাহ্ম ধর্ম পালন ও প্রচারে সময় ব্যয় করেন। দেবেন্দ্রনাথ জমিদরি ছেড়ে দিলে তাঁর প্রতিনিধি হয়ে এই জমিদারিগুলো বিভিন্ন সময়ে পরিচালনা করেছেন বড় ছেলে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বড় জামাই সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রনাথের বড় ছেলে দ্বিপেন্দ্রনাথ ও মেজো ছেলে অরুনেন্দ্রনাথ, সারদাপ্রসাদের ছেলে সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় এবং সর্বশেষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

তখন আয়ের উৎস দাঁড়িয়েছিল শুধুমাত্র প্রজাপ্রদত্ত খাজনা ও অন্যান্য আদায়। বাড়ির পুরুষরা প্রায় কেউই জমিদারী পরিচালনায় অংশ নেন না, কালে ভদ্রে মহালে যান। সেখান থেকে অর্থ আসে। তাঁরা ছিলেন জমিতে অনুপস্থিত জমিদার। পরিবারের সদস্যদের অনেকে সে সব অঞ্চল চোখে পর্যন্ত দেখেন নি। তাঁরা বিলাসী জীবন আর নানাপ্রকার সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকতে ভালবাসতেন। তবে দেবেন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে জমিদারী দেখতে গেছেন। সমীর সেনগুপ্ত লিখছেন—দেবেন্দ্রনাথের চরিত্রের মধ্যে দার্শনিকতা ও বৈষয়িকতার অদ্ভুত পরস্পরবিরোধী সহাবস্থান ছিল। সব কিছু থেকে দূরে থেকেও তিনি তাঁর জমিদারী, আদি ব্রাহ্মসমাজ ও পরিবারকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন।

রবীন্দ্রনাথের জমিদারির শুরুর আগে–

—————————————–

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ৭ ডিসেম্বর, ১৮৮৩ সালে বক্সার থেকে একটি পত্রে রবীন্দ্রনাথকে লেখেন—এইক্ষণে তুমি জমীদারির কার্য্য পর্য্যবেক্ষণ করিবার জন্য প্রস্তুত হও; প্রথমে সদর কাছারিতে নিয়মিত রূপে বসিয়া সদর আমিনের নিকট হইতে জমাওয়াশিল বাকী ও জমাখরচ দেখিতে থাক এবং প্রতিদিনের আমদানি রপ্তানি পত্র সকল দেখিয়া তার সারমর্ম্ম নোট করিয়া রাখ। প্রতিসপ্তাহে আমাকে তাহার রিপোর্ট দিলে উপযুক্তমতে তোমাকে আমি উপদেশ দিব এবং তোমার কার্য্যে তৎপরতা ও বিচক্ষণতা আমার প্রতীতি হইলে আমি তোমাকে মফঃস্বলে থাকিয়া কার্য্যভার অর্পণ করিব। না জানিয়া শুনিয়া এবং কার্য্যের গতি বিশেষ অবগত না হইয়া কেবল মফঃস্বলে বসিয়া থাকিলে উপকার কিছুই হইবে না।

শুরুতে রবীন্দ্রনাথকে তাঁর বাবা দেবেন্দ্রনাথ নিয়োগ করেছিলেন জমিদারী পরিদর্শক হিসাবে। সেটা ১৮৮৯ সালের ঘটনা। রবীন্দ্রনাথ তখন সবেমাত্র বিয়ে করেছেন।

অই সময়ে রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ ভগ্নিপতি সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় ঠাকুর এস্টেটের ম্যানেজারের দ্বায়িত্ব পালন করতেন। তিনি ছিলেন ঘরজামাই। যে কোনো বৈষয়িক ব্যাপারে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রবাস থেকে পত্র লিখে তাঁকেই নির্দেশ দিয়েছেন বলে দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথের বিবাহের রাত্রে ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর। আকস্মিকভাবে শিলাইদহে তাঁর মৃত্যু হয়। সংবাদটি এসে জোড়াসাঁকোয় পৌছায় পরের দিন। শোকের আঘাতে সমস্ত আনন্দঅনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।

সারদাপ্রসাদের মৃত্যু, কয়েকমাস পরে কাদম্বরী দেবী ও দেবেন্দ্রনাথের পুত্র হেমেন্দ্রনাথের দেহত্যাগ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জাহাজী ব্যবসা ইত্যাদিতে শৃঙ্খলায় জমিদারি ও আর্থিক বিলিব্যবস্থার ভার নির্দিষ্ট কারো উপরে দিতে ভরসা পাননি। এর আগে দেবেন্দ্রনাথের পঞ্চম ছেলে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দেখতেন। ১২৯১ (১৮৮৪) সাল থেকে জোড়াসাকোর হিসাবপত্র বড় ছেলে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর দেখতেন। তিনি এই কাজটি পছন্দ করতেন না। মাত্র দেড় মাস পরে তাই তাঁর পুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

দ্বিপেন্দ্রনাথ ২৩ আগস্ট ১৮৮৪ তারিখ থেকে ঠাকুরপরিবারের জমিদারির হিসেবপত্র পরীক্ষা করার দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিপেন্দ্রনাথ পাঁচ বছর এই কাজ করেন। এরপর দেবেন্দ্রনাথের ছোটো ছেলে রবীন্দ্রনাথের উপর এই দায়িত্ব এসে বর্তায়। সে সময় রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য চর্চার ফাঁকে ফাঁকে কাছারিতে নিয়মিত বসে জমিদারির কাজকর্ম শিখতেন।

২ আষাঢ়, ১২৯৬ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন জোড়াসাকোর কাছারির হিসাবপত্র দেখার দায়িত্ব। ১০ অগ্রহায়ণ, ১৩৯৬ তারিখে পেয়েছিলেন জমিদারি পরিদর্শনে অধিকার (নভেম্বর, ১৮৯০)।. এতদিন অবসর মতো জ্যোতিরিন্দ্রনাথ জমিদারি পরিদর্শন করেছিলেন। (১১ অগ্রহায়ণ, ১২৯৬ বঙ্গাব্দ, সোমবার) ২৫, ১৮৮৯ সালে নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ মৃণালিনী দেবী, একজন সহচরী, মেয়ে মাধুরীলতা (বেলা) ও পুত্র রথীন্দ্রনাথকে নিয়ে শিলাইদহে যাত্রা করেন। তাঁদের সঙ্গে গেলেন বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

জমিদারি কাজে কোলকাতায় নহে, শিলাইদহে --

——————————————————

রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে প্রথমবার গেছেন বাল্যকালে বাবা দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে দ্বিতীয়বার ১৮৭৫ সালে দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে। তৃতীয়বার গেলেন জমিদারি পরিদর্শনের কাজে। সঙ্গে পরিবার।

তারা তখন শিলাইদহে একটি বোটে থাকা শুরু করলেন। রবীন্দ্রনাথ ইন্দিরা দেবীকে একটি পত্রে জানাচ্ছেন—শিলাইদহের অপর পারে একটা চরের সামনে আমাদের বোট লাগানো আছে। প্রকাণ্ড চর—ধূ ধূ করছে—কোথাও শেষ দেখা যায় না—পৃথিবী যে বাস্তবিক কী আশ্চর্য সুন্দরী তা কোলকাতায় থাকলে ভুলে যেতে হয়। এই যে ছোটো নদীর ধারে শান্তিময় গাছপালার মধ্যে সূর্য প্রতিদিন অস্ত যাচ্ছে, এবং এই অনন্ত ধূসর নির্জন নিঃশব্দ চরের উপরে প্রতি রাতে শত সহস্র নক্ষত্রের নিঃশব্দ অভ্যুদ্য় হচ্ছে, জগৎ সংসারে এ যে কী একটা আশ্চর্য মহৎ ঘটনা তা এখানে থাকলে তবে বোঝা যায়।

২৮ নভেম্বর বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মৃণালিনী দেবী, বেলা, সহচরীসহ চরে বালিহাঁস দেখতে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ জমিদারির কাজে ব্যস্ত। তিনি সঙ্গে আসেননি। বলেন্দ্রনাথরা চরে ফেরার পথ খুজে পাচ্ছেন না। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনায় দেখা যাচ্ছে, মৃণালিনী দেবী ভালই হাঁটতে পারছেন। কিন্তু সহচরী অমলা দাশ হাঁটতে পারছেন না। ভয়ে তার গা হিম হয়ে আসছে। মাটি ফুঁড়ে যে কোনো সময় ডাকাতদল বের হয়ে আসতে পারে। শেষে উঁচু জমিতে উঠতে একদল মেছোদের দেখা পেলেন। তারা ফেরার পথ দেখিয়ে দিয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথের চিঠি থেকে জানা যাচ্ছে, সকালে মৌলভী সাহেব এক দঙ্গল প্রজা নিয়ে এসেছেন। তারা রবীন্দ্রনাথকে তাঁদের অভাব অভিযোগ প্রার্থনা জানাচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথ শুনে তার প্রতিকার করছেন।

সে সময় বোট গ্রাম্য গাইয়েদের আগমণ ঘটত। তার মধ্যে দুজন মার্কামারা হয়ে গিয়েছিল। একজন বৈষ্ণব—সে কাঙাল ফিকিরচাঁদের গান গাইত, আরেকজন সুনা-উল্লাহ। এক-একদিনের পালায় দুআনা করে পয়সা বরাদ্দ ছিল। নিয়মিত বরাদ্দ ছাড়াও মৃণালিনী শাড়ি, সাংসারিক টুকিটাকি ওদেরকে দিতেন। বলেন্দ্রোনাথ এ সময় সুনা-ওল্লাহর মুখ থেকে শোনা ১২টি গান খাতায় লিখে রেখেছেন। এর মধ্যে ২ সংখ্যক গানের রচয়িতা গগণ মণ্ডল। তিনি গগণ হরকরা নামে পরিচিত। গানটির নাম আমি কোথায় পাব তারে। রবীন্দ্রনাথ সেগুলো শুনছেন। তাদের সঙ্গে আসরে বসছেন। পল্লীগানের সংকলন তৈরি হচ্ছে তার নির্দেশনায়।

পরিদর্শক থেকে আমমোক্তার জমিদার রবীন্দ্রনাথ

—————————————————–

রবীন্দ্রনাথের জমিদারী কাজে সন্তুষ্ট হয়ে ১৮৯৬ সালে ৮ আগস্ট বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর পক্ষে জমিদারি পরিচালনার জন্য পাওয়ার অব এটর্নি করে দেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত এই আমমোক্তারনামা দলিলে দেবেন্দ্রনাথ স্বাক্ষর করেন।Tagore Family Papers, Doc. No.68—এর উপরে লেখা আছে—Power of Attorney from Debendranath Tagore to Rabindranath Tagore on 8th August 1896 in the presence of Mohini Mohan Chatterjee, Solicitor, Cal./Presented between the hours 10 to 11 on on the 8th august 1896. এই দলিলের বলে রবীন্দ্রনাথ জমিদারি-পরিচালনা করেছেন। তখনো বেতন পাচ্ছেন।

আমমোক্তারনামা নিয়ে বাবা দেবেন্দ্রনাথের পক্ষে কবি রবীন্দ্রনাথ জমিদারী পরিচালনা করেছেন। তারপর নিজে জমিদারির মালিকানা পেয়েছেন ১৯২০ সালের ৮ মে।।

এইভাবে কবি রবীন্দ্রনাথের জমিদারগিরি শুরু হয়েছে।

পোস্টসূত্র :

————–

রবি ঠাকুর, রাহাজানি এবং রবীন্দ্র পূজারীবৃন্দ :ফরিদ আহমদ ও অভিজিৎ রায়–

গ্রন্থসূত্র :

———

১. রবিজীবনী–প্রশান্তকুমার পাল

২.রবিজীবনকথা–প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়

৩. রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন — সমীর সেনগুপ্ত

৪. ছিন্নপত্র : রবীন্দ্রনাথ

৫. হাজার বছরের বাঙাল সংস্কৃতি গোলাম মুরশিদ

৬. জমিদার রবীন্দ্রনাথ : শিলাইদহ পর্ব : অমিতাভ চৌধুরী

৭. রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ

৮. স্মৃতিসম্পুট, রবীন্দ্রস্মৃতি; পুরাতনী–ইন্দিরা দেবী :

কুলদা রায় ও এমএমআর জালাল লিখিত রবীন্দ্রবিরোধিতার স্বরূপ সিরিজের লিংক

——————————————————————————————–

১. বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা ও রবীন্দ্রনাথ : 'গ্রহগণ জীবের আবাসভূমি' থেকে 'বিশ্বপরিচয়'—

প্রথম পর্ব : লিংকদ্বিতীয় পর্ব: লিংকতৃতীয় পর্ব : লিংক

২. আমি কোথায় পাব তারে থেকে আমার সোনার বাংলা

৩. রবীন্দ্রবিরোধিতার স্বরূপ : পাকিস্তান পর্ব 

৪. রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন নাই : প্রথম পর্বদ্বিতীয় পর্ব

৫. এইখানে গান নিয়ে আলোচনা চলিতেছে : কুলদা রায়–

দ্বিতীয় পর্ব———————————————-

জমিদারির খোঁজে

—————-

কলিমখানের : জন্মসূত্র–জমিপুত্র–

বঙ্গীয় শব্দার্থ কোষে ৩৮৯ পৃষ্ঠায় কলিম খান রবি চক্রবর্তী লিখেছেন : জমি–(জমিদার, জমী, জমীন, জমীনদান)

জমি শব্দটি এসেছে জম থেকে। জম অর্থ—গতিশীল যাহাতে।

জমি—পৃথিবী, ভূতল, মাটি, কৃষিক্ষেত্র, চাষের ভূঁই, কাপড়ের পিঠ (Surface) বা বুননি (Texture), চিত্রপটের তলদেশ (Ground)।

জমিদার—ভূস্বামী, রাজা। Land—অর্থে জমি এবং Landlord-অর্থে জমিদার শব্দটি প্রচলিত।

যতদূর বোঝা যায়, ভূতলের অংশ বা কৃষিক্ষেত্রের লেনদেন শুরু শুরু হওয়ার পরেই জমি ও জায়গা শব্দদুটির সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ, দুটি শব্দের ভিতরেই 'ই' বা গতিশীলতা রয়েছে। জমি-তে ই-কার রয়েছে সরাসির, জায়গাতে ই রয়েছে 'য়'—এর ভিতরে। কিন্তু কলিম খানের  প্রশ্ন হল—জমিজায়গা গতি পায় কিভাবে?

তিনি বলছেন, জমিজায়গা হেঁটে-চলে বেড়ায় না। একবস্তা ধান কাউকে দিয়ে দেওয়ার মতো জমিজায়গা কাউকে হাতে তুলে দেওয়া যায় না, কেউ তা কাঁধে করে স্থানান্তরে নিয়ে যেতেও পারে না। অথচ একালের মানুষ মাত্রেই জানেন, জমিজায়গা দিয়ে দেওয়া যায়, দান করা যায়, বিক্রি করা যায় এবং অন্যে তা নিয়েও নিতে পারে। কী করে তা সম্ভব হয়?

কার্যত জমিদান, জমিক্রয় ইত্যাদি ব্যাপার মানবসভ্যতার একটা অদ্ভুত আবিষ্কার। বিষয়টিকে বুঝবার জন্য কলিম খান বলেন,  সর্বাগ্রে জানা চাই, ভূতলের কি কোনো অধিকারী বা মালিক হয়? হ্যা, হয়। ভূতল যাদের অস্তিত্বের ভিত্তি, তেমন সমস্ত জড় ও জীবই ভূতলের প্রতিটি বিন্দুর অধিকারী। জড় থেকে জীবের আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্রমান্বয়ে উচ্চতর উত্তরণের সমস্ত ধাপে পেরিয়ে এই ভূতল মানুষের সৃষ্টি করেছে। সেই কারণে এই পার্থিব জগৎ হল অস্তিত্বের মাতা, মানুষ হল তার শ্রেষ্ঠ সন্তান; তার সর্বাধিক আত্মনিয়ন্ত্রণক্ষম বুদ্ধিমান ছেলে; অন্যেরা তুলনায় কম আত্মনিয়ন্ত্রণক্ষম। যে নিজেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে অন্যের সাহায্যে সাহায্য স্বভাবতই করতে পারে না। মানুষই একমাত্র পারে এই বিশ্বের সকল জীব ও জড়কে রক্ষা করে সবাইকে নিয়ে চলতে। ফলত, ভূতলকে কিভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে তার সিন্ধান্ত নেওয়ার অধিকার জন্মে যায়। ফলত, বিশ্বের সমস্ত মানুষ সমগ্র ভূতলের প্রতিটি বিন্দুর মালিক হয়ে যায়। আর, এই মালিকানার ধারণা চলে আদিম যুগ থেকে মহেঞ্জোদাড়োর যুগ পর্যন্ত। এই সময় পর্যন্ত ভূতল হাঁটা-চলা করতে পারেনি, গতিশীল হয়নি।

কিন্তু সুবিধাবাদিতার পাল্লায় পড়ে সেই মানুষ একদিন আত্মকলহে জড়িয়ে পড়ে। পরমাপ্রকৃতি তাকে সাধারণভাবে 'শিবতার' এবং প্রয়োজনে 'দক্ষতার' ব্যবহার করবার যোগ্যতা দিয়েছিল। নিজের নাবালকত্বের কারণে সে অপ্রয়োজনেও দক্ষতার ব্যবহার শুরু করে দেয়। এর অনিবার্য ফলস্বরূপ মানবসমাজে মৌলবিবাদের জন্ম হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় সম্প্রদায় ও সম্প্রদায় পরিচালক মহর্ষিদের বা জ্ঞানীমানুষদের। সেই সম্প্রদায় সৃষ্টির কালে আদি জ্ঞানীগণকে বা কশ্যপকে পৃথিবী দান করে দেওয়ার ঘটনাটি ঘটে যায়; আদিম যৌথসমাজের প্রতিটি মানুষ তাদের তিনটি অধিকার জ্ঞানীগণকে দান করে দেয়; যার তৃতীয়টি ছিল ভূতলের উপর প্রত্যেক মানূষের নিজ নিজ অধিকার। ভূতলের অংশ বা জমির হাঁটা-চলার সূত্রপাত হয়ে যায় সেই থেকে। এই অবস্থাতেই কেটে আরও হাজার বছর।

তারপর একদিন মহর্ষি (জ্ঞানী, ব্রাহ্মণ, মন্দির-চার্চ-মঠ-মন্দিরের অধিকারী) তাঁর অধিকারের ভূমির দেখভাল করার জন্য রাজা নিয়োগ করেন, অর্থাৎ রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়। রাজা ও রাজার সাগরেদ রূপে সামন্তগণ জমির দেখভালের দায়িত্বও পেয়ে যান, কিন্তু তারা তো আর চাষ করেন না। অতএব তারা সে অধিকার দিয়ে দেন রায়তদের। এরপর এক রাজা আরেক রাজাকে সরিয়ে ক্ষমতায় বসে, দেখভালের কাঁধবদল হতে থাকে; যদিও গোড়ায় থেকে যায় আদি জ্ঞানজীবী মন্দির-মঠ-চার্চ-মসজিদ এবং শেষ সীমায় থেকে যায় একই রায়ত। এর মাঝে জমির যে লেনদেন চলতে থাকে, তা কেবলমাত্র দেখভালের-চাষাবাদের অধিকারের লেনদেন।

মুগলদের জমিদারি বেত্তান্ত—

মুগল আমলে জমিদার বলতে প্রকৃত চাষির ঊর্ধ্বে সকল খাজনা গ্রাহককে বোঝানো হতো। প্রকৃত চাষি জমিদার নয়, কারণ সে কখনও তার জমি খাজনা বা ভাড়ায় অন্য কাউকে প্রদান করে না। জমিদাররা শুধু খাজনা আদায়ের স্বত্বাধিকারী, জমির স্বত্বাধিকারী নয়। পক্ষান্তরে, জমির মালিকদের বলা হতো রায়ত বা চাষি যাদের নামে জমাবন্দি বা রেন্ট-রোল তৈরি হতো। এই ধারণায় জমিদারগণ রাজস্বের চাষি ছিল মাত্র। এরা ছিল সরকার এবং হুজুরি(স্বতন্ত্র) তালুকদার ব্যতীত নিম্নস্তরের রাজস্ব চাষিদের মধ্যস্থ পক্ষ। হুজুরি তালুকদারগণ খালসায় (খাজাঞ্চি খানায়) সরাসরি রাজস্ব প্রদান করত।

জমিদার এই পদবি বা শব্দটি ভূঁইয়া বা ভূপতি নামে যে দেশীয় পারিভাষিক শব্দটি প্রচলিত আছে তার সরাসরি প্রতিশব্দ বলা যায়। এই ভূঁইয়া বা ভূপতিরা ছিল ভারতের প্রাক্‌-মুগল আমলের বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিক। মুগলগণ তৎকালে প্রচলিত ভূমি ব্যবস্থাকে তাদের আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণের জন্য একটি নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তর করে। অবশ্য চিরাচরিত ক্ষমতা ও উৎপাদনের উপায়গুলি তেমন বিশেষ পরিবর্তিত হয় নি।

টোডর মল্লর বন্দোবস্ত (১৫৮২) যা দূরবর্তী বাংলা সুবায় একদিন জমিদারি পদ্ধতির সূচনা করেছিল, তা ১৬৫৮ সন পর্যন্ত বজায় থাকে। এই সময়ে বাংলার সুবাহদার শাহ সুজার (১৬৫৭) রাজস্ব বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিদারি ব্যবস্থায় কিছুটা বল সঞ্চার হয়। এরপর ১৭২২ সনে সুবাহদার মুর্শিদ কুলির মালজমিনি (ভূমি রাজস্ব) পদ্ধতি প্রচলিত হয়। সরকারি রাজস্ব সর্বাধিক করা ও রাজস্বের নিয়মিত পরিশোধ নিশ্চিত করার জন্য মুর্শিদ কুলি বাংলা প্রদেশকে পূর্ববর্তী চৌত্রিশটি সরকারের পরিবর্তে তেরটি চাকলায় (প্রশাসনিক বিভাগ) ভাগ করেন। আর সেসঙ্গে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র জমিদারদের চাকলাদারের এখতিয়ারাধীন করেন। এই চাকলাদারগণ মনোনীত হন বৃহৎ জমিদারবর্গ থেকে আর তারা জমির মালিক হিসেবে নয় অধস্তনদের তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। তাদের কাজ ছিল দক্ষতার সঙ্গে রাজস্বের আদায় ও সংগ্রহ নিশ্চিত করা। তবে প্রধান জমিদারগণকে রাজস্বের রাজকীয় অংশের জন্য খালসা বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কাছে জবাবদিহি করার ফলে তাদের সনাতন ক্ষমতা ও মর্যাদাগত অবস্থান আরও বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও প্রতিভাবান জমিদারগণকে বিভিন্ন সরকারি পদে নিযুক্তির যে প্রস্তাব দেওয়া হয় তার ফলে রাজদরবারে তাদের অবস্থানগত মর্যাদা বৃদ্ধি ও সেসঙ্গে তাদের নিজ স্বার্থকে আরও এগিয়ে নেবার সম্ভাবনা অনেক দূর প্রসারিত হয়। রাজস্ব ব্যবস্থাপকের ভূমিকা থেকে জমিদারে রূপান্তরিত হওয়ার এই প্রক্রিয়াটি আঠারো শতকের মাঝামাঝি নাগাদ সম্পূর্ণ হয়।

সময়ের চিত্র : ফ্রম শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের শাহজাদা দারাশুকো থেকে—

কোটচাঁদপুর সরকার যশোহরের একটি মহাল। মোট পরিমাণ ফল ৮৩২০ বিঘা। আকবর বাদশার আমলে স্থির হয়েছিল—লড়াই-হামলার সময়—মহাল কোটচাঁদপুর আগ্রাকে দেবে ২০০ ঘোড়সওয়ার আর ১০১ জন পদাতী। .ঘোড়সওয়ার বা পদাতী দিতে না পারলেও মহান কোটচাঁদপুর শাহী খাজনা-খানায় পুরো মুল্য ধরে দিত—ফৌজদারের হাদ দিয়ে। কড়ায়-ক্রান্তিতে। আশরাফিতে—মোহরে।

লেখাটিতে একজন পথিককে দেখা যাচ্ছে। তিনি পায়ে হেঁটে আসছেন কোটচাঁদপুরের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় পথিক দাঁড়িয়ে পড়লেন। তার পায়ের ফাঁক দিয়ে দুটি বনমোরগ ছুটে পালাল। দূরে বনশুয়োরের ঘোত ঘোত। পথিক এক একই বলে উঠলেন, আগে এখানে একটা গাঁ ছিল। এখন নেই। মুছে গেছে। বসতি মুছে যাওয়ার পরে এখানে বোধ হয় কোনওখানে মানুষজন মানত করতে আসে। তাদের মানত করা মুরগিগুলো এখন বনমোরগ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই সঙ্গে বনজঙ্গল বেড়ে যাওয়ায় বনশুয়োর এসে জুটেছে।

পথিক জানেন, কোটচাঁদপুরে রাত জেগে থাকত। তাঁতীরা খটখট করত। নেই। শুন্য। ভিটেমাটি। জঙ্গল। গ্রামটি মুছে গিয়েছিল—মগদের লুটপাটের কারণে। পথিকের চার ভাইপোকে মগরা ধরে নিয়েছিল। আর নিয়ে গিয়েছিল বাড়ির কিশোরী মেয়েটিকে। এদেরকে দাস হিসেবে বেঁচে দেওয়া হয়েছে সেসময়ে। সে সময়ের শাসকবর্গ মগ দস্যুদের দমনের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। প্রজারা বাঁচল কি মরল এটা নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা ছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল প্রজাদের কাছ থকে খাজনা আদায় করা।

সে সময় মুর্শিদ কুলি খাঁ বলছিলেন, বাদশার পাওনা হল-বিঘা পিছু চার মণ গম, চার মণ যব, আড়াই মণ সরষে, সাড়ে তিনমন ছোলা বা মটর আর ছমন কলাই। কিন্তু জমিতে যদি পেঁয়াজ, লেবু, শাকসবজি ফলে—তাহলে নগদ তনখায় খাজনা দিতে হবে। এছাড়াও নীল, পান, তেতুল, গাজা, চুবড়া আলু, শাকালু, লাউ, কুমড়ো ফলানের নগদে খাজনা চাই। এসব হিসেব করার জন্য কানুনগোরা গ্রামে গ্রামে যায়। গরু মোষ রক্ষায় গোসেমারি খাজনা চালু কর হয়েছিল। ফলবান গাছের উপর খাজনা, সরদবক্তি, শান্তি রাখতে দারোখানা খাজনা, সরাফি, হাসিলবাজার—সব রকম খাজনার পাশাপাশি গাঁজা, কম্বল, তেল, কাঁচা চামড়ার উপরেও কর বসেছে প্রয়োজনে।

মুগল বনাম বণিক : দ্বৈতশাসন–

১৭৫৭ সালে সিরাজউদদৌলা ইংরেজ বণিকদের হাতে পরাজিত হওয়া পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাংলা বিহার এবং ওড়িশার দেওয়ানী লাভ করে ১৭৬৫ সালে। এই সময় থেকে আরম্ভ করে কিছুকাল একই সঙ্গে চলতে থাকে নবাব এবং কোম্পানীর দ্বৈতশাসন।

ইরানী ভাগ্যান্বেষী রেজা খানকে নবাবের নায়েমে নাজিম করে শাসন ব্যবস্থা চালানো হয়। তাকে দেশীয় আইন-কানুন ও প্রথা অনুযায়ী দেশ শাসন করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়।  এই ব্যবস্থাটি ১৭৬৭ সন অবধি ভালভাবেই কার্যকর ছিল। ঐ বছরেই ক্লাইভ এদেশ থেকে চূড়ান্তভাবে বিদায় নেন। ক্লাইভের সমর্থনে রেজা খান দক্ষতার সাথেই কোম্পানির রাজ্য শাসনে সক্ষম হন। তবে পৃষ্ঠপোষক ক্লাইভ-এর নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের পর রেজা খানকে ফোর্ট উইলিয়ামের উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তাদের চরম বিরোধিতা মোকাবেলা করতে হয়। ফোর্ট উইলিয়ামের এসব কর্মকর্তা রাতারাতি ধনী হবার বাসনায় রেজা খানের প্রভাব-প্রতিপত্তি হ্রাসে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠেন। তারা পর্যায়ক্রমে রেজা খানের হাত থেকে প্রশাসন নিজেদের হাতে তুলে নেন। তাদের এ হস্তক্ষেপের বিষয় প্রথম স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিভিন্ন জেলায় ইউরোপীয় তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগের মাধ্যমে। রেজা খান অভিযোগ করতে থাকেন যে এই নবনিযুক্ত কর্মকর্তারা পল্লী অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছেন। অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যের নামে কোম্পানি কর্মকর্তারা দেশের পল্লী জনপদগুলিতে লুটপাট চালাচ্ছে।

এর ফলে রাজস্বের দাবি রাতারাতি বেড়ে যায়। ১৭৬৪ সালে যেখানে ভূমি রাজস্ব ছিল মাত্র ৮১ লাখ টাকা, সেখানে পরের বছর তা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৪৮ লাখে। আর সাত বছর পরে ১৭৭৩ সালে এই রাজস্ব ধার্য হয় ৩ কোটি টাকা। এই অতিরিক্ত রাজস্বের দাবিতে বাংলার কৃষি ব্যবস্থা য় রীতিমত বিপর্যয় ঘটে। এ সময় একটি অসাধারণ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। দুর্ভিক্ষটির নাম ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। এই ছিয়াত্তর বাংলা সন ১১৭৬, ইংএরজি হিসেবে ১৭৭০ সালের প্রথম দিকে। এই দুর্ভিক্ষে চাষীদের অর্ধেকই মারা গিয়েছিল। আর মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগই প্রাণ হারান। অতিরিক্ত রাজস্বের দাবিতে জমিদাররা অত্যাচার শুরু করেন। তাতে অতিষ্ট হয়ে অধিকাংশ চাষী অন্যত্র পালিয়ে যান। বাংলার দুই-তৃতীয়াংশ ফসলি জমি লোকের অভাবে ঝোপ-জঙ্গলময় হয়ে ওঠে।

১৭৮১ সালের একটি পার্লামেন্টারি কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছিল, একমাত্র রংপুরের উর্বর জমি ছেড়ে ৩০ হাজার পরিবার কোচবিচার চলে গিয়েছিল। এভাবে চাষীরা অন্যত্র পালিয়ে যাওয়ায় এবং মারা যাওয়ায় জমিও হয়ে পড়েছিল অনাবাদি। ফলে রাজস্ব আদায়ে একটা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল।

কোম্পানির পরিচালক সভার নির্দেশের (২৮ই আগস্ট, ১৭৭১) আওতায় কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ম কাউন্সিল দেওয়ানি প্রশাসনের ক্ষেত্রে নিজেকেই সুবা বাংলার জন্য সর্বোচ্চ সরকার ঘোষণা করে। নায়েব দেওয়ান রেজা খানকে পদচ্যুত করে দুর্নীতি ও অনিয়মের দায়ে কারারুদ্ধ করা হয়।

তৃতীয় পর্ব————————————

বাকী রাখা খাজনা

মোটে ভাল কাজ না।

( –হীরক রাজার দেশ/ সত্যজিৎ রায়)

খাজনা আদারের কাছারি:

মুগল বাদশা জমির মালিক। তার কাছ থেকে কৃষক বা রায়তরা জমির সাময়িক মালিকানা নিয়ে চাষবাস করত। এর মধ্যে এই প্রজা বা রায়তদের কাছ থেকে জমির খাজনা আদায়ের জন্য মুগল বাদশা মধ্যবর্তী লোক হিসাবে জমিদার নিয়োগ দিতেন। জমিদার জমির মালিক ছিলেন না। খাজনা আদায়কারী মাত্র।  জমিদাররা খাজনা আদায়ের কাজটি ভালমতো করতে পারলে বাদশার তরফ থেকে খিলাত বা উপাধী জুটত। এই খিলাত দিয়ে ক্ষুদে জমিদারী থেকে বড়ো জমিদারি পেতে সুবিধা হত। চোর থেকে ডাকাত হতে কাজে লাগত। তবে কিভাবে—কোন প্রক্রিয়ায় সেই খাজনা আদায় করা হত—সেটা নির্মম কী ভয়ঙ্কর ছিল, তা বিবেচনা করার কোনো দরকার ছিল না বাদশার। এই তনখা পাওয়াটাই ছিল শাহীর জন্য আল্লার নেয়ামত।

তাহলে খাজনা—দেখি তোমার সাজনা:

জমিদাররা তিন ধরনের খাজনা আদায় করে বাদশার খালসা বা কোষাগারে জমা দিত।

এক. খাজনা মানে মাল :

আবাদি ফসলী জমি ও অফসলী জমি যেমন, ফলজ-বনজ গাছপালা, বনজঙ্গল, জলাভূমি ও পুকুর থেকে যে খাজনা আদায় করা হত, তার নাম ছিল মাল। (এখান থেকেই টাকা পয়সাকে মাল বলা হয়। বলা হয়—মাল-কড়ি কেমন কামাচ্ছেন ভাই?)

দুই. সেইর খাজনা :

নদীপথে যেসব নৌযান চলাচল করত, যেসব  হাঁট-বাজার বসত গ্রামে গঞ্জে তাদের কাছ থেকে সেইর খাজনাটি আদায় করা হত। এছাড়া যারা বিভিন্ন ধরনের কাজকারবার করত—সেইসব পেশাজীবী বা কর্মজীবীদের কাছ থেকে আদায় করা হত বেশ মোটা অঙ্কের খাজনা। এটার নামও ছিল সেইর খাজনা।

তিন. বাজে জমা খাজনা :

বিভিন্ন ধরনের জরিমানা, প্রতারণা ও বিয়েশাদি থেকে এই ধরনের জরিমানা আদায় করা হত।

খাজনা কি করে ধার্য হত:

এই খাজনা আদায়ের জন্য জমিজিরেতের  সঠিক জরিপ ছিল না। একটি সংক্ষিপ্ত হিসাব থেকে খাজনা ধার্য করা হত। একে বলা হত আসনাসাক। জমিদারের কাজ ছিল  বাদশাহী থেকে  ধার্যকৃতএই খাজনা আদায় করে দেওয়া।

ধার্যকৃত খাজনার টাকা বিভাজন করে জমিদাররা  প্রজাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতেন। তবে মুগল আমলে জমিদাররা প্রজারাদের বেশি খেপিয়ে তুলত না। বেশী ঝামেলা সৃষ্টি হলেই বাদশা জমিদার পাল্টে দিতেন। ফলে জমিদারী টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই প্রজাদের অনুগত রাখার দরকার হত।  জমিদাররা প্রজাদের খুশি রাখতে তাদের কিছু দাবীদাওয়া মেনে নিতেন। তাদের দেখভালের কিছু কাজ করতেন।

সকলপ্রকার জমিদারদের পুলিশ, বিচার ও সৈন্যসামন্তর দায়দায়িত্বও বহন করতে হত। জমিদারদের খাজনা আদায়ের জন্য পাইক বরকন্দাজ থাকত। এরা খাজনা আদায়ের কাজে সহযোগিতা করত। আবার স্থানীয় চুরি ডাকাতি দস্যুদের উৎপাত থামানোর কাজ করত। বড় জমিদারদের আওতায় থানা ছিল। সেখানে নিয়মিত পুলিশ থাকত। থানা অধিনে একাধিক চৌকি বা পাহারাস্থল ছিল। এদের কর্মীদের নাম ছিল চৌকিদার। থানার প্রধান ছিল ফৌজদার। ফৌজদাররা বাদশার লোক হলেও তারা জমিদারদের অধিনেই কাজ করত। এসবই ছিল খাজনা আদায়ের নানাবাহিনী।

মুগলদের নিয়মিত সেনাবাহিনী ছিল না। যুদ্ধের জন্য, বিদ্রোহদমনের সময়, বা পররাজ্য দখলের কাজে বাদশাহীতে সৈন্যসামন্ত, ঘোড়া-হাতি এগুলোর যোগান দিতে হত জমিদারদের। এই উপলক্ষ‍্যে প্রজাদের ঘাড়ে বাড়তি কিছু খাজনা চাপিয়ে দেওয়া হত।

জমিদাররা ছোটোখাটো বিচারআচারও করতেন। তাদের ছিল জমিদারী আদালত। এই আদালতে যেসব বিচার সম্ভব হত না—তা পাঠিয়ে দেওয়া হত থানাদার বা কাজির কাছে। সাধারণত রায়ত বা প্রজাদের পক্ষে রায় যাওয়াটা ছিল দৈবদুর্ঘটনা। বাদশার স্বার্থ-জমিদারের স্বার্থরক্ষা করে যেটুকু বিচার করা সম্ভব—সেখানে তা-ই করা হত।

সে সময়ের লোকছড়ায় এই খাজনার ভয়াবহতা ধরা পড়েছে–

খোকা ঘুমোলো পাড়া জুড়ালো বর্গি এলো দেশে

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেবো কিসে

ধান ফুরালো পান ফুরালো খাজনার উপায় কি?

আর কটা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমল : পাঁচশালা বন্দোবস্ত

সে সময়ে কোম্পানী বেশ খারাপ অবস্থায় পড়ে যায়। তাদের আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এই সমস্যা মোকাবেলায় কোম্পানী তরফ থেকে ১৭৭২ সালে নিলামের মাধ্যমে জমিদারিগুলো পাঁচবছরের মেয়াদে ইজারা দেওয়া হয়। এই পাঁচসালা বন্দোবস্ত স্থির করার দায়িত্ব দেওয়া হয় গভর্নর ও কাউন্সিলের চার সদস্যের নেতৃত্বে এক সার্কিট কমিটিকে। এই কমিটির আরও দায়িত্ব ছিল ইজারাদারদের কাছ (চাষীদের) থেকে রাজস্ব আদায় করা। দেশীয় জেলা কর্মকর্তা তথা ফৌজদার, কানুনগো আর আমলাদের জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হলো ব্রিটিশ কালেক্টর বা রাজস্ব আদায়কর্তা। কানুনগোদের কাছে প্রজাদের জমিজিরতের—খাজনাপাতির হিসেবপত্র-দলিলদস্তাবেজ থাকত। তাদের বাতিল করার ফলে নতুন করে যে যে কোনো হারে খাজনা বসাতে কোনো অসুবিধে থাকল না।

ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের দ্বারা রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়। এরা 'জেলা কালেক্টর' হিসেবে অভিহিত হন। জেলা কালেক্টর জমিদারদের কাজনা আদায়েরকাজ তত্ত্বাবধান করত। কমিটি অব সার্কিট বন্দোবস্তের কাজ ১৭৭২ সালের মধ্যে শেষ করে।

নতুন ইজারাদার বা জমিদাররা চড়া হারে খাজনা আদায় করতে মনোযোগী হয়।  যারা চড়া দামে নিলামে এইসব ইজারা নিয়েছিলেন, তারা যে-পরিমাণ রাজস্ব আদায় করবেন বলে আশা করেছিলেন, অনেক ক্ষেত্রেই তা করতে পারেননি। ইজারাদাররা কোম্পানীকে নির্দিষ্ট অঙ্কের খাজনা আদায় করে দিতে পারেনি। তাদের জমিদারি নিলামে দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত স্থাবর অস্থাবর সকল সহায় সম্পত্তিও কেড়ে নেয়। এরপরও এই পুরনো জমিদারদের কয়েদখানায় ঢোকানো হয়। নির্মমভাবে অত্যাচার করা হয়।

পুরনো জমিদারদের কাছ থেকে নিলামে জমি কিনে নতুন জমিদার হয়ে বসে নবাবের চাকুরেরা, ব্যবসায়ীরা, সুদখোর মহাজনেরা– জমিদারদের দুর্নীতিবাজ নায়েব ধরনের আমলারা। ফলে তারা খাজনা আদায়ের বেলায় পুরনো জমিদারদের রেকর্ড ভেঙে ফেলে। প্রজাদের দুর্দশা আরও বেড়ে যায়। লোকজন জায়গা জমি পালাতে থাকে। সে সময়ে লোকসংখ্যার তুলনায় অনাবাদি জমির পরিমাণ বেড়ে বেড়ে যায়। বকেয়া খাজনার পরিমাণ বেড়ে যায়। আর তারাও কোম্পানীকে লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে রাজস্ব দিতে না পারলে তাদের ভাগ্যেও পুরনো জমিদারদের মতো সব হারিয়ে কয়েদখানায় যেতে হত।

এই সমস্যা নিরসনকল্প কোম্পানী দশশালা বন্দোবস্ত করে।

দশশালা বন্দোবস্ত

জমি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারভিত্তিক জমিদারদের একটা সামাজিক স্বার্থ জড়িত ছিল যা অস্থায়ী ইজারাদারদের বেলায় ছিল না। তাই ধরে নেওয়া হয় যে, জমিদারদের তাদের পুরানো মর্যাদা ফিরিয়ে দিলে ও তালুকের সম্পদ অনুযায়ী রাজস্ব ধার্য করা হলে একদিকে যেমন রাজস্ব আদায় সহজতর হবে অপরদিকে তা কৃষককুলকেও ইজারাদারের অত্যাচার থেকে রেহাই দেবে। কিন্তু পাঁচসালা বন্দোবস্তের শর্তাবলীর কারণে এক্ষেত্রে সরকারের হাত বাঁধা ছিল। ১৭৮৯-১৭৯০ সালে লর্ড কর্নওয়ালিন জমিদারদের সঙ্গে দশশালা বন্দোবস্ত করেন। এর ফলে জমিদার ও তালুকদাররাই  জমির প্রকৃত মালিক বলে বিবেচিত হন। তারা সরকারের কোনো অনুমতি ছাড়াই তাঁদের জমি দান বা বিক্রি করতে সক্ষম বা বন্ধক দিতে পারবেন। এমন কি উত্তরাধিকারদের মধ্যে বণ্টন করতে পারবেন। আর কোম্পানীকে ধার্যকৃত রাজস্ব দিতে না পারলে তাদের জমিদাইর নিলামে দেওয়া হত। কিন্তু পাঁচশালা বন্দোবস্তের মত তাদেরকে কয়েদ করা হত না।

রাজস্ব শাসনের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে গোটা দেশকে অনেকগুলি জেলায় বিভক্ত করা হয়। জেলা কালেক্টরকে জেলার সর্বেসর্বা প্রশাসকে পরিণত করা হয়। কালেক্টরকে সকল নির্বাহী ও বিচারবিভাগীয় ক্ষমতা প্রদান করা হয়। কেন্দ্রায়ন ও হস্তক্ষেপের প্রতীক রাজস্ব কমিটিকে বিলুপ্ত করে স্থাপন করা হয় রাজস্ব বোর্ড, যার দায়িত্ব হলো রাজস্ব-সংক্রান্ত বিষয়াবলির সাধারণ বা সার্বিক নিয়ন্ত্রণ। জমিদারগণকে তাদের জমির ন্যায্য রাজস্ব নির্ধারণের জন্য এই কালেক্টরের মুখাপেক্ষী হতে হয়। রাজস্ব বোর্ডও রাষ্ট্রের রাজস্বের জন্য কালেক্টরের ওপর নির্ভরশীল হয়। ১৭৮৬ সনের সংস্কার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রকৃত প্রশাসনিক বুনিয়াদ রচনা করে। সরকার তখন থেকে আগেকার যেকোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস ও দৃঢতার সঙ্গে জমিদারদের সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্য প্রস্তুত হয়।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

দশশালা বন্দোবস্তের সাফল্যের কারণে ১৭৯৩ সালে একে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হিসাবে ঘোষণা করা হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কোম্পানীকে ধার্যকৃত রাজস্ব প্রদানের পরেও বেশ মোটা অঙ্কের অর্থ জমিদারদের হাতে রয়ে যেত। তারা প্রজাদের দফায় দফায় খাজনা বাড়িয়ে দিত। তারা পরিত্যাক্ত সম্পত্তি, অনাবাদি জমি নতুন করে বন্দোবস্ত দিত প্রজাদের কাছে। নতুন খাজনা ধার্য করত। এভাবে তাদের আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়। এটা কোম্পানী এবং জমিদারদের জন্য একটি সুবিধাজনক বন্দোবস্তে পরিণত হয়। আর প্রজারা নতুন শোষণের জাতাকলে পড়ে।

কেন এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

এ সময় কোম্পানীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তাদের দরকার ছিল বিপুল অর্থ। তারা চেয়েছিল ভারতে তাদের ব্যবসাবানিজ্য বিনা মুলধনেই করবে। তারা প্রজাদের কাছ থেকে অর্থ লুটপাট করে সেই অর্থ দিয়েই ভারতে ব্যবসাবানিজ্য চালাবে। সোজা কথায় বিনা পূঁজিতে মুনাফা কামানোর ধান্ধা। কিন্তু  তাদের নিয়োগকৃত নাইবে নাজিম রেজাখানের দু:শাসন, দুর্ভিক্ষ, কোম্পানী লোকজনের উশঙ্খল আচরণ কোম্পানীর শেয়ার হোল্ডারদের কিছুটা হতাশ করেছিল। যত তাড়াতাড়ি পারা যায় বিপুল অর্থ কামাইয়ের ইচ্ছে ছিল তাদের। দুর্ভিক্ষের কারণে বাংলায় তখন এত জনসংখ্যা ছিল না। এই অল্প মানুষকে সহজে সুলভে শোষণ করে খাজনা আদায়ে জন্যই কোম্পানী জমিদারী প্রথায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করেছিল।

ইংরেজরা কুটির শিল্প, হস্ত শিল্পকে শেষ করে দিয়েছিল। তখন কেবল আয় বলতে জমির খাজনাই ছিল প্রধান। জমিদার পাল্টাতো কিন্তু শোষিত প্রজারা পাল্টাতো না। বাবার বকেয়া খাজনা ছেলের কাঁধে বর্তাতো। ছেলের বকেয়া তার ছেলের কাধেঁ পড়ত। এভাবে বংশপরম্পরায় বকেয়া খাজনা প্রদানের দায় বহন করে যেত।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মানে চিরস্থায়ী প্রজাশোষণ–

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হওয়ার ফলে প্রজাদের অবস্থা আরও কাহিল হয়ে গেল। যো লোকটি জমি চাষ করছে, এতকাল জেনে এসেছে জমিটি তার—তার ইচ্ছেমত ফসল চাষ করছে, ছেলেপেলেদের জমি হস্তান্তর করতে পারছে, প্রয়োজনে বিক্রি করতে পারছে, জমি বন্দক দিয়ে ঋণ নিতে পারছে—এসবই এক খোঁচায় বন্ধ হয়ে গেল চিরস্থাযী বন্দোবস্তের কারণে। সবকিছু্রই মালিক হয়ে গেল জমিদার। জমিদার খাজনা আদায় ছাড়া আর কোনো বিনিয়োগই করছে না ফসলী জমিতে—না শ্রম, না পূঁজি—বিনা মূলধনেই কৃষককের ফসলের সিংহভাগই তারা নিয়ে যাচ্ছে। চাষী কোনো গাছপালা লাগাতে পারে না। কোনো  গাছপালা কাটারও ক্ষমতা তার নেই। যেখানে সে থাকে, সেখানে যেনতেন প্রকারে ঘর বেঁধে থাকবে—কোনো পাকা ঘর তুলতে চাষীরা পারবে না। জমাজুতোও পরতে পারবে না। মেয়ের বিয়েতে খাজনা দিতে হবে। বাপমা মারা গেলে তার শ্রাদ্ধশান্তিতে খাজনা ছাড়া করা যাবে না। চাষীর ছেলে হলেও জমিদারকে খাজনা দাও। এমনকি কোনো ঊৎসব-পার্বনও খাজনা ছাড়া প্রজারা করতে পারবে না।  রায়ত বা প্রজারা এক ধরনের শেকলেবন্দী শ্রমিক জীবনের অধিকারী হল পাঁচশালা বন্দোবস্তের মাধ্যমে।

এই শেকল আরও শক্ত হয়ে যেত মহাজনদের ফাঁদে পড়লে। সাধারণত দেশে তখন বন্যা-খরা-দুর্ভিক্ষ-মহামারী লেগেই থাকত। আর এই মেয়ের বিয়ে, বাপের শ্রাদ্ধ আর ছেলের জন্মের কারণে খাজনা দেওয়ার উপায় থাকত না। ফলে চাষীরা মহাজনদের কাছ থেকে চক্রবৃদ্ধি হার সুদে ঋণ নিতে হত। এই ঋণ কখনো ফেরত দেওয়া কখনো ফুরাতো না। বাপের ঋণ শুধতে হত ছেলেকে। ছেলের ঋণ নাতিকে। এইভাবে মহাজানের ঋণের শেকড় বংশপরম্পরায় বহন করতে হত। আবার চাষী যদি অক্ষরজ্ঞানহীন মুর্খ কিসিমের হত, তাহলে কায়দা করে একই ঋণের টাকা পয়সা দুই-তিনবারও আদায় করা হত।

এই মহাজনদের বড় বড় ব্যবসাপাতিও ছিল। তারা ফসল ওঠার সময়ে জমি থেকেই তাদের ঋণের টাকা আদায় করত। সেই সময়ে ফসলের বাজার মূল্য কম থাকত। ফলে মহাজনরা কম টাকায় বেশি ফসল পেয়ে যেত। চাষীরা আরও বেশি ঠকত। কখনো এই সুদের কারবারীরা হত বড় কৃষক। তাদের বলা হত জোতদার। তারা সব সময়ই হা করে থাকত ক্ষুদে কৃষকের জমিজিরতের গিলে খাওয়ার জন্য।

জমিদাররা খালসা বা রাজ কোষাগারে আদায়কৃত খাজনার ধার্যকৃত অংশ জমা দেওয়ার পরেও তাদের হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পদ থেকে যেত। এই অর্থ সম্পদ দিয়ে তারা  এক ধরনের আয়েসী জীবন যাপন শুরু করে। তারা তাদের জমিদারিকে ছোটো ছোটো অংশ ভাগ করে  পত্তনিদার বা তালুকদারদের কাছে ইজারা দিতেন। এই পত্তনীদাররা বা তালুকদাররা আসলে জমিদারের আমলা। জমিদাররা তাদের উপর জমিদারির ভার দিয়ে কোলকাতায় বসবাস করত। তালুকদাররা তখন প্রজাদের লুটে পুটে খেত। আদায় করত ইচ্ছেমত খাজনা। দখল করত সহায় সম্পত্তি। প্রজারা এর প্রতিকার কারও কাছে পেত না। আসল জমিদারের কাছে প্রজারা পৌঁছুতেই পারত না। আর যদি কেউ আদালতে যেত—তাহলে সেখানে উকিল নামের কুমীরের খপ্পরে পড়ত। এই জমিদারীকাল ছিল প্রজাদের জন্য দোজখ।

চতুর্থ পর্ব——————————————–
প্যাগোডা ট্রি ওরফে টাকার গাছের কাহিনী

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে ইংলণ্ড থেকে যে সব ইংরেজরা ভারতে আসত তাদের অধিকাংশই ছিল দরিদ্র, ছিচকে, গুণ্ডা, মারকুটে ছিন্নমূল, আশিক্ষিত, অভদ্র। এদের অনেকের বাপদাদার ঠিক ঠিকানা ছিল না। এরা কলকাতায় এলে কিছুদিন ঘুরে বেড়াত ফ্যা ফ্যা করে। তারপর জুটে যেত কোম্পানীর চাকরী। বেতন বার্ষিক  মাত্র পাঁচ পাউন্ড। সবশেষে বার্ষিক চল্লিশ পাউন্ড।  এই বেতনে মেসের ভাড়াই হত না। এরা কোনোক্রমে সই করতে জানত, অথবা সামান্য লেখাপড়া—কিছু সহজ সরল অংক জানত। এরা লক্ষ লক্ষ পাউন্ডের মালিক হয়েছে  কয়েক বছরের মধ্যেই। এই ধনলাভের কাহিনী বাংলার মানুষকে লুটপাটেরই ইতিহাস। তারা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছিল। কলাগাছ থেকে বটগাছ। তারপর পুরো বন।  ১৭৫৭ সালে সিরাজউদ্দৌলার পতনের পরে বাংলাকে ইংরেজ বেনিয়ারা প্যাগোডা ট্রি বা টাকার গাছে পরিণত করেছিল।

এই ইংরেজরা বাংলাকে শোষণ করে ছিবড়ে করে ফেলে হয়েছিল নবাব। নবাব মানে খুব ধনশালী ব্যক্তি। এরা ভারতে প্রভুত অর্থ সংগ্রহ করে ইংলন্ডে ফরে যায়। বিত্তশালী জীবন যাপন করে।

সিরাজউদ্দৌলার পতনের পরে মীর জাফরের কাছ থেকে পুরস্কার পেয়েছিল বিপুল অঙ্কের টাকা পয়সা এইসব ভাগ্যবান ইংরেজরা। লর্ড ক্লাইভ ট্রেজারি লুট করেছিলেন। তিনি সেখান থেকে নিয়েছিলেন দেড় মিলিয়ন স্টারলিং মূল্যের নগদ টাকা, সোনা, রূপা, গহনাপাতি, এবং বহু মুল্যবান জিনিসপত্রাদি। মীর জাফরকে নবাব করা হলে তিনি ক্লাইভকে যা খুশি সম্পদ নেওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। ক্লাইভ নিয়েছিলেন এক লক্ষ ষাট হাজার পাউন্ড। তিনি অর্ধ মিলিয়ন বিলিয়েছিলেন তার অধীনস্ত সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর মধ্যে। এরা কোম্পানীর বাহিনী।  আর যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানীর লোকদের প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছিল ২৪০০০ পাউন্ড।

মীর জাফর কর্তৃক পুরস্কারপ্রাপ্ত ভাগ্যবানদের তালিকা—

গভর্নর ড্রেক—৩১,৫০০ পাউন্ড, লর্ড ক্লাইভ—২,১১, ৫০০ পাউন্ড, মিঃ ওয়াটসন—১,১৭,০০০ পাউন্ড, কিল প্যাট্রিক—৬০,৭৫০ পাউন্ড, মিঃ ম্যানিংহাম—২৭,০০০ পাউন্ড, মিঃ বিচার—২৭,০০০ পাউন্ড, মিঃ বোডম—১১,৩৬৭ পাউন্ড, মিঃ ফ্রাঙ্কল্যান্ড—১১,৩৬৭ পাউন্ড, মিঃ ম্যাকেট—১১,৩৬৭ পাউন্ড, মিঃ আ্যামিয়েট—১১,৩৬৬ পাউন্ড, মিঃ পার্কেস—১১,৩৬৬ পাউন্ড, মিঃ ওয়ালশ—৫৬,২৫০ পাউন্ড, মিঃ স্ক্রাপটন—২২,৫০০ পাউন্ড, মিঃ ল্যাসংটন—৫৬২৫ পাউন্ড, মেজর গ্রান্ট—১১২৫০ পাউন্ড।

ইংরেজের বিজয় উপলক্ষ্যে কিছু বাঙালিবাবুও পুরস্কৃত হয়েছিলেন। একে পুরস্কার না বলে ক্ষতিপূরণ নাম দেওয়া হয়েছিলেন। দ্বারকানাথ ঠাকুরের পিতামহ নীলমণি ঠাকুর পেয়েছিলেন মীরজাফরের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ হিসাবে—১৩,০০০ টাকা। সেই টাকা দিয়ে কোলকাতা গ্রামের পাথুরিয়াঘাটা পাড়ার জমি কিনে ভিটে তোলেন। সেখানে পরবর্তি সময়ে একঘর পাথুরিঘাটের জমিদারদের পত্তন হয়।

মীর জাফরকে সরিয়ে মীরকাশেমকে ১৭৬০ সালে পুতুল নবাব হিসেবে কোম্পানী বাংলার গদিতে বসায়। সে উপলক্ষ্যেও বিস্তর পুরস্কার জুটেছিল এই পরদেশী লুটেরাদের। পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা—গভর্নর ভ্যানসিটার্ট—৫৮,৩৩৩ পাউন্ড, মিঃ হলওয়েল—৩০,৯৩৭ পাউন্ড, মিঃ সুমনার—২৮০০০ পাউন্ড, জেনারেল কাইলাইড—২২ম৯২৬ পাউন্ড, মিঃ ম্যাকগুইরি—২২,৯১৬ পাউন্ড, মিঃ স্মিথ—১৫, ৩৫৪ পাউন্ড, মিঃ ইয়র্ক—১৫, ৩৫৪ পাউন্ড।

১৯৬৪-৬৫ সালে মীরকাশেমকে সরিয়ে নরমপন্থী নিজামউদ্দৌলাকে গদিতে বসানে হলে আবারও পুরস্কার পায় মেজর মনরো—১৩০০০ পাউন্ড, তার অধীনস্ত সাহবরা পেল আরও ৩০০০ পাউন্ড করে পুরস্কার। আরও অনেকে পেয়েছে। দাগি মুদ্রারাক্ষস লর্ড ক্লাইভ পেয়েছিলেন—৫৮,৬৬৬ পাউন্ড।

মুর্শিদাবাদের নবাবদের কাছ থেকে এই পুরস্কার আদায়ের টাকাটা আসমান থেকে আসেনি। এই টাকাটা বাংলার  প্রজাদেরই টাকা। অভাবী ভুখা নাঙ্গা প্রজাদের কাছ থেকেই আদায় করা হয়েছিল।  তাদের রক্ত শোষণ করে অর্জন করেছিল জমিদার, তালুকদার, গাত্তিদাররা। তারা জমা দিয়েছিলেন রাজকোষে। সেখান থেকে ইংরেজরা নিয়েছে।

Prosperous Britis India নামে একটি বই লিখেছিলেন মিঃ ডিগবি। তিনি লিখেছেন—পলাশী এবং ওয়ার্টারলুর যুদ্ধের মধ্যবর্তি সময়ে ভারত থেকে ইংলন্ডে অন্তত ১০ কেটি পাউন্ড নগদ অর্থ চলে গিয়েছিল।  The Law of Civilization and Decay নামে আরেকটি বই লিখেছেন ব্রুকস এডামস। তিনি বলেছেন— শিল্পবিপ্লব কার্যত শুরু হয় ১৭৬০ সালে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও সোনা-রূপা  ইংলন্ডে পৌঁছানোর পরে।

আর সে সময়ে বাংলায় দুর্ভিক্ষে মানুষ গরু-জরু বেঁচে দিচ্ছে। গাছের পাতা-ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। না খেতে পেয়ে তিনভাগের এক ভাগ মানুষ মারা যাচ্ছে। তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ খাজনা দেওয়ার ভয়ে পালিয়ে বনে জঙ্গলে পালিয়ে বাঘের পেটে যাচ্ছে। বাকীদের পিঠের চামড়া তুলে খাজনা আদায় করে এইসব ইংরেজ লুটেরাদের পকেটে ভরে দেওয়া হচ্ছে।

১৭৮২ সালে ইংলন্ডে পৌঁছে মেজর জন স্কট ওয়ারেন হেস্টংইসকে একটি চিঠিতে লিখছেন—আমাদের ব্যবসার হয়তো মন্দা দেখা দিয়েছে, কিন্তু আজকের মতো এমন বিপুল বৈভব বোধহয় এই রাজ্যে কখনো ছিল না। আমি ২০০ সোনার মোহর গলাতে দিয়েছিলাম একজনকে, তিনি জানালেন গত বারো বছর তিনি অন্তত দেড় টন সোনার মোহর এবং প্যাগোডা গলিয়ে 'বার' তেরি করে দিয়েছেন। তার মানে প্রতি বছর গড়ে ইংলন্ডে  মজুত হয়েছে ১৫০ হাজার পাউন্ড।

কেউ কেউ আবার সে সময় বাংলা থেকে ইংলন্ডে হীরেও নিয়ে যেত। হীরের আমদানি এত বেড়ে গিয়েছিল যে তখন ইউরোপের বাজারে হীরার দাম পড়ে গিয়েছিল। ওয়ারেন হেস্টিংসপত্নী কোনো পার্টিতে তিরিশ হাজার পাউন্ডের গহনা পরে যেতেন। এই টাকা বাংলার মানুষের টাকা।

১৭৬৯ সালে বাংলাকে কয়েকটি জেলায় ভাগ করা হয়। প্রত্যেক জেলায় একজন করে সুপারভাইজার নিয়োগ করা হয়। এই পদটিই ১৭৭২ সালে কালেক্টারে রূপান্তরিত করা হয়। এই জেলার কালেক্টারদের প্রধান কাজই ছিল দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হওয়া। কেউ কেউ এরা সুদের ব্যবসা করতেন। কেই কেউ দুনম্বরী ব্যবসাবানিজ্য। জন বাথো নামে বর্ধমানের এক কালেক্টার দেশী একজন জমিদারকে লবণের ব্যবসা পাইয়ে দেন বার্ষিক আটাশ হাজার পাউন্ড ঘুষের বিনিময়ে। শ্রীহট্টের কালেক্টার কোম্পানীর কাছে হাতির ব্যবসা করে অনেক টাকা রোজগার করেছেন।

ক্লাইভ আঠার বছর বয়সে ভারতে এসেছিলেন। তিনি চাকরী পেয়েছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে একজন রাইটার বা কেরানী হিসেবে। পরে প্রতিভাবলে  কোম্পানীর উচ্চপদে চলে যান। হয়েছিলেন গভর্নর জেনারেল। সিরাজউদ্দৌলাকে হারানোর পরে ১৭৬০ সালে ক্লাইভ যখন ইংলন্ডে ফিরে যান তখন সঙ্গে নিয়েছিলেন তিন লক্ষ পাউন্ড। ভারত থেকে তার জমি সম্পত্তির আয় থেকে বার্ষিক আয় ছিল ২৭০০০ পাউন্ড। সে সময়ে তার বার্ষিক আয় ছিল ৪০০০০ পাউন্ড।

এই ইংরেজরা তখন হয়েছিলেন নবাব। এইরকম একজন নবাবের নাম হল—মিঃ হিকি। উইলিয়াম ম্যাকিনটস হিকির দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে লিখেছেন– সকাল সাতটা নাগাদ দারোয়ান নবাববাহাদুরের গেট খুলে দিল। নিমেষে বারান্দাটি সলিসিটার, রাইটার, সরকার, পিওন, হরকরা, চোপদার, হুক-বরদার ইত্যাদিতে ভরে গেল। বেলা আটটায় হেড বেয়ারা এবং জমাদার প্রভুর শোয়ার ঘরে প্রবেশ করবে। একটি মহিলাকে তখন শয্যাত্যাগ করে একান্তে প্রাইভেট সিঁড়ি ধরে উপরে উঠতে দেখা যাবে,–অথবা বাড়ির অঙ্গন পরিত্যাগ। নবাব বাহাদুর খাট থেকে মাটিতে পা রাখামাত্র অপেক্ষমান ভৃত্যবহর তৎক্ষণাৎ ঘরে ঢুকে পড়বে। তারা আনত মাথায় পিঠ বাঁকিয়ে প্রত্যেকে তিনবার তাঁকে সেলাম জানাবে। ওদের হাতের একদিক তখন কপাল স্পর্শ করবে, উল্টো দিকটা থাকবে মেঝেতে। তিনি মাথা নেড়ে  অথবা দৃষ্টিদানে তাদের উপস্থিতিকে স্বীকৃতি জানাবেন।

পারসিভাল স্পিয়ার একটি বই লিখেছেন—The Nababs নামে। বইটিতে কয়েকজন মৃত  লুটেরা নবাব সাহেবের রেখে যাওয়া অস্থাবর সম্পত্তির বিববরণ আছে।  তার মধ্যে নিকোলাসের ঘরে পাওয়া যায় রাশি রাশি দামি আসবাব। বেশ কিছু ঘড়ি, আয়না, লণ্ঠন, রকমারি পালকি, বিপুল সংখ্যক বাসনপত্র, চা, কফি, পান, তামাকের বিবিধ সরঞ্জাম, বিভিন্ন মদের বোতল এবং আরও অনেক কিছু। তার মালসামানের জন্য ছিল পাঁচটি গুদাম। বারওয়েল নামের একজন নবাবের খাওয়ার সময় উপস্থিত থাকত প্রাতঃরাসের সময় তিরিশজন, মধ্যাহ্ণভোজের সময় পঞ্চাশজন এবং রাত্রির খাওয়ার সময়ে অগণিত। খেয়ে দেয়ে মধ্যরাত্র অবধি নাচের আসর হত। ভোর পর্যন্ত মদ্যপান।

হিকি নামে একজন নবাব ১৭৯৬ সালে গভর্নরের বাড়ির পাশেই পার্কের গা ঘেষে নদী পড়ে একটি প্রাসাদতুল্য বাংলো তৈরি করেছিলেন মাত্র ছয়মাসের মধ্যে। তার আর্কিটেক্ট আর মিস্ত্রিরা ছিল পশ্চিমি। কলকাতার চূঁচুড়ার এই বাংলোটি তিনি উপহার দিয়েছিলেন তার রক্ষিতা এক জমাদারনিকে। তার খরচ পড়েছিল চল্লিশ হাজার টাকা। হিকির বউ শার্লট যখন মারা গেল তখন হিকির জন্য কাজ করত তেষট্টিজন ভৃত্য।

এরকম রাশি রাশি নবাব তখন কোলকাতায় ছিলেন। তারা বাংলাকে লুটপাট করেছেন। এদের লুটপাটের অর্থের অন্যতম যোগানদাতা ছিলেন স্থানীয় বাবুশ্রেণী, জমিদার।

এই নবাবদের ইংলন্ডের সমাজে ভাল চোখে দেখ হত না।  তাদের মন্তব্য হল– এরা সবাই হয় দারোয়ান-তনয় অথবা দাসীপুত্র। হৃদয়হীন এই পাষণ্ডের দল প্রত্যেকই হাজার হাজার নেটিভের হত্যাকারী। হিন্দুস্থানে তাঁদের কেউ একশো নিরীহ মানুষ খুন করে এসেছেন—কেউ বা পঞ্চাশ হাজার। এদের দিকে তাকানোও পাপ।

তারা বাংলা থেকে লুটপাট করা অর্থ দিয়ে ইংলণ্ডে কাটিয়েছেন বিলাসবহুল জীবন। টাকা পয়সা দিয়ে ১৭৬০ থেকে ১৭৮৪ সালে এরকম ৩০জন নবাব পার্লামেন্টের আসন অলঙ্কৃত করেছেন। এদের সম্পর্কে একজন লিখেছেন—লজ্জার কথা সেদিন জনৈক নবাব এক ভদ্রসম্মেলনে হাজির হয়েছিলেন। তিনি সঙ্গে নিয়েছিলেন একজন রূপোজীবিনীকে। অন্য একজন লিখেছেন—সাবধান, কোনও ভদ্রমহিলা যেন ভুলেও কখনও কোনও নবাবের সঙ্গে না নাচেন। তাদের নবাব তখন দাস-ব্যবসায়ী. ওয়েস্ট ইন্ডিজের খামার মালিকের চেয়েও ঘৃণ্য এক অসামাজিক জীব। তারা ভালো বাড়ি কেনে, ভালো খায়, যত খায় তার চেয়ে বেশি অপচয় করে, ছড়ায়। তারা ডুয়েল লড়ে, জুয়া খেলে,–মাত্রাহীন বিলাসে গা এলিয়ে দিয়ে ভদ্রসমাজকে ব্যঙ্গ করে। *

লেখাসূত্র : ১. রবি ঠাকুর, রাহাজানি এবং রবীন্দ্র পূজারীবৃন্দ: ফরিদ আহমদ ও অভিজিৎ রায় : http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=18247

গ্রন্থসূত্র :

১. ঐতিহাসিক অনৈতিহাসিক : শ্রীপান্থ

২. হাজার বছরের বাঙ্গালী : গোলাম মুরশিদ

৩. ভারত-সন্ধানে : জহরলাল নেহেরু

৪. The Nabobs : Percival Spear

৫. The Annals of Rural Bengal : W W Hunter

পঞ্চম পর্ব———————————————————

একটু ইংরেজদের গেড়ে বসার আদিকাণ্ড–

সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে মুগল সম্রাটের কাছ থেকে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী বানিজ্যের উদ্দেশ্যে সুরাটে একটি কুঠি স্থাপনের অনুমতি লাভ করে। কয়েক বছর পরে তারা দক্ষিণ ভারতে একখণ্ড জমি কিনে মাদ্রাজ শহর পত্তন করে। ১৬৬২ সালে ইংলন্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস পোর্তুগালের কাছ থেকে বোম্বাই দ্বীপটি বিয়ের যৌতুক হিসেবে লাভ করেন। তিনি কোম্পানীর কাছে এই দ্বীপটি হস্তান্তরিত করেন। ১৬৯০ সালে কোলকাতা শহর জোব চার্নক নামে এক ইংরেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এইভাবে সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে ভারতের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ইংরেজ তারা আস্তানা গাড়ে। সমুদ্রের উপকূলে কয়েকটি ঘাঁটি বসায়। ক্রমে ক্রমে তারা দেশের প্রত্যন্ত প্রদেশে প্রবেশ করতে আরম্ভ করে। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের পরে বিস্তির্ণ ভূখণ্ড ইংরেজদের দখলে আসে। কয়েক বছরের মধ্যে তারা বাংলা, বিহার ও উড়িশ্যা দখল করে বসে। এবং সমগ্র পূর্ব-উপকূলে সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে।

এর চল্লিশ বছর পর, উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে তারা একবারে দিল্লীর তোরণদ্বারে হানা দেয়। ১৮১৮ সালে মারাঠাদের পরাজিত করে। ১৮৪৯ সালে শিখ-যুদ্ধের পর ইংরেজ সারা ভারতবর্ষে কায়েম হয়ে বসে।

মধ্যবিত্তের উত্থান

ইংরেজ শাসনে জমিদারদের প্রজাশোষণে লোকজন অনাহারে অত্যাচারে মারা গিয়েছে। অনেকে সব ছেড়ে ছুড়ে অন্য জমিদারের পরগণায় আশ্রয় নিয়েছে। আর যারা বনেজঙ্গলে পালিয়েছে তারা বাঘের আর কুমিরের পেটে গিয়েছে। অনেক নতুন নতুন জমিদার পুরনো জমিদারদের কাছ থেকে জমিদারী কিনে নতুন খাজনার হার ধার্য করেছে। এর মধ্যে অনেক প্রজা কখনো কখনো রুখেও দাড়িয়েছে।  ১৮৭৩ সালে পাবনাতে নাটরের জমিদারি ভেঙে  পাঁচজন ধনী লোক জমিদার কিনে যখন খাজনা বাড়াতে চেয়েছিল তখন প্রজাদের সঙ্গে জমিদারদের বড় ধরনের রায়ট হয়েছিল।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ২০ বছরের  মধ্যে রাজস্ব দিতে না পারার জন্য তিন ভাগের এক ভাগেরও বেশি পুরনো জমিদাররা জমিদারী খুইয়েছিলেন। এসব জমিদারি এসেছে নব্য ধনীদের মধ্যে। তখন ব্যবসার চেয়ে জমিদারদের সামাজিক মর্যাদা বেশি ছিল। কিন্তু এইসব জমিদাররা নিজেরা কখনো জমিদারি পরিচালনা করেননি। তারা অন্য লোকদের দিয়ে জমিদারি পরিচালনা করেছেন। তারা হয়েছেন অনুপস্থিত জমিদার।

হেস্টিংসের আমলে গোড়ার দিকে জমিদারের সংখ্যা মাত্র শ খানেক, সেখানে ১৮৭২-৭৩ সালে এই সংখ্যা দাড়ায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ২ শোতে। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৭ হাজার জমিদারের সম্পত্তি ছিল মাথা পিছু ৫০০ একরেরও কম।

জমিদার এবং মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় প্রজাদের খাজনা দিতে হয়েছে বেশি। ১৭৭২ সালে রাজস্ব আদায় হয়েছিল তিন কোটি টাকা, কিন্তু একশো বছর পরে ১৮৭২ সালে জমিদার এবং মধ্যস্বত্বভোগীরা রাজস্ব আদায় করতেন ১৭-১৮ কোটি টাকা।

বৃটিশ সরকারের  উদ্দেশ্যই ছিল ভারতে জমিদার, তালুকদার, জোদ্দার, ধনী কৃষক সৃষ্টি করে একটি অনুগত শ্রেণী সৃষ্টি করা। তাদের শোষণে যদি কখনো প্রজাবিদ্রোহ হয়, তাহলে এই অনুগত বাহিনীই প্রজাদের বিদ্রোহ থেকে তাদের বাঁচাবে। তাদের ব্যবসা-বানিজ্য-শোষণ কৌশল টিকে থাকবে।  এদের পাশাপাশি বিশেষভাবে রাজভক্ত বা অনুগত প্রজাদেরও তাদের  কোম্পানীতে, ব্যবসাবানিজ্যে, জমিদারী-সেরেস্তায় কিছু দায়িত্বজনক পদ দিয়ে জমিদারি পরিচালনার কাজ পাইয়ে দেয়। এভাবে কিছু ধনীক শ্রেণীও ইংরেজরা তৈরি করল।দেশে পরজীবী একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সৃষ্টি হল ইংরেজ আমলে।

বেহাল কৃষি ব্যবস্থা

ইংরেজদের আগমণের আগে বাংলার শুধুমাত্র অর্থনীতি কৃষিনির্ভর ছিল না। দেশে শিল্পী দক্ষ কারিগরী পেশায় লোকের সংখ্যা ছিল প্রচুর। সে সময় মানুষের বড় ধরনের শিল্প না থাকলেও ঘরে ঘরে ক্ষুদ্র শিল্প-কুটির শিল্প ছিল। সেখানে কাজ করতে করতে বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষজন সেই কাজে খুব দক্ষতা অর্জন করেছিল। তারা পরিচিত হয়েছিল—তাঁতী বা জোলা, কামার, কুমোর, সুতোর ইত্যাদি নামে। চাষীরাও সে সময় চাষের অবসরে বা ফাঁকে ফাঁকে এইসব কুটির শিল্পে কাজ পেত এবং বাড়তি আয়ের সুযোগ ঘটত তাদের। ফলে দেশে মানুষের আর্থিক অবস্থা খারাপ ছিল না।

এই গ্রামবাংলার ঘরে উৎপাদিত মসলিন কাপড়ের খ্যাতি তখন শুধু দেশেই নয় সারা বিশ্বজোড়া। বিদেশীরা মসলিন কিনতে ভারতে আসত। বাংলা থেকে তা কিনে উচ্চদামে ইউরোপে বিক্রি করত। তারা খুঁজে বের করত কোথায় এই মসলিন উৎপাদিত হয়। শোনা যায় কলম্বাসও এই মসলিনের খোজেই ভারত আবিষ্কারের জন্য অভিযান চালিয়েছিলেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতে আসার উদ্দেশ্যই ছিল ভারতের নানাপ্রকার শিল্পজাত দ্রব্য, শাল, মসলিনজাতীয় বস্ত্র ও নানাবিধ মসলা প্রভৃতি প্রাচ্য দেশ থেকে পাশ্চাত্যে চালান করা। সে সময়ে ইউরোপে এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল। বাংলায় যখন কোম্পানীর শাসন জেঁকে বসেছে—লুটপাটের টাকায় ইংলণ্ডে শিল্পবিপ্লব শুরু হয়েছে তখন ইংলন্ডের একশ্রেণীর ব্যবসায়ীরা দাবী করে বসে ইংলন্ডের শিল্পবাজার প্রসারের জন্য ভারত থেকে পণ্য আমদানী বন্ধ করে দিতে হবে। বৃটিশ পার্লামেন্ট সে দাবী মেনে নেয়।

তখন ভারতের বহির্বানিজ্য সম্পূর্ণভাবে কোম্পানী নিয়ন্ত্রণে থাকায় ভারত থেকে পণ্য ইউরোপের অন্য দেশেও প্রবেশাধিকারের সুযোগ হারাল। ইংলণ্ডে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী ভারতে একচেটিয়াভাবে আসা শুরু করল। একই সঙ্গে বাংলা তথা ভারতের পণ্যের উপরে কোম্পানী চড়া কর বসিয়ে দিল। ফলে ইংলণ্ডের পণ্য কম দামে বাজারে পাওয়া যেতে লাগল। এইভাবে দেশী পণ্যের বাজার পড়ে গেল। দেশী পণ্য একই সঙ্গে দেশী ও বিদেশী বাজার হারাল। ফলে দেশের শিল্প খাতটি সমূলে ধ্বংস হয়ে গেল। জহর লাল নেহেরু বলেছেন—উনিশ শতকের ভারত ইতিহাস হল ধ্বংসপর্বের ইতিহাস–পুরাতন শিল্পাদি নিশ্চিহ্ণ করার ইতিহাস। জাহাজী কারবার কাজ, বস্ত্র শিল্প, ধাতব পদার্থের কাজ, কাঁচ তৈরির কাজ, কাগজ তৈরির কাজ—আরও অনেক শিল্প মৃত্যুমুখে পতিত হল।

ভারতের শিল্পোন্নতি যাতে না হয়, যাতে শিল্পের দিক থেকে তার অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশ অবনতিলাভ করে—সেদিকেই ইংরেজদের লক্ষ্য ছিল বেশি। যন্ত্রপাতি ভারতে যাতে না আসতে পারে তার জন্য নিয়ম করা হল। বাজারে এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করা হল যে বৃটিশ পণ্য না হলে যেন ভারতের না চলে। ইংলন্ড দ্রুত তার শিল্পোন্নতির দিকে এগিয়ে চলল, ভারত হয়ে গেল কৃষিনির্ভর দেশ। উনবিংশ শতকের মধ্যভাগে শতকরা পঞ্চান্ন লোক এদেশে কৃষিদ্বরা জীবিকানির্বাহ করত। ইংরেজদের এই শিল্পধ্বংসের প্রত্যক্ষ প্রভাবে কৃষিজীবিীর সংক্যা বেড়ে দাড়িয়েছির শতকরা চুয়াত্তর জন।   এদেশ থেকে সস্তায় কাঁচা মাল ইংরন্ডের কারখানায় চলে গেল এবং বিলেতের কারখানাজাত শিল্পসম্ভার এই দেশের বাজারই চড়া মূল্য বিক্রি হতে লাগল। ইংরেজদের প্রধান কেন্দ্র বাংলা হওয়ায় বাংলার অবস্থাই সবচেয়ে করুণ হয়ে পড়ল।

ভারত-ইতাহাসের যুগ্ম লেখক এডওয়ার্ড টমসন ও জি.টি. গ্যারেট লিখেছেন, ইংরেজদের ঐশ্বর্য্যলিপ্সা একটা যেন রোগের মত দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এ-বিষয়ে তারা কোর্টেস ও পিৎসারোর আমলের স্প্যানিশদের পর্যন্ত হার মানিয়েছিল। একেবারে নিঃশেষে শোষিত না হওয়া পর্যন্ত এই বাংলাদেশের আর শান্তি ছিল না।

ভূমিহীন ও বর্গাচাষীর বেত্তান্ত

ইংরেজরা বাংলার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই সুকৌশলে  বাংলার এই কুটির শিল্পকে পুরোপুরি ধ্বংশ করে দেয়। ফলে এই কুটির শিল্পে বিপুল সংখ্যক মানুষ বেকার হয়ে পড়ে।  লক্ষ লক্ষ শিল্পী ও কারিগররা আত্মহত্যা করে– মরে যায়। ১৮৩৪ সালে বড়লাট লর্ড বেন্টিংক তাঁর রিপোর্টে লিখেছেন—ব্যবসা বানিজ্যের ইতিহাসে এই রকম দুরাবস্থার তুলনা খুবই কম মেলে। সমগ্র ভারত ভূখণ্ড তাঁতি জোলা সম্প্রদায়ের অস্থি-কঙ্কালে পরিকীর্ণ হয়ে আছে।

এদের কাজ ছিল না, উপজীবিকা ছিল না, বহু বংশপরম্পরায় অর্জিত দক্ষতা বা  শিল্পকুশলতাও কাজের অভাবে নষ্ট হয়ে গেল। বেঁচে থাকার জন্য তারা তখন কৃষিকাজের দিকে ছুটে আসে। ফলে এরা জমির উপর বিরাট ভারস্বরূপ হয়ে দাঁড়াল। তারা পরিণত হয় ভূমিহীন ক্ষেতমজুরে। কেউ কেউ হল বর্গা চাষী। এদের জীবন ছিল মানবেতর। সভ্যজগতে যাকে খেয়ে পরে বেঁচে থাকা বলে তার বহু নিচের স্তরে লোকে কোনোমতে প্রাণধারণ করতে লাগল। এরা পরের জমিতে কাজ করে—হাড়ভাঙ্গা খাটুনি দিয়ে ফসল উৎপাদন করে। কিন্তু ফসলের উপরে তাদের অধিকার নেই। তাদের আয় খুবই কম। বর্গচাষীদেরকে  জমির মালিকরা ভয়ঙ্কর জটিল পদ্ধতিতে জমি ভাড়া দেওয়া শুরু করে। মালিকরা জমি ভাড়া দেওয়া ছাড়া জমিতে আর কোনো পূঁজি বিনিয়োগ না করেই বর্গাচাষীর কাছ থেকে ফসলের বড় ভাগ পায়।

ভূমিহীন ক্ষেতমজুর আর বর্গাচাষীরা হয়ে উঠে দাসশ্রমিকের মত। তার সঙ্গে মহাজনদের কবলে পড়ে এই দাসজীবনের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠল। প্রজাদের জমির পরিমাণ দিন দিন কমে যেতে লাগল। এইভাবে হাত বদলানোয়  জমিগুলি দিন দিন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরোয় পরিণত হয়ে এক অদ্ভুত অবস্থার সৃষ্টি করল। কৃষকরা  ঋণের ফাঁদে পড়ে মহাজনদের কাছে বেঁচে দিতে বাধ্য হল। ক্ষুদ্র কৃসকদের জমি গিলে নতুন নতুন ভূস্বামী সৃষ্ট হল। পরিচিত হল বাবুতে। ভূমিহীন শ্রমজীবীদের সংখ্যা লক্ষ লক্ষ বেড়ে উঠল।

ক্ষুদ্র কৃষক-ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের জন্য তৎকালীন সরকারও কিছু করে নাই। পরবর্তিতে যখন রাজনীতিবিদদের উত্থান হল—তারাও তাদের জন্য  কিছু ভাবে নাই।

জমির আয় খুব লাভজনক ও সম্মানজনক বলে তখন শিক্ষিতবাবুরা এবং ব্যবসায়ীরা জমি কিনে ভাড়া দিতে শুরু করল। এইসব জমির মালিকরা  পরজীবী শ্রেণী সমাজে নতুন করে  শোষক হিসেবে আর্বিভূত হয়।

ষষ্ঠ পর্ব————————————————

বাবুরাম সাপুড়ে

কোথা যাস বাপুরে।।

নববাবুবিলাস  সম্বাদ

১৮৭২ সালে প্রথম যখন আদম শুমারী হয়। সেখানে দেখা যায়—সত্তরের মন্বন্তরের ক্ষতি পূরণ হতে প্রায় একশ বছর সময় লেগেছিল। দুই তৃতীয়াংশ লোকই হয় মরে গিয়েছিল—নয় পালিয়ে গিয়েছিল, ফলে প্রথম দিকে জমির পরিমাণ ছিল প্রচুর। কিন্তু চাষের লোক ছিল খুবই কম। যারা ছিল তারা জমিদারের শোষণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শস্যচাষে সাহস হারিয়ে ফেলেছিল। ইংরেজরা বাংলা দখল করার পরে দেশে অসংখ্য ক্ষুদে সামন্ত বা জমিদার এবং বরগা চাষীর সৃষ্টি হয়। এর আগে মধ্যবিত্ত বলে কোনো সম্প্রদায় ছিল না।

তখন দেশটি পুরোপুরি বৃটিশদের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। মাত্র ১০-১৫ জন বৃটিশ লক্ষ লক্ষ ভারতীয়ের উপর ছড়ি ঘোরাত। এই ছড়ি ঘোরানোর কাজটি করা হত স্থানীয় অনুগত শ্রেণীর লোকদের সহায়তায়। এই অনুগত বাহিনী সৃষ্টি করার জন্য ইংরেজরা ইংরেজি শিক্ষা চালু করে। বাঙ্গালী বাবুরাই ইংরেজি শিক্ষায় এগিয়ে আসে। তারা ইংরেজি শিখে সাহেবদের দোভাষী, মুনশি, দেওয়ান ইত্যাদি কাজে ভিড়ে যেত। তাদের এই ভিড়ে যাওয়াকে বলা হয় সাহেব ধরা। সাহেবরা চাকরী, দুর্নীতি, ব্যবস্যা-বানিজ্য, জমিদারি, নবাবীর নামে যেসব লুণ্ঠন করত এইসব বাঙ্গালী বাবুরা তাদের সহযোগী হিসাবে বেশ বড় অঙ্কের বেতন পেত—বখরা পেত। এভাবে দেশে তখন নতুন ধরনের শিক্ষিত ধনীক শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল। তারা এইসব টাকা পয়সা দিয়ে নানা ধরনের ব্যবসা-বানিজ্য করেছে। জমিদারীও কিনেছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হওয়ার এক দশকের মধ্যেই কোলকাতায় থেকে নতুন ধরনের শোষক বাবু শ্রেণীতে রূপান্তরিত হয়েছে। এরাই পুরনো জমিদারদের হটিয়ে আরও হৃদয়হীন জমিদারে পরিণত হয়েছে।

এই শিক্ষিত বাবুরা একটু ইংরেজি শিখেই সাহেব ধরতে শিখত। বাবুরা কোলকাতায় বনবাস করত। কোলকাতা শুরুতে ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর পন্য আমদান-রপ্তানীর কেন্দ্র। ইংরেজ শাসন কায়েম হওয়ার পরপরই কোলকাতাকে সারা ভারতের রাজধানী করা হয়। হয়ে ওঠে বৈদেশিক বানিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। ইংলল্ড থেকে তখন ভাগ্যান্বেষণে  ইংরেজরা কোলকাতায় আসত। এই ইংরেজরা  বাংলা ভাষা জানত না। এই মধ্যবিত্ত বাবুরা তাদেরকে জাহাজঘাটা থেকেই পাকড়াও করত। তারা সাহেবদের কেরানীর চাকরী করত। আবার কিছু কিছু বাঙালিরা ইংরেজী জানত না। কিন্তু দেখে দেখে কোম্পানীর দলিলপত্রাদি না বুঝেই হুবহু নকল করতে পারত। এদের নাম ছিল মুনশী। এরাই আবার প্রমোশন পেয়ে দেওয়ান হত। এরা নানা কায়দায় বেতনসহ নজরানা দস্তুরী আদায় করত ইংরেজদের কাছ থেকে। এভাবে তারা বেশ অর্থসম্পদের মালিক হয়ে গিয়েছিল। ব্যবসা বানিজ্য খুলেছিল। কেউ কেউ জমিদারও হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষ জয়রাম ছিলেন ইংরেজদের এ ধরনের ঠিকাদার। হয়েছিলেন হুইলার সাহেবের দেওয়ান। রামমোহন রায়ও ছিলেন কোম্পানীর সেরেস্তাদার—পরে দেওয়ান।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আদি সহযোগীর অন্যতম ছিলেন শোভারাম বসাক। ১৭৮০ সালে তার মৃত্যু হয়। ইংরেজদের সঙ্গে ওঠাবসা করে তার সম্পত্তির পরিমাণ—কোলকাতার বগবাজার এলাকায় ৩৭টি বাড়ি, কৌরকাতার বিভিন্ন এলাকায় ৩টি বাগান ও পুকুর। মারা যাওয়ার পরে তার গুদামে ছিল নানা ধরনের বিপুল পরিমাণ কাপড়, ৫ মন রকমারি মশলা, ১৮ মন আফিং, এবং পরিমাণমত চন্দনকাঠ, তামা, সিসা, লবঙ্গ, ফিটকিরি ইত্যাদি। সিন্দুকে ছিল ৮৯১টি মুক্তা—এর মধ্যে ৬১টি আবার আকারে বেশ বড়, ৪১৩টি হিরা, ৩৫টি পদ্মরাগ মণি। তাছাড়া অনেক মোহর, সোনার ছড়া ইত্যাদি। সাহেবদেরও তিনি টাকা সুদে ধার দিতেন। তাদের কাছে তার পাওনা ছিল ৫ লক্ষ ২৭ হাজার ১১২ টাকা। দেশীয় লোকদের কাছে পাওনা ৫৩ হাজার ৮৩ টাকা। সুয়েজ, বোম্বাই এবং বসরার বণিকদের কাছে পাওনা টাকার পরিমাণ ছিল ৭৫ হাজার ৭৫১ টাকা। এ ছাড়াও মালদা, কাশিমবাজার, হরিয়াল, ক্সীরপাই ও ঘাটালে শোভারাম বসাকের নিজস্ব আড়ং ছিল।

লুণ্ঠনপর্বের শুরুতেই ইংরেজ কোম্পানী জাহাজে করে এদেশ থেকে মালপত্র ইংলন্ডে নিয়ে যেত। ফেরার পথে খালি জাহাজ নিয়ে আসার কিছু সমস্যা ছিল। ঝড়ের কবলে পড়লে জাহাজ ডুবির আশঙ্কা ছিল। সেকারণে তারা সে সময়ে খুবই সস্তা লবণ জাহাজ ভরে নিয়ে আসত। যাত্রা শেষে সে সব নুন সমুদ্রে ফেলে দিয়ে আবার জাহাজ খালি করত। ইংরেজদের ব্যবসাবুদ্ধি ছিল অতি প্রখর। তারা স্থানীয় কিছু অনুগত বাঙ্গালীকে ধরে এই লবণ বিক্রির ব্যবস্থা করে। তখন এদেশে লবণের কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু কোম্পানী বাজারে প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় লবণ বিক্রি থামিয়ে দিয়ে বিলেতি লবণ বিক্রির ব্যবস্থা করেছিল। সেই লবণের টাকায় অনেক বাঙ্গালী বিপুল অর্থসম্পত্তির মালিক হয়েছিল। তারা হয়েছিল দেওয়ান, উপদেওয়ান। কেউ কেউ হয়েছিলেন একদম নিঃস্ব থেকে উচ্চবিত্ত—মধ্যবিত্ত।

পদ্মলোচন নামে এক ভদ্রলোকবাবুর খবর জানতে পারা যায় হুতুম প্যাঁচার নকশায়। পদ্মলোচন খুব গরীব ঘরের সন্তান। গ্রাম থেকে কোলকাতায় এসে গৃহভৃত্যের কাজ নেয়। কিন্তু কায়দা করে টাকাপয়সা আয় করে একজন বড় মানুষে পরিণত হয়েছিলে। হুতুম প্যাচার নকশায় লেখা হয়েছে —

''ক্রমে পদ্মলোচন নানা উপায়ে বিলক্ষণ দশ টাকা উপার্জন কত্তে লাগলেন, অবস্থা উপযোগী একটি নতুন বাড়ি কিনলেন, সহরের বড় মানুষ হলে যে সকল জিনিসপত্র উপাদানের আবশ্যক, সভাস্থ আত্মীয় ও মোসাহেবরা সেই সকল জিনিস সংগ্রহ করে ভাণ্ডার ও উদর পূরণ করে ফেল্লেন, বাবু স্বয়ং পছন্দ করে (আপন চক্ষে সুবর্ণ বর্সে) একটি রাঁঢ়ও রাখলেন।''

আরেকজন বাবুর নাম জানা যায়—নাম বিশ্বনাথ মতিলাল। তিনি শেষ বয়সে এসে গান-বাজনা, হাফ-আখড়াই আর শখের যাত্রা নিয়ে খুব মেতেছিলেন। তার অগাধ সম্পত্তি ভাগ করে দিয়েছিলেন তার ছেলেপেলেদের মধ্যে। কোলকাতার তার এক ছেলের বউয়ের নামেই একটি বাজার বসিয়েছিলেন। সে বাজারটির নাম বউবাজার। এই বউবাজরটিতে সে সমযের বাবুদের মনোরঞ্জনের জন্য বারবণিতাদের সবচেয়ে পল্লী গড়ে উঠেছিল। এখানে এই বড় বড় বাবুরা ইংরেজদের সঙ্গে বাংলার লুটপাটের টাকা পয়সা দিয়ে, জমিদারী প্রজাশোষণের টাকা দিয়ে তাদের রক্ষিতা রাঢ়দের জন্য বাড়ি করে দিতেন। ভাগ্যান্বষণে অনেক মুসলমান ও পশ্চিমা বাঈজিরাও এখানে আসর বসাত। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল নিকি বাঈ। তাকে তার বাবু প্রতিমাসে সে সময়ে এক হাজার টাকা দিয়ে পুষতেন। পাইকার, ব্যাপারী আর ইজারাদারদের রাত্রিবাসের জন্য অনেক টোটেল গড়ে উঠেছিল। সেখানে রাতকাটানোর জন্য বারবণিতাদের সহজে পাওয়া যেত। তাদের জন্য তখন সৌখিন পোষাক আষাক আর গহনার দোকানপাটেরও রমরমা ছিল।

পূর্ব বাংলা থেকে আসতেন বাঙ্গাল জমিদার, তালুকদার আর ইজারাদাররা। তারা আসতেন বজরায় করে। তাদের পাণ্ডারা ধরে বারবণিতাদের কাছে নিয়ে যেত। আর কিছুদিন ফূর্তিফার্তা করে সর্বস্ব খুইয়ে দেশে ফিরে যেত। আবার প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে কোলকাতায় ফিরে আসত।

ঠিক সে সময়েই গ্রামের মানুষ না খেয়ে মরছে। সে সময়ে পথে ঘাটে, মন্দিরচত্বরে খ্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে অনেক মা তাদের শিশু সন্তানকে ফেলে রেখে পালিয়ে যেতেন। পালিয়ে গিয়ে এদের উঠতে হত এইসব বউবাজারের মত বারবণিতা পল্লীতে।

১৮২০ সালে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় নববাবুবিলাস নামে একটি বই লেখেন। সেখানে বাবু বলতে তরুণ নব্যধনীদের কথা বুঝিয়েছেন। ইংরেজরা বাবু শব্দটিকে ইংরেজিজানা বাঙালি কেরানীকে বুঝত। তারা ১৭৮২ সালে এই বাবু শব্দটিকে দলিলপত্রাদিতে ব্যবহার করা শুরু করে। আর বাঙালিদের কাছে বাবু মানে মনিব।

উনিশ শতকের গোড়ার দিকে যারা জমিদারি কিনে অথবা ব্যবসা বানিজ্য করে কৌলকাতায় নব্যধনী হয়েছিলেন–তারাই বাবু হিসেবে পরিচিত হতেন সে সময়ে। ১৮৫০ সালের দিকে বাবু বলতে সংবাদপত্রে জমিদার, ব্যবসায়অর সঙ্গে ধনী পরিবারের অলস তরুণদের বোঝানো হত। এরা ছিলেন আলালের ঘরের দুলাল। ১৮৬০ সালের দিকে বাবু শব্দটি আরও ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। তখন চাকরীজীবীদের মধ্যে বড়বাবু, ছোটো বাবু ইত্যাদি শব্দ এসে যায়। এমনকি পরিবারের বড়ো ভাইকে বড় বাবু, মেজো ভাইকে মেজো বাবু ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হতে থাকে। বাবুদের গিন্নীদের বলা গত বিবি। ভাবানীচরণ এইসব বিবিদের নিয়ে নববিবিবিলাস নামে আরেকখানি বই লিখেছেন। মুসলমানদের মধ্যে বাবু শব্দটির বদলে সাহেব শব্দটিই বেছে নেওয়া হত।

এ ধরনের বাবু রাজা রামমোহন রায়ের বাড়ির একটি উৎসবের বর্ণনা পাওয়া যায় ফেনি পার্কসের ভ্রমণকাহিনীতে। ভ্রমণকাহিনীর নাম Wanderings of a Pilgrim in search of Picturesque ।  তিনি ১৮২৩ সালে কলকাতায় রামোহনেরবাড়িতে নাচের আসরে যোগ দেন। তিনি লিখেছেন—

একদিন এক ধনিক সম্ভ্রান্ত বাঙালিবাবুর বাড়ি ভোজসভায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম। বাবুর নাম রামমোহন রায়। বেশ বড় চৌহদ্দির মধ্যে তার বাড়ি; ভোজের দিন নানা বর্ণের আলো দিয়ে সাজানো হয়েছিল। চমৎকার আতসবাজির খেলাও হয়েছিল সেদিন। আলোয় আলোকিত হয়েছিল তার বাড়ি।

বাড়িতে বড় বড় ঘর এবং একাধিক ঘরে বাইজি ও নর্তকীদের নাচগান হচ্ছিল। বাইজিদের পরনে ছিল ঘাঘরা, সাদা ও রঙিন মসলিনের ফ্রিল দেওয়া, তার উপর সোনারূপার জরির কাজ করা। শাটিনের ঢিলে পায়জামা পা পর্যন্ত ঢাকা। দেখতে অপূর্ব সুন্দরী, পোষাকে ও আলোয় আরও সুন্দর দেখাচ্ছিল। গায়েতে অলঙ্কার ছিল নানারকমের। …বাইজিদের একজনের নাম নিকি, শুনেছি সারা প্রাচ্যের বাইজিদের মধ্যে মহারানি সে, তার নাচগান শুনতে পাওয়া ভাগ্যের কথা।

ভদ্রলোক : ভদ্র হইলেও লোক বটে

উনিশ শতকের শেষদিক থেকে বিশ শতকের প্রথমদিকে বাবুদের মধ্যে থেকে ভদ্রলোক শ্রেণীর উদ্ভব হয়। এরা কিছু দেশোদ্ধারের কাজকর্মে জড়িত থাকতেন। ইংরেজি শিক্ষার আলোকে  আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানে আলোকিত হয়ে বাঙালি মানসে এ সময়কালে একটি জাগরণের ফলে বাবু থেকে ভদ্রলোকে রূপান্তর  এসেছিল। তার কিছু পল ভাল হয়েছিল—কিছু খারাপ হয়েছিল।   ১৮৭২ সালে ভদ্রলোক অর্থটি ভদ্র যে  লোক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন হুতুম প্যাঁচার নকশা বইয়ে।

বঙ্কিমচন্দ্র ঠাট্টা করে এই ইংরেজি জানা শিক্ষিত বাবুর একটি চিত্র এঁকেছেন—চসমা-অলঙ্কৃত, উদারচরিত্র, বহুভাষী। এরা নিজের ভাষাকে ঘৃণা করেন, পরের ভাষায় পারদর্শী। মাতৃভাষায় বাক্যালাপে অসমর্থ। এঁরা বিনা উদ্দেশ্য সঞ্চয় করেন, সঞ্চয়ের জন্য উপার্জন করেন, আপার্জনের জন্যে বিদ্যা শিক্ষা করেন এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্যে প্রশ্নপত্র চুরি করেন। এঁদের বল হস্তে এক গুণ, মুখে দশ গুণ এবং কার্যকালে এরা অদৃশ্য। এঁদের বুদ্ধি বাল্যে বইয়ের পাতায়, যৌবণে বোতলের মধ্যে, বার্ধক্যে গৃহিণীর আঁচলে। আরও মজা করে বঙ্কিম লিখেছেন—বাড়িয়ে এরা জল খান, বন্ধুগৃহে মদ খান, বেশ্যাগৃহে গালি খান এবং মুনিব সাহেবের কাছে গলাধাক্কা খান।

সোম প্রকাশ পত্রিকায় ১৮৬২ সালে একটি নিবন্ধে লেখা হয়—ভদ্রলোক, এ ব্যক্তি আপনার পরিবারকে খাইতে দয় না, বাটী যায় না, যেখানে পায় সেইখানে আহার ও শয়ন করে।

১৮৮৩ সালে সোমপ্রকাশ লেখে—কৃষিকার্য করা ভদ্রলোকের কর্ম নহে, তাহাতে লোকে চাষা বলিবে।

সপ্তম পর্ব——————————————–

বাংলায় বামুন  

আর্যরা ভারতে আসার অনেক পরে বাংলায় তাদের সংস্কৃতির স্পর্শ পায় অনেক পরে। রামায়ণ-মহাভারতের যুগে এই দেশকে আর্যরা খুব ভালো চোখে দেখেনি। বাংলা ছিল নিম্নবর্গের মানুষের জায়গা। দস্যুদের এলাকা। খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দীর বেশিরভাগ সময়েও এদেশে ব্রাহ্মণ্য আচার-অনুষ্ঠান অপেক্ষা বৌদ্ধ প্রভাবই অধিকতর পরিলক্ষিত হয়। সেই কারণেই তৎকালীন মহারজ আদিশুর কান্যকুব্জ বা কনৌজ থেকে পাঁচজন ব্রাহ্মণকে আনিয়েছিলেন। তারা বেদবিহিত পূজাঅর্চনা প্রচলন করেন। আধুনিক বাঙ্গালী ব্রাহ্মণদের আদিপুরুষ এই পঞ্চ ব্রাহ্মণ। তারা জাতপাতের বিভেদের প্রাচীর তুলে সমাজের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। নিম্নবর্গের মানুষ শুধু রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নয়—ধর্মব্যবস্থায়ও নতুন নতুন নিপীড়নের শিকার হয়ে পড়ে।

বাংলায় ইসলাম 

পাশাপাশি   ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভারতে মুসলমানদের আক্রমণ ঘটে। তখন বাংলায় সমাজব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন ঘটে। কোথাও মুসলমান সম্প্রদায়ের সংস্পর্শে কোথাওবা বা শাসক সম্প্রদায়ের ধর্মান্তকরণে  প্রদত্ত সুযোগসুবিধার ফলে বা রাজানুগ্রহ পাওয়ার আকাঙ্খায় বা জাতে উঠার আকাঙ্খায়ও অনেক উচ্চবর্গের হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। পাশাপাশি নিম্নবর্গের হিন্দুরা ইসলামের উদার নীতির কারণে আকৃষ্ট হয়। সে সময়ে দরবেশ-ফকিররাও ক্ষেতের আলে আলে নাচতে নাচতে—গাইতে গাইতে দিগন্তে পিঠ রেখে দেখা দিয়ে আসছেন। ঈশ্বরের কথা—আল্লার কথা তাঁদের গান হয়ে সন্ধ্যার শঙ্খ ঘণ্টার ধ্বনির সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে বাংলার আকাশে বাতাসে জনপদে মিশে গেছে। সাধারণ মানুষজন অনেকেই উদার ইসলাম গ্রহণ করেছে।

জাতের বামুন থেকে অজাতের পিরালী বামুন

ঘটনাটা পঞ্চদশ শতাব্দীর। তখন যশোর জেলার চেঙ্গুটিয়া পরগণায় এক ঘর জমিদার ছিল। তার পদবী ছিল গুড়। তবে খাতা পত্রে এই গুড়দের রায়চৌধুরী বলা হত। সেখানকার জমিদার দক্ষিণানাথ গুড় বা রায়চৌধুরীর চার ছেলে—কামদেব, জয়দেব, রতিদেব ও শুকদেব। সে সময়ে স্থানীয় এক মোগল শাসক ছিলেন মামুদ তাহির বা পীর আলি। এই পীর আলীর কৌশলে বা প্রলোভনে পড়ে বা আকৃষ্ট হয়ে কামদেব এবং জয়দেব ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তবে আরও একটি মত পাওয়া যায়– পীর আলী এই দুইভাইকে কৌশলে গোমাংস ভক্ষণ করান। এই ঘটনা জনসম্মুখে প্রকাশ করে দেন পীর আলী। তখন তাদের মুসলমান হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।  তাদের ছোটো দুই ভাই রতিদেব ও শুকদেব মুসলমান হয়নি। কিন্তু তাদের ভাই মুসলমান হয়েছে শুধু এই কারণে হিন্দুসমাজ তাদেরকে সমাজচ্যুত করে। তাদের সঙ্গে সর্বপ্রকার সামাজিক সম্পর্ক বন্ধ হয়ে যায়। তাদের সঙ্গে কেউ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ছেলেমেয়ে বিয়ে দেওয়াও এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়ে। এদের নাম হয় পিরালী বামুন বা পিরালী থাক। জাতে ছোটো। অছ্যুৎ।

অথচ  মহাভারতে উল্লেখ আছে প্রাচীন সমাজে ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়াদি সকলেরই প্রচুর মাংসাহার করতেন। ভদ্রসমাজেও সুরাপান চলত। গোমাংসভোজন ও গোমেধ যজ্ঞের বহু উল্লেখ বেদে পাওয়া যায়। রাজশেখর বসু মহাভারতের ভূমিকায় আরও জানাচ্ছেন, সেকালে অস্পৃশ্যতা কম ছিল—দাসদাসীরাও অন্ন পরিবেশ করত। কিন্তু কালক্রমে ব্রাহ্মণতন্ত্র কঠিনভাবে সমাজে কায়েম হয়ে পড়লে হিন্দু সমাজের এই উদারনীতি অনেকাংশেই পরিত্যাক্ত হয়।

এই সমাজচ্যূতির ফলে স্বশ্রেণীর ব্রাহ্মণদের সঙ্গে বিয়েশাদী বন্ধ হয়ে গেলে তারা ভিন্ন কৌশল করেন। তারা ছেলেমেয়েদের বিয়ের জন্য কৌশল ও প্রলোভনের জাল বিস্তার করেন। সাধারণত তারা টার্গেট করতেন গরীব ব্রাহ্মণদের। তাদেরকে টাকা পয়সা, জমিজিরেত ও ঘরজামাই করে মেয়ে গছাতেন। আর ছেলে বিয়ে দিলে মেয়ের বাপের বাড়ির লোড়ির লোকজনকে আর্থিকভাবে দাড় করানোর দায়িত্ব নিতেন।

ঘরজামাই থেকে জমিদারি 

এ সময়কালেই বর্ধমান জেলার কুশগ্রামে একঘর ব্রাহ্মণ পরিবার ছিল। তারা কুশগ্রামের নামঅনুসারে কুশারী পদবী ব্যবহার করতেন। তারা ছিলেন শ্রেষ্ঠ শ্রোত্রিয় শ্রেণীর ব্রাহ্মণ। সে গ্রামের জগন্নাথ কুশারী পিঠাভোগ নামের এক স্থানের জমিদার ছিলেন। তাঁর জীবৎকাল ছিল ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে। তখন মোগল শাসন ছিল।

বর্ধমানের পিঠাভোগের জগন্নাথ কুশারীকেও এইরকম কোনো একটি কৌশলে পিলারী বামুন শুকদেব গুড় কায়দা করে তার মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিলেন। ফলে জগন্নাথ কুশারীকে তার ভাইবেরাদার-আত্মীয়স্বজন পরিত্যাগ করে। সম্ভবত ছিন্নমূল হয়ে জগন্নাথ কুশারী যশোহরে শ্বশুরবাড়ি চলে আসেন। এবং ঘরজামাই হয়ে গেলেন। নরেন্দ্রপুরের উত্তরপশ্চিমকোণে উত্তরপাড়া গ্রামের সঙ্গে সংলগ্ন বারোপাড়া গ্রামে ঘর বাঁধেন। তিনিও পিরালী থাকের অন্তর্ভুক্ত অছ্যুৎ হয়ে গেলেন। শ্বশুর শুকদেব গুড় তাঁকে উত্তরপাড়া গ্রামটি দান করেন। এই গ্রামের আয় থেকেই তাঁর সংসার চলে। তাঁর চার ছেলে—প্রিয়ঙ্কর, পুরুষোত্তম,   জগন্নাথ কুশারীই রবীন্দ্রনাথদের ঠাকুরবংশের আদিপুরুষ।

আজব শহর কোলকেত্তা আগমন 

রবীন্দ্রনাথের উর্দ্ধতম নবম পুরুষ। তার জীবৎকাল ছিল সপ্তদশ শতাদ্বীর দ্বিতীয়ার্ধে। সে সময়ে জোব চার্নক কোলকাতা শহর পত্তন করছিল। তার ছেলে মহেশ বা মহেশ্বর যশোরের উত্তরপাড়া থেকে ভাগ্যান্বেষণে কোলকাতা আসেন। আরেকটি মত আছে মহেশ নয় তার ছেলে পঞ্চানন কুশারী জ্ঞাতী কলহে ভিটা ত্যাগ করে কোলকাতায় চলে যান। সময়টা প্রায় সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ।

জোব চার্নক জোব চার্নকের কোলকাতা

জোব চার্নকের জন্ম ১৬৩০ সালে ইংলন্ডের ল্যাঙ্ক শায়ারে। ১৬৫৬ সালে এক ব্রিটিশ বানিজ্যিক সংস্থায় কাজ নিয়ে ভারতে আসনে। এর বছর খানেক পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কাশিমবাজার কুঠিতে বার্ষিক কুড়ি পাউন্ড বেতনে এক কর্মি হিসাবে যোগ দেন। ১৬৮৬ সালে প্রতিভাবলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বাংলার এজেন্ট নিযুক্